নিয়তির অবদান
কিছু ভুলের শাস্তি মানুষ সারাজীবন ভোগ করে, অথচ সেই ভুলের পেছনে তার কোনো অপরাধই থাকে না।
১. কিছু কথা, যা কখনো বলা হয়ে ওঠেনি
— বাবা, কিছু কথা বলার ছিল।
— আমার এখন সময় নেই।
— বাবা, একটু শুনবে?
— কী রে! এখনো যাবি না? কতবার বলেছি, বিরক্ত করিস না!
বাবার ধমকে মাথা নিচু করে সেখান থেকে চলে এলাম। এই দৃশ্য আমার কাছে নতুন নয়। প্রতিদিনই এমন কিছু মুহূর্তের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে। তবুও প্রতিদিন নতুন করে একটু ভালোবাসার আশায় তাঁদের কাছে যাই।
হয়তো মানুষ আশায় বাঁচে। আমিও বেঁচে আছি সেই আশাটুকু নিয়ে।
এবার গেলাম মায়ের কাছে।
— আম্মু?
— কী বলবি? তাড়াতাড়ি বল, আমাকে উদ্ধার কর!
— আম্মু, আমার প্রচণ্ড মাথাব্যথা করছে। একটু ওষুধ দেবে?
— তোর এসব ফালতু নাটক দেখার সময় আমার নেই। নুসাইবাকে স্কুলের জন্য তৈরি করতে হবে।
— আম্মু, আমি ওকে আজ স্কুলে দিয়ে আসি?
— আমরা তোকে কোনো কিছু করতে বলেছি? মুখপোড়া, যেভাবে আছিস সেভাবেই থাক।
— আম্মু, আমি কি তোমাদের ছেলে নই?
— সেজন্যই তো এখনো খেতে পারছিস!
— আম্মু, তোমরা কি আমার সঙ্গে একটু ভালো করে কথা বলতে পারো না?
— এর চেয়ে ভালো ব্যবহারের তুই যোগ্য না।
কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরটা কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠল।
নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না।
— তাহলে গলা টিপে মেরে ফেলোনি কেন?
কথাটা বলেই সেখান থেকে চলে এলাম।
মানুষ ভুল করে। কিন্তু সেই ভুলের প্রতিদান যে কাউকে এভাবে সারাজীবন দিতে হয়, তা কখনো কল্পনাও করিনি।
২. আমার ছোট্ট নুসাইবা
তখন আমার বয়স মাত্র ছয় বছর। আর আমার ছোট্ট বোন নুসাইবার বয়স চার।
আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কেটেছে ওর সঙ্গে। ও ছিল আমার খেলার সঙ্গী, হাসির কারণ, ছোট্ট পৃথিবী।
মা-বাবার চোখের মণি ছিল নুসাইবা। দিনের অধিকাংশ সময় ও আমার কাছেই থাকত। ওর ছোট ছোট হাত, নিষ্পাপ হাসি, আধো আধো কথা, সবকিছুতেই যেন এক অদ্ভুত মায়া ছিল।
ও আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না। আমিও ওকে ছাড়া থাকতে পারতাম না।
একদিন প্রতিদিনের মতো আমরা দুই ভাইবোন পুকুরপাড়ে গিয়েছিলাম। আমি পানিতে নেমেছিলাম, আর নুসাইবা পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
ওর মুখে ছোট্ট ছোট্ট দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছিল। আমার দিকে তাকিয়ে কী সুন্দর করে হাসছিল!
