পর্ব-০২: মনুষ্যত্ব

বাই দ্য ওয়ে, এবার আসল গল্পে আসা যাক।

শুরুটা করেছিলাম যে ঘটনা দিয়ে, সেখানেই ফিরে যাই।

হিমু, শান্ত আর সুমন নারী-পুরুষের সমঅধিকারের ঘোরতর বিরোধী। অন্যদিকে মিম, রাহিয়া আর তিথি নারী-পুরুষের সমঅধিকারের পক্ষে সোচ্চার। তবে এবারের ঝগড়াটা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল।

বিশেষ করে সুমন যখন নারীদের ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি রাখার সমঅধিকারের দাবিতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করল, তখন মেয়েরা তাকে সংবেদনশীল বিষয়ে আঘাত করার গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত করল।

কিন্তু বাকি দুই বন্ধু সুমনের প্রস্তাবে প্রাণ খুলে হাসতে শুরু করায় মেয়েদের ক্ষোভ আরও বেড়ে গেল।

ফলাফল, মেয়েরা সেই যে চলে গেল, পরবর্তী তিন দিন ছেলেদের বিরুদ্ধে মৌন প্রতিবাদ চালিয়ে গেল।

এখন ছেলেদেরও তো কিছু সমস্যা আছে!

তারা ক্লাস ফাঁকি দেয়, মেয়েদের দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট লিখিয়ে নেয়, নোট সংগ্রহ করে। এই তিন দিন এসব সুবিধা বন্ধ থাকায় তাদের মধ্যে একধরনের আশঙ্কা তৈরি হলো।

কিন্তু সরি বললে তো মেয়েরা জিতে যাবে!

তাই সরাসরি ক্ষমা না চেয়ে তারা মেয়েদের কাছে একটা প্রস্তাব উত্থাপন করল।

নারী-পুরুষের সমঅধিকার থাকা উচিত কি না, এই দেশে নারীরা প্রতিনিয়ত নিগৃহীত হয় কি না, আর পুরুষরা আসলেই খারাপ কি না, এসব বিষয় নিয়ে একটি চূড়ান্ত বিতর্কের আয়োজন করা হবে।

তর্ক শুরু হলে যে সেটা আর যুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা ছয়জনই জানে। তাই এবার একটু ভিন্ন ব্যবস্থা করা হলো।

ঠিক হলো, বৃহস্পতিবার রাতে ক্যান্টিনে ছয়জন উপস্থিত হবে। সঙ্গে থাকবে দুজন অতিথি। তাদের বয়স ছয় বন্ধুর চেয়ে কিছুটা বেশি। একজন ছেলেদের পক্ষে কথা বলবে, অন্যজন মেয়েদের পক্ষে।

বয়সে বড়, পরিণত এবং অপরিচিত মানুষ। সুতরাং তাদের উপস্থিতিতে অন্তত গালাগালির মাত্রাটা কম থাকবে বলে আশা করা যায়।

বিতর্কের বিষয়ও ঠিক করা হলো।

"পুরুষরা জঘন্য পশু!"

নারীরা এই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দেবে, আর পুরুষরা বিপক্ষে।

মেয়েরা তাদের পক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিল একটি নারী সংগঠনের জুনিয়র নেত্রীকে। তার নাম বিউটি খান।

তিনি আবার তসলিমা নাসরিনের বিশেষ ভক্ত। চুলের স্টাইল থেকে পোশাক-আশাক, সবকিছুতেই সেই নারীবাদী লেখিকার প্রভাব স্পষ্ট।

অন্যদিকে শান্ত আর সুমন ছেলেদের পক্ষে লড়ার জন্য প্রতিনিধি ঠিক করার দায়িত্ব হিমুর ওপর ছেড়ে দিল।

শান্ত বলল,

"দোস্ত, তোর ওপর আমাদের আস্থা আছে। ভালো কাউকে নিয়ে আসিস।"

সুমনও মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

এই বলে দুজন সিনেমা দেখতে চলে গেল।

হিমু অবশ্য আগেই ঠিক করে রেখেছিল, কাকে নিয়ে আসবে।

আহমাদ মূসাকে!

আহমাদ মূসা তাদের চেয়ে বয়সে বড়। একটু পাগলাটে স্বভাবের মানুষ। আর তার সবচেয়ে বড় গুণ হলো, উদ্ভট সব যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে নিজের অজান্তেই স্তব্ধ করে দিতে পারে।

হিমু সেটা ভালো করেই জানে।

একবার তো আহমাদ মূসাকে জঙ্গি ভেবে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে এসেছিল। অথচ আহমাদ মূসা তাদের এমনভাবে ওয়াটসন ও ক্রিকের ডিএনএ মডেলের ভুল নিয়ে কয়েকটি হাইপোথিসিস শোনাতে শুরু করেছিল যে, পুলিশ গ্রেপ্তার করতে এসে শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল!

