পর্ব-০১: মনুষ্যত্ব

সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে নারীবাদী আর নারীবিদ্বেষীদের মধ্যে বেশ তুমুল তর্ক হয়েছিল।

ক্লাসের ফাঁকে ছয় বন্ধুর আড্ডা বসেছিল। তিনজন মেয়ে, তিনজন ছেলে। হঠাৎ কথার ফাঁকে কীভাবে যেন নারী-পুরুষের সমঅধিকারের প্রসঙ্গ চলে এল। আর তাতেই শুরু হলো বিপত্তি।

ছেলেদের তিনজন, শান্ত, হিমু আর সুমন। অন্যদিকে মেয়েরা রাহিয়া, মিম আর তিথি। প্রথমে ছেলেরা যুক্তি দিয়ে কথা শুরু করলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই যুক্তির জায়গা দখল করে নিল টিটকারি। তারপর সেই টিটকারিও ধীরে ধীরে অযৌক্তিকতার সীমানা পেরিয়ে অশ্লীলতায় গিয়ে ঠেকল।

মেয়েরাও কম যায় না। যৌক্তিক কথার জবাবে কখনো অযৌক্তিক যুক্তি, কখনো পাল্টা বিদ্রূপ, আর শেষ পর্যন্ত অশ্রাব্য গালাগালি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে মেয়েরা আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকা সমীচীন মনে করল না। ঝড়ের বেগে ক্যান্টিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল তিনজন।

অবশ্য এমন ঘটনা তাদের মধ্যে নতুন নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই ছয়জনের বন্ধুত্ব। আড্ডা, ঘোরাঘুরি, অ্যাসাইনমেন্ট, বিপদ-আপদ, সবকিছুতেই তারা একসঙ্গে। একজনের বিপদে অন্যজন দেশের এক প্রান্তে থাকলেও ছুটে আসে। নিজেদের জীবনের ছোট-বড় সবকিছুই ভাগাভাগি করে নেয় তারা।

বন্ধুত্বে কোনো কমতি নেই। শুধু একটা বিষয়ে তাদের মতের মিল হয় না, নারী-পুরুষের সমঅধিকার।

মেয়েরা স্বভাবতই নারী-পুরুষের সমঅধিকারের পক্ষে কথা বলে। ছেলেরা আবার সুযোগ পেলেই তাতে খুঁত ধরতে শুরু করে।

মেয়েরা যখন নারী নির্যাতনের উদাহরণ টানে, ছেলেরা তখন সমঅধিকারের যুক্তি মেনে নিয়ে নারীদের জন্যও পুরুষদের মতো টয়লেটে ইউরিনালের ব্যবস্থা করার দাবি তোলে। তাদের যুক্তি, পুরুষদের জন্য যদি দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার ব্যবস্থা থাকতে পারে, তাহলে সমঅধিকারের স্বার্থে নারীদের জন্যও তেমন ব্যবস্থা থাকা উচিত!

কেউ কেউ আবার নারীদের গোঁফ রাখার অধিকারের কথা বলে। কেউ ফ্রেঞ্চকাট দাড়ির অধিকার নিয়েও আলোচনা শুরু করে।

ব্যস! মেয়েদের আর সহ্য হয় না।

শেষ পর্যন্ত সেই বিখ্যাত সংলাপ, "শালার পো শালা!"

তারপর তিনজনের প্রস্থান।

তবে মজার ব্যাপার হলো, দুই দিন যেতে না যেতেই সব অভিমান, রাগ আর তর্ক ভুলে ছয়জন আবার আগের মতো হয়ে যায়।

বন্ধুত্ব বোধহয় এমনই। কিছু বিষয়ে মতের অমিল থাকলেও মানুষগুলোকে ছেড়ে থাকা যায় না।

শান্ত আর সুমন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকে। হিমু থাকে বাইরে একটি ফ্ল্যাটে। তার সঙ্গে রুম শেয়ার করে আরেকজন ছেলে। অন্যদিকে রাহিয়া, মিম আর তিথি একসঙ্গে একটি ফ্ল্যাটে থাকে।