আমি পানিতে ডুব দিয়ে উঠে আবার ওর দিকে তাকালাম।
কিন্তু সেদিন আর ওকে দেখতে পেলাম না।
ভাবলাম, হয়তো বাড়িতে চলে গেছে। ছোট মানুষ, কখন কী করে তার ঠিক নেই। তাই প্রথমে তেমন গুরুত্ব দিইনি।
কিছুক্ষণ পর বাড়িতে গিয়ে ওকে না পেয়ে আবার পুকুরপাড়ে ছুটে গেলাম।
তারপর যা দেখলাম, তা আজও আমার চোখের সামনে ভাসে।
পুকুরের পানির মাঝখানে আমার ছোট্ট বোনটা ভাসছিল। একটা নিষ্প্রাণ পুতুলের মতো।
আমি চিৎকার করতে শুরু করলাম। আশপাশের মানুষ ছুটে এল। সবাই মিলে ওকে পানি থেকে তুলল।
কিন্তু আমার নুসাইবা আর চোখ খুলল না।
সেদিন আমি শুধু আমার বোনকে হারাইনি, হারিয়েছিলাম আমার শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর অংশটুকুও।
৩. একটি দুর্ঘটনা, একটি আজীবনের শাস্তি
নুসাইবা বেঁচে থাকতে মা-বাবা ওকে আমার চেয়ে একটু বেশি আদর করতেন। ছোট বোন বলে হয়তো ওর প্রতি তাঁদের আলাদা মায়া ছিল।
আমি মাঝেমধ্যে অভিমান করে অভিযোগ করতাম।
কিন্তু ও মারা যাওয়ার পর সেই ছোটবেলার অভিমানকেই সবাই হিংসা বলে ধরে নিল।
সবার চোখে আমি হয়ে গেলাম নিজের বোনের খুনি!
বিশ্বাস করুন, আমার চোখের মণি নুসাইবার প্রতি যদি বিন্দুমাত্র হিংসা থাকত, তাহলে সেদিনই আমার পৃথিবী শেষ হয়ে যেত।
আমি তো ওকে ভালোবাসতাম। ওর হাসিতে হাসতাম, ওর কান্নায় কাঁদতাম।
আমি কী করে ওর ক্ষতি চাইতে পারতাম?
কিন্তু আমার কথা কেউ বিশ্বাস করল না।
মা-বাবা আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিতে লাগলেন। কখনো কথার আঘাতে, কখনো শারীরিক নির্যাতনে।
আমি বুঝতে পারতাম না, যে মানুষ দুটো আমাকে পৃথিবীতে এনেছে, তাঁদের কাছেই কেন আমি এতটা অবাঞ্ছিত?
আমার এখন আরও দুটি ছোট ভাইবোন আছে। কিন্তু তাদের কাছেও যেতে পারি না। তাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে গেলেও মা-বাবার চোখরাঙানি সহ্য করতে হয়।
আমি শুধু দূর থেকে ওদের দেখি।
মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমিও যদি ওদের সঙ্গে বসে একটু হাসতে পারতাম!
কিন্তু আমার সেই অধিকারটুকুও যেন হারিয়ে গেছে।
৪. ভালো ফলাফলের শাস্তি
একদিন বাবার কাছে গেলাম।
— বাবা, আমার কাল পরীক্ষা। পরীক্ষার ফি দিতে হবে।
— পরীক্ষার ফি দিতে পারি, তবে একটা শর্ত আছে।
— কী শর্ত, বাবা?
