পর্ব-৪ (শেষ পর্ব): মনুষ্যত্ব

হিমুরা বিরক্ত হলো। তবে তারা এটাও জানে, তিন ঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিটের বক্তব্যের তিন ঘণ্টাই ঝগড়া আর অপ্রয়োজনীয় কথার প্যাঁচাল হলেও বিউটি খান সত্যিই পুরুষদের পশুত্বের বিষয়টি বেশ অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলে ধরেছে।

রাত অনেক হয়েছে। ক্যান্টিনের মেয়েরা সবাই হলেই থাকে, তাই এত রাতে বাইরে থাকলেও তাদের তেমন সমস্যা নেই।

কিন্তু আহমাদ মূসা কখনো এত মানুষের সামনে বক্তব্য দেয়নি। সে কী বলবে, তা ভেবে পাচ্ছিল না হিমু।

আহমাদ মূসা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— আপনি যা যা বললেন, সবই সত্য। এর বিপক্ষে আমার কিছু বলার নেই। আমিও অনেক চিন্তা করে দেখলাম, পুরুষরা আসলেই পশু।

হিমু, শান্ত আর সুমন তীক্ষ্ণ চোখে আহমাদ মূসার দিকে তাকাল। মেয়েরাও যেন বুঝতে পারল না কী বলবে। এভাবে বিনা তর্কে জিততে তারাও চায় না।

হিমু ফিসফিস করে বলল,

— আহমাদ মূসা, কিছু একটা বলো। ত্রিশ মিনিট সময় পেয়েছ। কিছু না বলে এভাবে হার মেনে নিয়ো না।

আহমাদ মূসা শান্ত গলায় বলল,

— কিন্তু উনি যা বলেছেন, সবই তো সত্যি! পুরুষরা স্বার্থপর, পশু, অর্থলোভী, মায়া-মমতাহীন। দায়িত্ব এড়িয়ে চলে, সময় দেয় না। নিজের জন্য সবকিছু করে, ঠিকই তো। একটা পুরুষ একটা মহিলাকে খুশি করতে পারে না। নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তার সঙ্গে সারাজীবন থেকেও একজন নারী নিজের আনন্দ, নিজের ইচ্ছা, নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায় না। এটাই তো পশুর বৈশিষ্ট্য!

পুরো ক্যান্টিন চুপ হয়ে গেল।

আহমাদ মূসার মুখে কথাগুলো এমন ঠান্ডা স্বীকারোক্তির মতো শোনাচ্ছিল যে বিউটি খানের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মলিন হয়ে গেল।

আহমাদ মূসা আবার বলল,

— আমি একটা গল্প বলি। একটা পশুর গল্প। লোকটার নাম বলব না। কারণ, এই কাহিনিতে তার নামের কোনো গুরুত্ব নেই। আমি শুধু লোকটার পশুত্বের বর্ণনা দেব। আপনাদের ঝগড়াটা থামানোই তো এখানে মূল কথা। কে জিতল, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আর আমার গল্পের পুরুষটি এই কাহিনিতে নিতান্তই অপাঙক্তেয়। আপনারা চাইলে তাকে একটা ভালোবাসার গল্পের সহযোগী পার্শ্বচরিত্র ভাবতে পারেন। আমি শুধু তার কাছ থেকে গল্পটা শুনেছি।

পুরো ক্যান্টিনের গুনগুন শব্দ থেমে গেল।

আহমাদ মূসা বলতে শুরু করল,

— যে লোকটার কথা বলছি, তার অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ হয়েছিল পনেরো বছর আগে। লোকটার চেহারা দেখলে আপনারা বুঝতেন, অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ ছাড়া তার কপালে বিয়ে জুটত কি না, সন্দেহ আছে।

যে মেয়েটির সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল, সেই মেয়েটির বাবা জোর করে লোকটার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েটির এক রাজমিস্ত্রির ছেলের সঙ্গে প্রেম ছিল। ধনী-গরিবের ব্যবধানের কারণে মেয়েটির নিষ্ঠুর বাবা সেই প্রেম মেনে নেননি। টাকা আর গয়না নিয়ে রাজমিস্ত্রির ছেলের সঙ্গে পালানোর সময় মেয়েটি ধরা পড়ে। কেলেঙ্কারি ঢাকতে বিষয়টি গোপন রেখে লোকটির সঙ্গে সুন্দরী মেয়েটির বিয়ে দেওয়া হয়।