সবাইকে ঘিরে চলতে থাকে নগরীর ব্যস্ত জীবন।

শহরের প্রতিটি বহুতল ভবনের জানালাগুলো যেন নীরব দর্শক। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের ছোটাছুটি, হাসি, কান্না, প্রেম, বিচ্ছেদ আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম দেখে যায় তারা। মানুষের নির্বাক চোখের মতোই যেন জানালাগুলোও বলতে চায়,

"দেখে যাও তোমরা। আমি কত শত গল্পের নীরব সাক্ষী! এসব গল্প নিয়ে সিনেমা বানালে হয়তো অস্কার পাবে, বই লিখলে পাঠকের চোখের পানিতে ভিজে যাবে প্রতিটি পাতা। অথচ এসব গল্পের অধিকাংশই কোনো দিন কারও জানা হবে না।"

ছয় বন্ধু একে অপরকে নিজেদের বেস্ট ফ্রেন্ড বলে পরিচয় দিলেও, তাদের একজনের বেস্ট ফ্রেন্ড কিন্তু আলাদা।

সে হিমু।

হিমুর বেস্ট ফ্রেন্ডের নাম আহমাদ মূসা।

কথাটা হিমু কখনো প্রকাশ্যে স্বীকার করে না। এমনকি তার বাকি পাঁচ বন্ধুর কেউই জানে না, মাত্র দেড় বছর আগে পরিচিত হওয়া একজন মানুষ কীভাবে তার পাঁচ বছরের পুরোনো বন্ধুত্বের জায়গায় আলাদা একটি আসন দখল করে নিয়েছে।

আহমাদ মূসা হিমুর চেয়ে প্রায় পাঁচ-ছয় বছরের বড়। দেড় বছর আগে কম ভাড়ায় একটি ফ্ল্যাটে সাবলেট পাওয়ার সুযোগে সে হিমুর সঙ্গে থাকতে আসে।

হিমু একা মানুষ। অবস্থাপন্ন বাবার টাকায় বেশ ভালো ফ্ল্যাটেই থাকে। কিন্তু ফ্ল্যাটটা একটু বড় হওয়ায় মাঝেমধ্যে একা থাকতে তার বিরক্ত লাগত। তাই একটি রুম ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

আহমাদ মূসা যখন প্রথম হিমুর সঙ্গে থাকতে আসে, তার চালচলন দেখে হিমুর মাথায় একের পর এক সন্দেহ তৈরি হতে থাকে।

লোকটা একেবারেই ঘরকুনো। কারও সঙ্গে মেশে না, অপ্রয়োজনে বাইরে যায় না। নিজের ঘরে বসে কী যেন গবেষণা করে। তার ওপর ঘরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি।

হিমু প্রথমে তাকে জঙ্গি, তারপর মাদক ব্যবসায়ী, এমনকি পেশাদার খুনি পর্যন্ত ভেবে ফেলেছিল!

একবার তো সন্দেহের বশে পুলিশও ডেকে বসেছিল।

পরে জানা গেল, আহমাদ মূসার ঘরে বোমা বানানোর সরঞ্জাম ভেবে হিমু যেগুলো দেখে ভয় পেয়েছিল, সেগুলো আসলে প্লাস্টিকের তৈরি একটি ডিএনএ মডেল!

আহমাদ মূসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেছে। ভালো ফলাফল করায় বিদেশে চাকরি ও গবেষণার সুযোগও পেয়েছিল। কিন্তু দেশ ছেড়ে যাবে না, এই প্রতিজ্ঞায় বিদেশের সুযোগ ফিরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশেই থেকে যায়।

বাংলাদেশে ভালো ফলাফলের মূল্যায়ন হয় কি না, সে প্রশ্নের উত্তর আহমাদ মূসার জীবনের দিকে তাকালেই পাওয়া যায়।