— জিপিএ ফাইভ পেতে হবে।
— আচ্ছা বাবা, চেষ্টা করব।
সেদিন বাবা আমাকে পরীক্ষার ফি দিয়েছিলেন। টাকাটা হাতে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, হয়তো বাবা এবার আমার ওপর একটু ভরসা করছেন।
কিন্তু আমার সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভের পরিবর্তে পেয়েছিলাম ৪.৮১।
ফলাফল প্রকাশের দিন থেকেই শুরু হলো আমার জীবনের আরেকটি ভয়াবহ অধ্যায়।
বাবার কাছে গিয়ে ফলাফল দেখালাম।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ রেগে গেলেন।
তারপর শুরু হলো মারধর।
একপর্যায়ে মাথার ওপর থেকে তুলে আছাড় মারলেন। এরপর লোহার একটি বস্তু দিয়ে আঘাত করতে থাকলেন।
মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল। রক্তে আমার সারা শরীর ভিজে গিয়েছিল।
আমি কাঁদছিলাম, চিৎকার করছিলাম।
কিন্তু কেউ আমাকে বাঁচাতে আসেনি।
যতক্ষণ পর্যন্ত জ্ঞান হারাইনি, ততক্ষণ পর্যন্ত নির্যাতন চলেছিল।
সেদিন বুঝেছিলাম, কিছু সন্তানের কাছে ভালো ফলাফলও ভালোবাসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়।
সেই ঘটনার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই আমার মাথাব্যথা হতো। কখনো এতটা তীব্র হতো যে সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম।
আমি ব্যথায় চিৎকার করতাম।
কিন্তু আমার সেই চিৎকার শোনার মতো কেউ ছিল না।
৫. যে অভিযোগের কোনো উত্তর ছিল না
আমি সাধারণত কোথাও বেড়াতে যেতাম না। নিজের ঘরটাই ছিল আমার পৃথিবী।
তবুও একদিন কী মনে করে যেন ফুফাতো বোনের বিয়েতে গেলাম।
সেখানে আমার সমবয়সী এক ফুফাতো বোন ছিল। সে আমাকে পছন্দ করত। সেদিন হঠাৎ করেই আমাকে ভালোবাসার কথা জানিয়ে বসল।
কিন্তু আমি কোনোভাবেই রাজি হইনি।
আমি চুপচাপ একটা ঘরে বসে ছিলাম।
কিছুক্ষণ পর মেয়েটিও সেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর হঠাৎ চিৎকার করতে শুরু করল।
তার চিৎকার শুনে মা-বাবাসহ সবাই ছুটে এলেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কেউ একবারের জন্যও আমার কাছে জানতে চাইলেন না, আসলে কী হয়েছিল!
কেউ আমার কথা শুনতে চাইল না।
কেউ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সত্যটা খুঁজতে চেষ্টা করল না।
সবাই যেন আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, অপরাধী আমি।
সেদিন থেকে আত্মীয়স্বজন, পরিচিত মানুষ, এমনকি নিজের পরিবারের সদস্যরাও আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন।
আমার ঠিকানা হয়ে গেল সেই অন্ধকার ঘর।
৬. আকাশের তারার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব
দিনের বেলায় নিজের ঘরে থাকতাম। আর রাত হলে বাড়ির ছাদে চলে যেতাম।
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট তারাকে খুঁজে বের করতাম। তারপর মনে মনে ওটার নাম দিতাম নুসাইবা।
আমি জানি, তারা কথা বলতে পারে না। তবুও ওর সঙ্গে কথা বলতাম।
— হাই আপি! কেমন আছিস?
— এই বুড়ি, হাসছিস কেন?
— কথা বলবি না তোর ভাইয়ের সঙ্গে?
— তুইও কি আমাকে অন্যদের মতো তোর খুনি ভাবিস?
কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ভিজে যেত।
তারপর আবার বলতাম,
— আচ্ছা আপু, তোর মনে পড়ে না? তুই ভাত খেয়ে এসে তোর মুখের ময়লাগুলো আমার শার্টে মুছে দিতি।
— তোর মনে পড়ে না, তোর ছোট্ট হাতের মুঠোয় আমার একটা আঙুল থাকত?
— আপু, বিশ্বাস কর, আমি তোকে একটুও হিংসা করতাম না।
একটু থেমে আবার বলতাম,
— কিন্তু এখন করি জানিস? কারণ মা-বাবা তোর জন্য সারাক্ষণ কাঁদে, আর আমার জন্য একটুও ভাবে না।
— আচ্ছা আপু, আমি যদি তোর মতো তোর কাছে চলে যাই, তাহলে আম্মু-আব্বু কি আমার জন্য একটু কাঁদবে?
— আমার জন্য কি তাঁদের চোখে এক ফোঁটা জলও আসবে না?
— আমাকে কি একবারও জড়িয়ে ধরে বলবে না, কেন চলে গেলি?