এ ছাড়া এমা ওয়াটসনকে বিয়ে করার একটি ফুলপ্রুফ পরিকল্পনাও একবার হিমুকে শুনিয়েছিল আহমাদ মূসা।

পরিকল্পনাটা শুনে হিমুর আর কিছু বলার ছিল না।

কারণ, সেই পরিকল্পনার মূল কথা ছিল, পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে শুধু আহমাদ মূসা আর এমা ওয়াটসন বেঁচে থাকবে। তাহলে বিয়ে না হওয়ার আর কোনো কারণই থাকবে না!

যাই হোক, এসব অভিজ্ঞতার পর হিমু নিশ্চিত হয়ে গেল, এই বিতর্কে আহমাদ মূসাকে নিয়ে গেলে এক মিনিটের মধ্যেই মেয়েরা চুপ হয়ে যাবে।

আর সেটা হওয়াও জরুরি। কারণ, বিতর্কের পর সব অভিমান ভুলে আবার আগের মতো বন্ধুত্বে ফিরে আসার পরিকল্পনা সবারই আছে।

অবশেষে বৃহস্পতিবার চলে এল।

সেদিন ছয় বন্ধুর কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল না। রাতে ক্যান্টিনে উপস্থিত হবে সবাই।

মেয়েরা বিউটি খানকে সঙ্গে নিয়ে বিতর্কের বিষয়বস্তু বুঝিয়ে দিতে লাগল। এমনকি কোথায় কী যুক্তি দিতে হবে, তার একটা ছোটখাটো মহড়াও চলল।

অন্যদিকে শান্ত আর সুমন দাবা খেলায় ব্যস্ত।

আর হিমু গেল আহমাদ মূসার ঘরে। উদ্দেশ্য, তাকে বিতর্কের বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়া।

কিন্তু ঘরে গিয়ে দেখল, আহমাদ মূসা নেই।

হিমু ফোন দিল।

ফোন বেজে উঠল ঘরের ভেতরেই।

আহমাদ মূসা ফোন বাসায় রেখে গেছে!

হিমু এবার একটু ভালো করে ঘরটা লক্ষ করল। ঘরের অবস্থা দেখে তার মনে হলো, আহমাদ মূসা সম্ভবত সারা রাত বাসায় ছিল না। অথচ সে এতক্ষণ বিষয়টা খেয়ালই করেনি।

হিমুর চিন্তা হতে লাগল। নিজের ওপরই রাগ হলো তার। বন্ধুর খোঁজখবর রাখার মতো দায়িত্বটুকুও সে ঠিকমতো পালন করছে না!

কী করবে বুঝতে পারছিল না।

প্রায় এক ঘণ্টা পর আহমাদ মূসা হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ফিরল।

ঘরে ঢুকেই নিজের রুমে গেল। কিছু টাকা বের করল। তারপর হিমুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই জিজ্ঞেস করল,

"কাফনের কাপড়, আতর, লোবান এগুলো কোথায় পাওয়া যায়, জানিস?"

হিমু অবাক হয়ে চোখ বড় করে তাকাল।

"কেন? এসব জিজ্ঞেস করছিস কেন?"

আহমাদ মূসা খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

"একটা লাশ দাফন করব।"

হিমু কয়েক মুহূর্তের জন্য বোবা হয়ে গেল।

"লাশ! কার লাশ? তোর তো কোনো আত্মীয়স্বজন নেই!"

আহমাদ মূসা তাড়াহুড়ো করতে করতে বলল,

"পার্কে একজন লোকের সঙ্গে কথা হতো। তার লাশ। তাড়াতাড়ি বল তো, কোথায় পাব? গোসল করানো বাকি। হুজুর ডাকতে হবে, চাটাই, বাঁশ কিনতে হবে। খাটিয়া লাগবে না। চারজন লোক আমি কোথায় পাব? শুধু আমি আর হুজুর থাকব।"

হিমু এবার পুরোপুরি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।

"কী বলিস এসব? একটু খুলে বলবি তো!"

আহমাদ মূসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

"সময় নেই। সন্ধ্যার আগে ফিরতে হবে। রাতে আবার তোর কী একটা মিটিংয়ে যেতে হবে না আমাকে নিয়ে?"

হিমু আর কিছু বলল না।

আহমাদ মূসা নিজের ঘরে চলে গেল। যেতে যেতে বিড়বিড় করে কী যেন বলতে লাগল।

একটু পর আবার ডাকল,

"হিমু, তোর কাছে কি দোয়ার বই আছে?"

"আছে। কেন?"

"মানে জানাজার দোয়া, লাশ গোসলের দোয়া, কবর দেওয়ার দোয়া, মাটি দেওয়ার দোয়া, এসব আছে?"

হিমু অবাক হয়ে বলল,

"দোয়ার বই আছে। কিন্তু এসব তুই জেনে কী করবি?"

আহমাদ মূসা খুব গম্ভীরভাবে উত্তর দিল,

"সব আমাকেই করতে হবে। অনেক দায়িত্ব!"