যে ছেলেটি বিদেশের কোনো গবেষণাগারে ভালো বেতনে কাজ করতে পারত, সেই ছেলেটিই দেশে ফিরে প্রায় এক বছর বেকার ছিল। শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার তাগিদে এখন এক কোচিং সেন্টার থেকে আরেক কোচিং সেন্টারে ঘুরে অল্প টাকায় ক্লাস নেয়।

তবে আহমাদ মূসার এতে কোনো অভিযোগ নেই।

তার নাকি বাবা-মা কেউ নেই।

মা বলতে ছোটবেলায় বাংলা বইয়ে যে দেশের মাটিকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করতে শেখানো হয়েছিল, আহমাদ মূসার কাছে সেই মাটিই তার মা হয়ে গেছে। মাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না সে। জীবনের শেষ দিনটাও কাটাতে চায় মায়ের বুকেই। মৃত্যুর পরও যেন মায়ের বুকেই শেষ ঘুমটা দিতে পারে।

তবে দেশের মাটিকে মা ভাবার বিষয়টাকে আহমাদ মূসা একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছে।

কেউ যদি রাস্তার পাশে কলার খোসা ফেলে, কিংবা যেখানে-সেখানে ময়লা ছুড়ে দেয়, আহমাদ মূসা সেটা সহ্য করতে পারে না। তার কাছে মনে হয়, কেউ যেন তার মায়ের বুকেই ময়লা ফেলেছে। তাই নিজের হাতেই সেই ময়লা তুলে ডাস্টবিনে ফেলে আসে।

অবশ্য শার্ট-প্যান্ট পরা সুন্দর চেহারার একটি ছেলেকে দুপুরবেলা রাস্তার ময়লা ঘাঁটতে দেখলে দৃশ্যটা খুব একটা স্বাভাবিক লাগে না।

কিন্তু আহমাদ মূসার কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই।

তার কাছে দেশপ্রেম মানে শুধু বড় বড় বক্তৃতা দেওয়া নয়। দেশের মাটিকে ভালোবাসলে সেই মাটির পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বও নিজের কাঁধে নিতে হবে।

আহমাদ মূসার এমন কিছু চিন্তাভাবনা আছে, যেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে নিখাদ পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়।

তারপরও আহমাদ মূসা হিমুর বেস্ট ফ্রেন্ড।

দেড় বছর আগেও হিমুর বাইরে থেকে ভালো থাকার একটা অভিনয় ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঘোরাঘুরি, হাসি-ঠাট্টা, সবকিছুই চলত। কিন্তু বন্ধুরা চলে গেলে ফ্ল্যাটে ফিরে এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করত। সেই একাকিত্ব ধীরে ধীরে তাকে বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।

আহমাদ মূসা আসার পর থেকে কেন যেন সেই শূন্যতাটা আর আগের মতো অনুভব হয় না।

আহমাদ মূসার অদ্ভুত চিন্তাভাবনা, অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত আর অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ড মাঝেমধ্যে হিমুকে এমন সব বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে, যেগুলো থেকে বের হওয়ার কথা হিমু নিজেও ভাবতে পারত না।

তবে তাদের বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে ওঠার ঘটনাটা একটু অন্যরকম।

সেটার বর্ণনা দিয়েই পরিচয় পর্ব শেষ করব।

কারণ, আসল গল্পের সামান্যতম আভাসও এখনো দেওয়া হয়নি।

বেশি বড় গল্প লেখা যাবে না। লুতুপুতু প্রেমের গল্প ছাড়া বড় গল্প পড়া মানুষের ধর্ম নয়! মানুষ আজ বড়ই ব্যস্ত। এত সময় কোথায়?

যাই হোক।

হিমু আর আহমাদ মূসা যে ফ্ল্যাটে থাকে, তার পাশের বিল্ডিংয়ের বাড়িওয়ালার মেয়ের প্রতি একসময় হিমুর বেশ দুর্বলতা ছিল।

বাড়িওয়ালা লোকটা ছিল ভীষণ খিটখিটে। নিজের মেয়েকে চোখে চোখে রাখত। মেয়েকে নিয়ে তার সতর্কতার শেষ ছিল না।

কিন্তু আহমাদ মূসার কাছ থেকে হিমু পরে জানতে পারে, মেয়েটির পাড়ার প্রায় প্রতিটি ছেলের সঙ্গেই কোনো না কোনো সময়ে সম্পর্ক হয়েছে!