কথাগুলো বলতে বলতে কখন যে রাত গভীর হয়ে যেত, বুঝতেই পারতাম না।
মাঝেমধ্যে মনে হতো, আকাশের ওই তারাটাও বুঝি আমার কষ্ট দেখে কাঁদছে।
আর আমাকে বলছে,
'কাঁদবি রে ভাই, খুব কাঁদবি। কারণ পৃথিবীতে কিছু মানুষের কষ্ট বোঝার মতো কেউ থাকে না।'
৭. নাদিয়া, আমার আরেকটি ছোট্ট পৃথিবী
নুসাইবার মৃত্যুর পর আব্বু আর কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে আমার মুখের দিকে তাকাননি।
আমার সঙ্গে সবার কথা বলা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তবে আমার আরেকটি ছোট্ট বোন ছিল, নাদিয়া।
ওর বয়স তখন খুব বেশি নয়। দেখতে অনেকটা নুসাইবার মতোই।
ওর ছোট্ট মুখটা দেখলে আমার নুসাইবার কথা মনে পড়ে যেত।
একদিন গভীর রাতে আমি ছাদে বসে কাঁদছিলাম। চোখের জল মুছতে মুছতে আকাশের দিকে তাকিয়ে নুসাইবার সঙ্গে কথা বলছিলাম।
ঠিক তখনই একটা ছোট্ট হাত আমার মুখের জল মুছে দিল।
পেছনে তাকিয়ে দেখি, নাদিয়া দাঁড়িয়ে আছে।
— কিরে, তুই এত রাতে এখানে? আম্মু দেখেনি?
— না রে, আম্মু ঘুমাচ্ছে।
— তুই ঘুমাসনি কেন?
— তোর কান্নার আওয়াজ শুনে ঘুম আসছিল না।
আমি চুপ করে রইলাম।
ও আমার পাশে বসে বলল,
— ভাইয়া, তুই প্লিজ আর কাঁদিস না। আমার খুব কষ্ট লাগে।
আমি ওকে বুকে টেনে নিয়ে বললাম,
— আচ্ছা, আর কাঁদব না। তুই এবার চলে যা। আম্মু দেখলে আমাকে বকবে।
কিন্তু নাদিয়া যেতে রাজি হলো না।
ও আমার হাত ধরে বলল,
— না, আমি যাব না।
— কেন?
— জানিস, আমার খুব ইচ্ছা করে তোর কাছে আসতে। তোর সঙ্গে খেলতে, তোর সঙ্গে গল্প করতে, তোর কান্নার সময় চোখের জল মুছে দিতে। কিন্তু আম্মু আমাকে তোর কাছে আসতে দেয় না।
কথাগুলো শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
একটা ছোট্ট শিশু কতটা অসহায় হলে নিজের ভাইয়ের কাছে আসার জন্যও অনুমতি চাইতে হয়!
আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম।
ঠিক তখনই পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
— আমার একটা মেয়ে খেয়েও তোর শান্তি হয়নি, আবার আরেকটাকে...