হিমু এবার বলল,

"অজ্ঞাত লাশ নাকি? তাহলে আঞ্জুমানে মফিদুলে খবর দে। ওরা দাফনের ব্যবস্থা করবে।"

আহমাদ মূসা অবাক হয়ে তাকাল।

"অজ্ঞাত হবে কেন? আমি তো লোকটার নাম জানি। একদিন পার্কে আমাকে বাদাম খাইয়েছিল।"

হিমু আর কোনো কথা খুঁজে পেল না।

আহমাদ মূসা এবার দোয়ার বই নিয়ে বসে পড়ল। লাশ গোসলের দোয়া, জানাজার দোয়া, কবর দেওয়ার দোয়া, সব মুখস্থ করার চেষ্টা করতে লাগল।

এদিকে হঠাৎ পাশের বাড়ির বাড়িওয়ালার চিৎকার শোনা গেল।

"আরে! আরে! ওই বাড়ির নিচতলায় লাশ রাখছে কে? তাও আবার এরকম উদলা অবস্থায়!"

হিমু আর আহমাদ মূসা একে অপরের দিকে চোখ বড় করে তাকাল।

হিমু অবিশ্বাসের সুরে বলল,

"তুই লাশ বাসায় নিয়ে এসেছিস? তাও আবার নিচে খোলা জায়গায়?"

আহমাদ মূসা আর কোনো কথা না বলে দোয়ার বই বন্ধ করল। তারপর এক দৌড়ে নিচে নেমে গেল।

পাশের বাড়ির বাড়িওয়ালা তখনও চিৎকার করছে।

"আরে, ওই বাড়ির পাগল ব্যাচেলরটা না? যে রাস্তা থেকে কলার খোসা কুড়িয়ে বেড়ায়? আরে, লাশ কোলে নিয়ে যায় কোথায়? ও আল্লাহ! এ কী!"

হিমু জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, আজকের দিনটা সম্ভবত স্বাভাবিকভাবে শেষ হবে না।

দুপুরের দিকে হিমুর মোবাইলে ফোন এল।

ওপাশ থেকে আহমাদ মূসা বলল,

"হিমু, দোয়ার বইটা খোল তো।"

"কেন?"

"লাশ গোসলের দোয়াটা আবার পড়ে শোনা।"

হিমু বই খুলে দোয়া পড়তে শুরু করল।

ওপাশে আহমাদ মূসাও একসঙ্গে সেগুলো আওড়াতে লাগল। আর হিমু শুনতে পেল পানি ঢালার শব্দ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো।

আবার ফোন।

এবার আহমাদ মূসা জানতে চাইল, মাটি খোঁড়ার পর লাশ কবরে নামানোর দোয়াটা কোথায় আছে।

সে নাকি তাড়াহুড়োর চোটে ভুলে গেছে!

হিমু বই দেখে পড়ে শোনাল। আহমাদ মূসা সেগুলো পুনরাবৃত্তি করতে লাগল।

এবার ফোনের ওপাশ থেকে শোনা যাচ্ছিল মাটি খোঁড়ার শব্দ। সেই সঙ্গে আহমাদ মূসার ক্লান্তিতে হাঁপানোর আওয়াজ।

সন্ধ্যার কিছু আগে আহমাদ মূসা বাসায় ফিরল।

সারা গায়ে মাটি লেগে আছে। কাপড়চোপড়ের অবস্থাও বেশ করুণ। মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।

সে ঘরে ঢুকে হিমুর দিকে তাকাল। তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,

"হিমু, এই মাসের ভাড়াটা আমি দিতে পারব না।"

হিমু অবাক হয়ে তাকাল।

"কেন? কী হয়েছে?"

আহমাদ মূসা ক্লান্ত চোখে উত্তর দিল,

"বাজেট করেছিলাম যা, তার চেয়ে বেশি খরচ হয়ে গেছে। গোরস্তানের লোকেরা বলল, কবরের চারপাশে বেড়া না দিলে নাকি শিয়ালে লাশ তুলে নিয়ে যায়। তাই বেড়া আর একটা সাইনবোর্ড কিনতে হয়েছে।"

হিমু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

"তুই একটা অচেনা মানুষের জন্য কবরের বেড়া পর্যন্ত কিনে ফেলেছিস?"

আহমাদ মূসা ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় ছেড়ে দিয়ে বলল,

"অচেনা মানুষ হবে কেন? লোকটা তো আমাকে বাদাম খাইয়েছিল!"

হিমু আর কিছু বলল না।

কিন্তু তার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল।

যে মানুষটার সঙ্গে আহমাদ মূসার পরিচয় ছিল মাত্র কয়েক দিনের, সেই মানুষের মৃত্যুর পর তার দাফন-কাফনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার প্রয়োজন সে অনুভব করল কেন?

একটা বাদাম খাওয়ানোর ঋণ কি এতটাই বড়?

নাকি আহমাদ মূসার কাছে মানুষের পরিচয়ের চেয়েও বড় কিছু আছে?

হয়তো সেটাই মনুষ্যত্ব।

[চলবে...]