আহমাদ মূসার দেওয়া এই তথ্যেই হিমুর প্রেমের ইতি ঘটে।

তবে তার আগে রাত বারোটার দিকে মেয়েটির সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো হিমুর। দুজনই নিজেদের বিল্ডিংয়ের ছাদে উঠত। হিমু তাদের বিল্ডিংয়ের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াত, আর মেয়েটি দাঁড়াত তাদের বিল্ডিংয়ের ছাদে।

দুই বিল্ডিংয়ের মাঝখানে দূরত্ব থাকলেও কথার আদান-প্রদানে কোনো সমস্যা হতো না।

এক রাতে মেয়েকে নিজের ঘরে না পেয়ে বাড়িওয়ালা এমন এক হুংকার দিল, যার শব্দে হিমুর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

ভয়ে তাড়াহুড়ো করে সরে যেতে গিয়ে হিমু ভারসাম্য হারিয়ে রেলিং টপকে দুই বিল্ডিংয়ের মাঝখানে পড়ে গেল। তবে ভাগ্য ভালো, নিচে পড়ার আগেই একটি সানশেড ধরে ফেলতে পেরেছিল।

কিন্তু সানশেডটি ছিল পুরোনো। একটু একটু করে সেটি আলগা হয়ে আসছিল।

ঠিক তখনই কোথা থেকে আহমাদ মূসা এসে হাজির!

আহমাদ মূসা হিমুর হাত ধরে ওপরে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু ভয়ে হিমু তার হাত এমনভাবে আঁকড়ে ধরল যে তাকে ওপরে তোলার বদলে উল্টো টান দিয়ে নিচের দিকে নামিয়ে ফেলল।

ফলাফল?

আহমাদ মূসাও ছাদ থেকে পড়ে গেল। তবে হিমুর দুই-তিনতলা নিচে গিয়ে আরেকটি সানশেড ধরে ঝুলে রইল।

এখন দুজনের অবস্থা বেশ করুণ।

হিমু ভয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার বন্ধু আহমাদ মূসাও ঝুলছে। দুজনই এখন সেই খিটখিটে বাড়িওয়ালার বিল্ডিংয়ের সানশেড ধরে ঝুলে আছে।

এদিকে বাড়িওয়ালা লোকটা মেয়ের ব্যাপারে ভীষণ সন্দেহপ্রবণ। সামান্য শব্দ পেলেও সে ছাদে চলে আসতে পারে। আর একবার যদি জানতে পারে, তার মেয়ের সঙ্গে কোনো ছেলে রাতের বেলা কথা বলছিল, তাহলে কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না।

হিমুর জন্য বিষয়টা ভয়ংকর ঝামেলার হয়ে দাঁড়াবে।

আহমাদ মূসার অবশ্য তেমন কোনো সমস্যা নেই। সে সাধারণত ঘর থেকে বের হয় না, কারও সঙ্গে কথাও বলে না। আশপাশের মানুষ তাকে বেশ ভদ্র ও নিরীহ ছেলে হিসেবেই জানে।

চাইলেই আহমাদ মূসা তখন চিৎকার করে সাহায্য চাইতে পারত। হয়তো লোকজন এসে দুজনকেই উদ্ধার করত।

কিন্তু তাতে হিমুর বিপদ বাড়বে।

তাই আহমাদ মূসা কোনো কথা না বলে চুপচাপ ঝুলে রইল।

এভাবেই কেটে গেল পুরো রাত।

একবার ভাবুন, দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একটি বিল্ডিংয়ের সানশেড ধরে ঝুলে আছে, অথচ কেউ কাউকে ডাকতে পারছে না! একজনের ভয়, ধরা পড়লে প্রেমের কেলেঙ্কারি হবে। আরেকজনের ভয়, বন্ধুর কেলেঙ্কারি হবে!