মা কথাটা শেষ করলেন না।
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।
শুধু চোখের পানি ফেলতে লাগলাম।
নাদিয়া ভয়ে আমার হাত ছেড়ে দিল।
সেদিন আবারও বুঝলাম, এই বাড়িতে আমার ভালোবাসার মানুষদের কাছে আসার অধিকারটুকুও নেই।
৮. অসুস্থতার কাছে পরাজিত একটি জীবন
সেদিন রাত প্রায় একটা পর্যন্ত ছাদে ছিলাম।
তারপর ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম।
পরদিন যখন চোখ খুললাম, তখন সন্ধ্যা আটটা।
আসলে সেটা ঘুম ছিল না। প্রচণ্ড মাথাব্যথায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।
ভাবতে অবাক লাগে, এত দীর্ঘ সময় আমি অচেতন হয়ে পড়ে ছিলাম, অথচ কেউ আমার ঘরে এসে একবারও দেখেনি আমি বেঁচে আছি কি না।
আমার পরিবারের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
আমি কখনো তাঁদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খেতে পারতাম না।
সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর রান্নাঘরে গিয়ে যা পেতাম, তাই খেয়ে নিতাম।
এমন কোনো রাত ছিল না, যেদিন আমার খাবারের ওপর চোখের জল পড়েনি।
তবুও অদ্ভুত এক সুখ ছিল আমার।
নিজেকে বোঝাতাম, আমি তো এখনো তাঁদের বাড়িতেই আছি। তাঁরা আমার মা-বাবা। হয়তো কোনো একদিন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
হয়তো কোনো একদিন বাবা নিজে থেকে ডাকবেন।
হয়তো মা একদিন বলবেন,
'বাবা, আয় আমার পাশে বসে খেয়ে নে।'
কিন্তু সেই দিন আর আসত না।
ইদানীং মাথাব্যথা আরও বেড়ে গিয়েছিল।
দিনের প্রায় পনেরো ঘণ্টা মাথাব্যথায় কাটত। কখনো কখনো চার ঘণ্টা পর্যন্ত অচেতন হয়ে পড়ে থাকতাম।
তবুও কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না।
মাঝেমধ্যে মনে হতো, আমি যদি এই ঘরেই মারা যাই, তাহলে হয়তো আমার মৃত্যুর খবরও কেউ জানতে পারবে না।
যেদিন আমার ঘর থেকে লাশের গন্ধ বের হবে, সেদিন হয়তো তাঁরা বুঝতে পারবেন, এই ঘরেও একজন মানুষ বাস করত।
একজন ছেলে, যে সারাজীবন শুধু একটু ভালোবাসা চেয়েছিল।
৯. শেষ চিঠি
আজ মাথাব্যথাটা অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি।
মাথার ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে।
চারপাশটা কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা দেখাচ্ছে।
হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিটা কাছে টেনে নিলাম।
কলমটা হাতে নিয়ে লিখতে শুরু করলাম।
'বাবা, মা,
বিশ্বাস করো, নুসাইবার মৃত্যুর পেছনে আমার কোনো হাত ছিল না। ওটা একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল।
তোমরা ওকে যতটা ভালোবাসতে, আমি তার চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম। ও তো আমার চোখের মণি ছিল, বলো?
আমি কী করে ওর ক্ষতি করতে পারতাম?
বাবা, ওই মেয়েটার সঙ্গেও আমি কোনো খারাপ আচরণ করিনি। তোমরা আমার কথা একবারও বিশ্বাস করলে না।
তোমরা আমাকে মেরেছ, আমার শরীরে আঘাত করেছ। বিশ্বাস করো, তাতেও আমার এতটা কষ্ট হয়নি।
কিন্তু যেদিন থেকে তোমরা আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলে, সেদিন থেকে আমি ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে গেছি।
আমার খুব ইচ্ছা করত, তোমাদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খেতে।
আমার ভাইবোনদের সঙ্গে একটু কথা বলতে।
আম্মু যখন নাদিয়াকে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়, তখন আমারও খুব ইচ্ছা করে, আম্মুর হাতে একটু ভাত খাই।
আমি কি তোমাদের ছেলে নই, আম্মু?
আমার কি কোনো অধিকার নেই তোমার কোলে মাথা রেখে একটু ঘুমানোর?
বাবা, তোমার কি মনে পড়ে, ছোটবেলায় আমি তোমার আঙুল ধরে হাঁটতাম?
তখন তো তুমি আমাকে খুব ভালোবাসতে!
আমি জানি না, কোথায় আমার এত বড় অপরাধ হয়েছিল।
কেন তোমরা আমাকে এভাবে দূরে সরিয়ে দিলে?
আমি তো শুধু তোমাদের একটু ভালোবাসা চেয়েছিলাম।
আমার জন্য কি তোমাদের চোখে এক ফোঁটা জলও আসবে না?