আপনারা এখানেও দেখছেন, এই সমাজে কীভাবে একটি মেয়ের নিজের পছন্দের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়। একজন সরকারি কর্মকর্তার মেয়ে হয়তো রাজমিস্ত্রির ছেলেকে বিয়ে করে একটি রঙিন ভালোবাসার গল্প লিখতে পারত। কিন্তু তার বাবা সেই স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে নিজের পশুত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।

এরপর লোকটির সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে হলো। বিয়ের প্রথম বছর জৈবিক কারণেই দুজনের মধ্যে মোটামুটি ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এরপর মেয়েটি বুঝতে পারল, সে ঠকছে।

তার স্কুল-কলেজের বান্ধবীদের গাড়ি আছে, বাড়ি আছে, ভারী গয়না আছে। কেউ কেউ বিদেশে থাকে। অথচ লোকটি তাকে রেখেছে মফস্বলের একটি ছোট্ট ভাড়া বাসায়।

মেয়েটি তখন নিজের অধিকার দাবি করল। বিয়ের সময় তার পছন্দের স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি, তাহলে বিয়ের পর কেন সে খারাপ থাকবে? এই সমাজে সে ভালোভাবে বাঁচবে। সেই ব্যবস্থা তার স্বামীকে করতেই হবে। নইলে তাকে বিয়ে করতে কে বলেছিল?

লোকটি আগের চাকরির চেয়ে বেশি বেতনের চাকরি খুঁজতে লাগল। একটা পেয়েও গেল। ভালো বেতন। মেয়েটি ধীরে ধীরে নিজের ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে লাগল। ভালো পোশাক, গয়না কিনে বান্ধবীদের দেখাতে লাগল। তারা বড় একটি ফ্ল্যাটে উঠল।

এরপর লোকটি মেয়েটির গর্ভে সন্তান দিল। মেয়েটি হয়তো আরও স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু ওই যে, পুরুষরা তো পশু!

সন্তান হলো। তাকে বড় করতে হলো। মেয়েটি আবার নিজের অধিকার দাবি করল। সন্তান তো দুজনেরই। তাহলে মেয়েটিকেই কেন একা ঘরে বসে সন্তান পালন করতে হবে?

লোকটি তাই সন্তান দেখাশোনার জন্য আয়া রাখল। মেয়েটি নিজের শ্রেণির নারীদের সঙ্গে আড্ডা দিতে লাগল। যত আড্ডা দেয়, ততই তার মনে হতে লাগল, পশু স্বামীটি তাকে ঠকাচ্ছে। সে আরও ভালো থাকতে পারে। এটা তার অধিকার।

এই শ্রেণির অনেক নারীর গাড়ি আছে। অথচ তার স্বামী তাকে গাড়ি কিনে দেয়নি। অন্যদের স্বামীরা যত টাকা হাতে দেয়, তার স্বামীও তত টাকা দেয় না।

তাকে বিয়ের সময় পছন্দের স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। সুতরাং এই সবকিছু তার প্রাপ্য।

লোকটি স্ত্রীকে খুশি রাখতে ঘুষ খেতে শুরু করল। বউকে গাড়ি কিনে দিল।

আপনারা এখানেও খেয়াল করছেন, লোকটি কত বড় পশু! সে অন্যভাবেও টাকা উপার্জন করতে পারত। কিন্তু সে কী করল? ঘুষ খেয়ে অবৈধ টাকায় স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ করতে লাগল।

তবে বেশিদিন ঘুষ খাওয়া চালিয়ে যেতে পারল না। লোকটি আমাকে যখন কাহিনিটি বলেছিল, তখন তার বক্তব্য ছিল, পাপকাজ করতে নাকি তার বিবেকে বাধত। তবে আপনার বক্তব্য শুনে এখন বুঝতে পারছি, পশুদের আবার বিবেক কীসের!