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে দুজনেরই চোখে পড়ল, সানশেডের পাশ দিয়ে একটি পানির পাইপ নিচে নেমে গেছে।

অনেক কষ্টে সেই পাইপ ধরে ধরে দুজনই নিচে নেমে এল।

সেদিনের পর থেকেই আহমাদ মূসা হিমুর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেল।

যদিও কথাটা কেউ জানে না।

কারণ, মানুষ বেস্ট ফ্রেন্ড শব্দটার ব্যাপারে বড় দুর্বল। পাঁচ বছরের পুরোনো বন্ধুরা যদি জানতে পারে, মাত্র দেড় বছর আগে পরিচিত হওয়া একজন আগন্তুক, তাও আবার পাঁচ-ছয় বছরের বড়, তাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধুর সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে গেছে, তাহলে বিষয়টা সহজভাবে নেওয়া কঠিন।

যাই হোক, বয়সে পাঁচ-ছয় বছরের বড় হলেও হিমু আহমাদ মূসাকে নাম ধরেই ডাকে। তুই বলে, দোস্ত বলে। আহমাদ মূসারও এতে কোনো আপত্তি নেই।

আহমাদ মূসা তো আহমাদ মূসাই!

সে নিজের ঘরে বসে বই পড়ে আর ভাবে, ওয়াটসন আর ক্রিকের ডিএনএ মডেলে নিশ্চয়ই কোথাও কোনো ভুল ছিল। সেই ভুলটা তাকে বের করতেই হবে। বের করতে পারলেই নোবেল পুরস্কার বুঝি তার হাতে এসে যাবে!

হিমুর জোরাজুরিতে অবশ্য মাঝেমধ্যে বাইরে বের হয়।

পার্কে গিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য সুঠাম রাখার প্রত্যয় দেখে। প্রেমিক-প্রেমিকাদের ঝোপের আড়ালে ঢুকতে দেখে নিরাপত্তারক্ষীর হাতে পাঁচশ টাকা দিয়ে বলে, জায়গাটা একটু খেয়াল রাখবেন!

আর মাঝেমধ্যে মায়ের বুক, অর্থাৎ দেশের মাটি নোংরা হয়ে গেলে কাগজ, কলার খোসা নিজের হাতে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে আসে।

হিমু মাঝেমধ্যে আহমাদ মূসাকে কোনো মেয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তার ইচ্ছা, আহমাদ মূসারও একটা জুটি হোক।

কিন্তু আহমাদ মূসা কেন জানি মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে চায় না।

বরং মোটা কাচের চশমার ভেতর দিয়ে এমন তাজ্জব হয়ে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন সে কোনো নতুন প্রজাতির প্রাণী আবিষ্কার করেছে!

তবে আহমাদ মূসার জন্য হিমুর নিজের বান্ধবী মিমকে বেশ পছন্দ।

দুজনের মধ্যে যেন কেমন একটা মিল আছে। হিমু যখন আলাদাভাবে আহমাদ মূসা আর মিমের সঙ্গে সময় কাটায়, তখন বিষয়টা তার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কিন্তু মিলটা ঠিক কোথায়, সেটা সে বুঝতে পারে না।

কী এমন মিল দুজনের মধ্যে?

কেনই বা আহমাদ মূসা আর মিম একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হলে অন্যরকম কিছু ঘটতে পারে বলে হিমুর মনে হয়?

হিমু নিজেও জানে না।

তবে এই অজানা মিলের কারণেই তার মনে হয়, আহমাদ মূসা আর মিমের একটা জুটি বাঁধা উচিত।

কিন্তু হিমু কি জানে, কিছু কিছু মানুষের পরিচয় কেবল নতুন সম্পর্কের শুরু নয়, বরং পুরোনো কোনো রহস্যের দরজাও খুলে দেয়?

[চলবে...]