আমি খুব দেখতে চাই, আমার জন্য তোমাদের চোখে জল আসছে কি না।
আমি খুব দেখতে চাই, তোমরা আমাকে একবার জড়িয়ে ধরে বলছ কি না,
'কেন চলে গেলি বাবা?'
মা, আমি তোমারই সন্তান।
তোমার কাছে আমারও অনেক আবদার ছিল। কিন্তু কোনোদিন বলতে পারিনি।
আমার ছোট্ট নুসাইবাকে বলো, তার ভাই তাকে খুব ভালোবাসত।
আর নাদিয়াকে একটু আদর করে দিও। ওর কোনো দোষ নেই।
ওকে আমার কাছে আসতে দিও। ও যেন কখনো ভালোবাসার অভাবে আমার মতো একা হয়ে না যায়।
তোমাদের কাছে আমার আর কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু একটা প্রশ্ন রেখে গেলাম,
একটা সন্তান ভুল করলে কি তাকে ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে দিতে হয়?
পৃথিবীর সব মা-বাবার কাছে সন্তান সমান না হলেও, প্রত্যেক সন্তানের কাছে মা-বাবার ভালোবাসা সমান মূল্যবান।
আমি শুধু তোমাদের একটু ভালোবাসা চেয়েছিলাম।
ইতি,
তোমাদের অবহেলিত সন্তান।'
হঠাৎ করেই হাত থেকে কলমটা পড়ে গেল।
ডায়েরির পাতার ওপর এক ফোঁটা জল এসে পড়ল।
চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
মনে পড়ছে নুসাইবার সেই ছোট্ট হাসিটা।
মনে পড়ছে নাদিয়ার হাতের স্পর্শ।
মনে পড়ছে বাবার সেই কঠিন কণ্ঠস্বর, মায়ের সেই অবহেলার কথা।
আমি জানি না, এরপর কী হবে।
শুধু মনে হচ্ছে, জীবনে কোনোদিন কাউকে নিজের কষ্ট বোঝাতে পারলাম না।
ডায়েরির পাতায় পড়ে রইল কিছু না বলা কথা, কিছু অভিমান আর এক সন্তানের সারাজীবনের জমে থাকা কান্না।
আর সেই পাতার পাশে পড়ে রইল একটি নিষ্পাপ মুখের ছবি।
যে মুখটি একদিন সবার আদরের ছিল, অথচ বড় হতে হতে নিজের বাড়িতেই পর হয়ে গিয়েছিল।
শেষ কথা
একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবার থেকে কেড়ে নিয়েছিল ছোট্ট নুসাইবাকে। কিন্তু সেই দুর্ঘটনার দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল আরেকটি শিশুর ওপর।
যে শিশুটি নিজেও তার বোনকে হারিয়ে শোকাহত ছিল, তাকেই বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল অপরাধী।
একবারও কেউ ভাবেনি, ছয় বছরের একটি শিশুর পক্ষে এত বড় শোক সামলানো কতটা কঠিন!
একবারও কেউ ভাবেনি, যে ছেলেটি নিজের বোনকে হারিয়েছে, সেও তো আদর পাওয়ার অধিকার রাখে।
সন্তান কখনো নিখুঁত হয় না। ভুল তারাও করে। কিন্তু ভুলের শাস্তি দিতে গিয়ে তার শৈশব, আত্মসম্মান আর ভালোবাসার অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়।
কারণ, সন্তান শুধু জন্ম দিলেই নিজের হয় না, তাকে ভালোবাসতে হয়, বুঝতে হয়, তার কথাও শুনতে হয়।
কিছু সন্তান মা-বাবার ঘরে থেকেও এতিমের মতো জীবন কাটায়।
আর কিছু অভিমান মৃত্যুর পরও প্রশ্ন হয়ে থেকে যায়।
'বাবা, মা, আমি কি সত্যিই তোমাদের সন্তান ছিলাম না?'

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.