বিউটি খান নড়েচড়ে বসল। পুরো ক্যান্টিন তখনো নিস্তব্ধ।

আহমাদ মূসা আবার বলতে শুরু করল,

— লোকটি আরও বড় চাকরি খুঁজল। অভিজ্ঞতার কারণে পেয়েও গেল। তবে এই চাকরিতে খাটুনি ছিল বেশি। বেশিরভাগ সময়ই তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হতো।

তবে আপনার কথা শুনে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সে আসলে স্ত্রীর দায়িত্ব নিতে নিতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই নিজের সন্তানের দায়িত্ব স্ত্রীর কাঁধে চাপিয়ে সে দায়িত্ব এড়িয়ে চলত।

লোকটি স্ত্রীকে একটি বাড়ি উপহার দিল। প্রতিদিনের শপিংয়ের টাকা, ঘোরাঘুরির টাকা, পাঁচ তারকা রেস্তোরাঁয় খাওয়ার টাকা, আরও দামি পোশাক, গয়না—সবই দিল।

তবে এসব দিয়ে কি তার স্ত্রী যে সন্তান ধারণ করল, সন্তান জন্ম দিল, তাকে লালন-পালন করল, ঘরের কাজ করল, স্বামীর সঙ্গে রাত কাটাল—সেসবের মূল্য পরিশোধ হয়ে যায়?

না, হয় না।

অতএব, লোকটি এখনো তার স্ত্রীকে ঠকিয়েই গেল।

এদিকে তার স্ত্রী বুঝতে পারল, স্বামী তাকে আর সময় দেয় না। সে অভিযোগ করল, একজন নারী হিসেবে তারও তো কিছু চাহিদা আছে। তার স্বামী সেগুলো পূরণ করে না।

লোকটির বক্তব্য ছিল, সে তো সময়ই পায় না। সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত গাধার মতো খাটে।

তবে আপনার কথা শুনে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার কথাই ঠিক। বউ পুরোনো হয়ে গেলে পুরুষদের আগ্রহ কমে যায়!

বিউটি খান মুখ কুঁচকে বসে রইল। রাহিয়া আর তিথির মাথা নিচু হয়ে গেল। মিম বিস্মিত চোখে আহমাদ মূসার দিকে তাকিয়ে রইল।

আহমাদ মূসা বলল,

— মেয়েটি আর কী করবে? স্বামী সময় দেয় না। খুব কষ্ট পেল সে। নিজেকে গুরুত্বহীন মনে করতে লাগল।

এরপর একদিন মেয়েটির সঙ্গে ঘটনাক্রমে সেই পুরোনো প্রেমিক রাজমিস্ত্রির ছেলেটির দেখা হলো। প্রথম প্রথম মেয়েটি তাকে এড়িয়ে চলল। কিন্তু তার মনে হতে লাগল, বিয়ের সময় যদি তার পছন্দের স্বাধীনতা থাকত, তাহলে হয়তো এই ছেলেটিই তার স্বামী হতো। হয়তো রাজমিস্ত্রির ছোট্ট ঘরেই সে আরও সুখে থাকত।

অবশেষে স্বামীর অবহেলার অজুহাতে মেয়েটি সেই পুরোনো প্রেমিককে নিজের ঘরে জায়গা দিল।

একদিন মেয়েটি বুঝতে পারল, সে আবার গর্ভবতী হয়েছে। কিন্তু এটাও বুঝতে পারল, এই সন্তান তার স্বামীর নয়। এটি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণও নয়। এটি তার আর সেই রাজমিস্ত্রির ছেলেটির ভালোবাসার ফসল।

মেয়েটি ভাবল, তার এই ভালোবাসার ফসল স্বামীর টাকায়, স্বামীর পরিচয়ে ভালোভাবে বেড়ে উঠবে। আর স্বামী লোকটির জন্য এটাই প্রাপ্য। আপনারাও নিশ্চয়ই মানবেন। বউকে সময় না দিয়ে শুধু অর্থের পেছনে ছোটা পুরুষের এমন পরিণতিই হওয়া উচিত!

তবে একদিন অসুস্থ বোধ করায় লোকটি তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে এল। এসে নিজের বিছানায় স্ত্রী আর সেই রাজমিস্ত্রির ছেলেটিকে দেখতে পেল।

লোকটি আমাকে বলেছিল, সেই মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল, কেউ যেন তার বুকের ওপর হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে পাঁজর ভেঙে দিয়েছে।

তবে আপনাদের কথা শুনে এখন বুঝতে পারছি, এসব আসলে ফালতু কথা। পুরুষরা তো পশু, তাই তাদের কোনো আবেগ-অনুভূতি নেই!

পুরো ক্যান্টিনে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল। এতক্ষণ যারা বক্তৃতার বিষয় দেখে মজা নিচ্ছিল, তারাও চুপ করে শুনতে লাগল।

আহমাদ মূসা আবার বলল,

— লোকটি নাকি কয়েক দিনের জন্য শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময় রাজমিস্ত্রির ছেলেটি তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলে পরিকল্পনা করেছিল, পেটের সন্তানটি নষ্ট করবে এবং থানায় অভিযোগ করবে যে স্বামী লাথি মেরে স্ত্রীর গর্ভের সন্তান নষ্ট করেছে। এরপর পালিয়ে গেছে। রাজমিস্ত্রির ছেলেটি সাক্ষী দেবে।

কয়েক দিন পর লোকটি ফিরে আসতেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। সব আলামত নাকি তার বিরুদ্ধে ছিল।

আমার ধারণা, লোকটি যেহেতু পশু, সে আসলেই তার স্ত্রীর পেটে লাথি মেরে সন্তানটি নষ্ট করেছে। পরে আমার সামনে অসহায় সাজার জন্য মিথ্যা গল্প বানিয়েছে।

যাই হোক, জেলে থাকতেই লোকটির স্ত্রী তাকে ডিভোর্সের নোটিশ পাঠিয়ে দিল এবং রাজমিস্ত্রির ছেলেটিকে বিয়ে করল। ডিভোর্সের পর খোরপোষের টাকা হিসেবে লোকটির কাছ থেকে অনেক টাকা নিয়ে নিল মেয়েটি। বাড়ি আর গাড়িও মেয়েটির নামেই কেনা হয়েছিল।

লোকটি জেল থেকে বের হতে উকিলের পেছনে প্রচুর টাকা খরচ করল। শেষ পর্যন্ত জেল থেকে বের হলো সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে।

লোকটি নাকি তার প্রথম সন্তানকে একনজর দেখতে ছেলেটির স্কুলে গিয়েছিল। ছেলেটি তাকে দূর থেকে দেখেই চিৎকার করে উঠেছিল,

— ওই লোকটাকে সরাও! ও একটা শয়তান! ও আমার মাকে কষ্ট দিয়েছে!

লোকটি আমাকে পরশুদিন বলেছিল, ছেলেটিকে একবার দেখার খুব ইচ্ছা করে তার। জীবনের শেষ ইচ্ছা নাকি একটাই—ছেলেটি যেন একদিন জানতে পারে, তার বাবা নিরপরাধ ছিল।

কিন্তু আমার ধারণা, এরকম জঘন্য পশুদের জীবনের কোনো ইচ্ছাই পূরণ হওয়া উচিত নয়!

সবাই চুপ।

পিনপতন নীরবতা।

হঠাৎ একটা কাঁপা কাঁপা শব্দ শোনা গেল। রাহিয়া ঠোঁট কাঁপছে।

রাহিয়া বলল,

— লোকটার সঙ্গে কি একবার দেখা করতে পারি আমরা?

আহমাদ মূসা বলল,

— পশুর সঙ্গে দেখা করবেন কেন? ও যে পশু ছিল, তার প্রমাণ তো আজ অনেক পেয়েছি। কিন্তু আগে বুঝিনি। লোকটা গত রাতে মারা গেছে।

আমি আজ নিজের হাতে ওর লাশ গোসল করিয়েছি। নিজ হাতে মাটি দিয়েছি। ও পশু ছিল। তাই ওর জানাজায় কেউ আসেনি। কোনো আত্মীয়ও না। আমি আর ইমাম সাহেব ছাড়া জানাজায় আর কেউ ছিল না। পশুদের জানাজায় কে আসবে, বলেন?

আর বাই দ্য ওয়ে, আমি ভেবেছিলাম লোকটার শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করব। ওর ছেলেকে জানাব, ওর মা ওর বাবার সম্পর্কে যা যা বলেছে, সব মিথ্যা। ওর বাবা আসলে একজন সহজ-সরল মানুষ ছিল। যে তার স্ত্রীকে, একেবারে অজানা-অচেনা একজন নারীকে, প্রথম দিন থেকেই পাগলের মতো ভালোবেসে এসেছে।

কিন্তু না, আমি আর বলব না। মিস বিউটি খান আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। লোকটা একটা পশু ছিল। যুক্তি তো তাই বলে!

বিউটি খান উঠে চলে গেল।

মিম কাঁদতে লাগল। হয়তো পঁয়ত্রিশজন মানুষের অর্ধেকের বেশি চোখেই তখন পানি। কিন্তু এত রাতে কে আর সেদিকে খেয়াল করে?

হিমু আর আহমাদ মূসা ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে এল।

কিছুদূর যাওয়ার পর আহমাদ মূসা হিমুকে বলল,

— ফুলের দোকান কি রাতে খোলা পাওয়া যাবে? আর একটা ব্রাশ ও সাদা রং লাগবে।

হিমু মাথা নাড়ল। কোনো কথা না বলে তাকে নিয়ে দোকানের দিকে এগিয়ে গেল।

ফুল, সাদা রং আর তুলি নিয়ে তারা গোরস্তানে গেল।

একটি নিঃসঙ্গ নতুন কবরে ফুল রেখে আহমাদ মূসা সাইনবোর্ডের কাছে দাঁড়াল। সেখানে অপাঙক্তেয় নামটির নিচে সাদা রং দিয়ে তুলি চালিয়ে লিখল,

“এখানে একটা পশু শুয়ে আছে। তাকে দুনিয়ার সকল পশুসমাজের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানানো হলো। আমরা গর্বিত, আমরা পশু।”

একটা ঠান্ডা হাওয়া আশপাশ দিয়ে বয়ে গেল।

এখানে পেছনে একটা গান বাজছিল—

“আমার সবটুকু বিশ্বাস যে দিয়েছে ভেঙে,
তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই,
সে যে দিয়েছে আমার অন্ধ চোখে আলো।

যার বিশালতার মাঝে আমি পাইনি একটুকু ঠাঁই,
তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই,
সে দিয়েছে আমায় মহাশূন্যের বুকে আশ্রয়।”

শহরের অভিজাত এলাকায় একটি আলিশান বাড়ি।

একটি ঘরে সুন্দরী মেয়েটি তার স্বামী, সেই রাজমিস্ত্রির ছেলেটির সঙ্গে হাসিমুখে গল্প করছে। তাদের ঘরে নতুন অতিথি আসছে। তারা হয়তো সারাজীবন সুখে-শান্তিতে কাটাবে।

জীবনটা যেন রূপকথার গল্পের মতো সুন্দর!

পাশের ঘরে সুন্দরী মেয়েটির প্রথম সন্তান, সেই কিশোর ছেলেটি পড়াশোনা করছে।

খোলা জানালার অনেক দূরে দাঁড়িয়ে একটি সাদা অবয়ব তাদের দেখছে। মুখে তৃপ্তির হাসি।

ওপারে যাওয়ার আগে প্রাণভরে তাদের একবার দেখতে চেয়েছিল সে। বেঁচে থাকতে সেই সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি।

“তবু স্বর্গদ্বারে দাঁড়িয়ে একা থাকব তার অপেক্ষায়,
যেন আমার অভ্যর্থনা তাকে করে অনুতপ্ত।
জানি, তখনো সে আমার হবে না,
তবুও ওই অপ্রাপ্তিটাই যেন আমায় করে পরিপূর্ণ।”

সাদা অবয়বটি ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে গেল।

পৃথিবীর বুক থেকে একটা পশুর অনন্ত যাত্রা শুরু হলো।

সমাপ্ত।