পরিচালক শুধু কি বিনোদনের জন্যই বা শুধু টাকা কামানোর জন্যই কি সিনেমাটি তৈরী করেছেন? অন্য কোন উদ্দেশ্য কি নেই? নেই কি কিছু শিক্ষা নেওয়ার এবং তা ব্যাক্তি জীবনে বা সমাজে প্রয়োগ করার?
PK- সিনেমার ছোট্র একটা চরিত্র বিশ্লষন করে আমার মনে একটা উপলব্দি জন্মে।
ভেরু শিং(সঞ্জয় দত্ত), খুব ছোট্র একটা চরিত্র, খুব ছোট্র একটা ঘটনা যা আমাদের সমাজে অহরহ ঘটে, এই ছোট্র ঘটনার ছোট্র চরিত্রের মাধ্যমে অনেক বড় একটা উপলব্ধি লুকিয়ে আছে।
পিকে (আমির খান) ভেরু শিংয়ের গাড়ীতে এ্যাকসিডেন্ট করে। ভেরু শিং পিকে কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় চিকিৎসার জন্য। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পিকের আচরনে মনে করে মাথায় আঘাতের কারনে সে স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেছে এবং তা ভেরু শিং কে বলে। ডাক্তারের মুখে এমন কথা শুনে সে মনে মনে খুশি হয়ে যায় এবং পিকে কে হাসপাতালে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। খুব সহজেই বিবেক কে হত্যা করে। পিকের স্মৃতি শক্তি সত্যিই বিলুপ্ত হয়েছে কি না তা আরও নিশ্চিত হতে তাকে কয়েকটি প্রশ্ন করে। কোন উত্তর না পেয়ে নিশ্চিত হয় যে পিকে সত্যিই স্মৃতি শক্তি হারিয়েছে। তাই ভেরু শিং খুব বেশি খুশি হয়ে সিদ্ধান্ত অটল রেখে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
কিন্তু সে গেইট পার হতে পারে না।থমকে দাঁড়ায়। বিবেকের তারনায় থমকে দাঁড়ায়। কারন পিকের কোন পরিচয় বা ঠিকানা সে জানে না। একজন অসহায় মানুষ, যার সাথে ভেরুর পূর্বের কোন পরিচয় বা সম্পর্ক না থাকা সত্বেও তাকে একা ফেলে পালিয়ে যেতে পারে না ভেরু শিং। সিদ্ধান্ত বদলায়, পিকে কে নিয়ে যায় তার বাড়ীতে, স্মৃৃতি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত তার বাড়ীতে রেখে দেয়। অথচ ভেরুর কথা-বার্তা ও আচার-আচরনে সমাজের কেউ তাকে ভাল মানুষ হিসেবে গন্য করবে না। পৃথিবীর অনেক নিকৃষ্ট মানুষের মাঝেও কিছু ভাল গুন থাকে, যা জীবনে কোন এক সময় প্রকাশিত হয়ই।
সিনেমার শেষের দিকে এই ভেরু শিংই আবার পিকে কে সহযোগিতার জন্য ট্রেনে করে দিল্লি যায়। দিল্লি স্টেশনে "গাড"কে রক্ষা করা বাহিনী দ্বারা বিস্ফোরিত বোমার আঘাতে সে মারা যায়।
ভেরু শিং হাসপাতালে বিবেক কে বিসর্জন দিয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, সে সিদ্ধান্তে অটল থাকলে কি ঐ বোমা হামলায় সে মারা যেত? না, সে বেঁচে থাকতো, কারন সে যে ধরনের জীবন যাপন করে, তাতে তার দিল্লি যাওয়ার প্রয়োজন হয়তো হত না এবং ঐ বোমা বিস্ফোরনের শিকার হত না। বউ-বাচ্চা, সংসার, ব্যান্ড গ্রুপ নিয়ে হয়তো দিব্বি মজার একটা জীবন উপভোগ করতো।
আসলেই কি তাই হতো? জীবনে কোন এক মূর্হুতের জন্য কি তার মধ্যে অপরাধ বোধ জন্মাতো না? যদি জীবনে শুধু একবারের জন্য জন্মায়, তবে সারাটা জীবন তার মনের মধ্যে একটা অশান্তি বোধ কি কাজ করত না? সে আসলেই কি সুখে থাকতে পারত? সে কি চিরতরেই ভুলে যেতে পারত? পৃথিবীর সত্যিকার কোন মানুষের দ্বারা কি ভুলে যাওয়া সম্ভব? যদি কেউ সত্যিই বিবেক হত্যা করে এমন কাজ করে এবং খুব অনায়াসেই ভুলে গিয়ে দুনিয়াতে সুখের জীবন যাপন করতে পারে, তার কি মানুষ শব্দটি ব্যবহার করার কোন যোগ্যতা থাকে?
আমাদের সমাজে অনেকের কাছে বিবেক কে বিসর্জন দিয়ে বিপদ গ্রস্থ মানুষকে ফেলে পালিয়ে যাওয়া খুবই সহজ একটা কাজ। অনেকের কাছে এটা একটা সামান্য ব্যাপার মাত্র। নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য খুব অনায়াসে অনেকে কাজটি করছে, সমাজে সন্মানের সাথে বসবাসও করছে।
আবার কোন কোন ব্যাক্তির কাছে বিবেক বিসর্জন দেওয়া খুবই কঠিন কাজ। জন্মগত, পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষা, জ্ঞান ইত্যাদি দ্বারা অনেক কষ্টে উপার্জিত আদর্শ অনেকেই আবার জীবন চলে গেলেও হত্যা করতে পারে না। কঠিন-নিষ্ঠুর সমাজে টীকে থাকার জন্য, সমাজের নিষ্ঠুর অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য সাময়িক ভাবে হয়ত সিদ্ধান্ত নেয় কিন্তু বেশীক্ষন ধরে রাখতে পারে না বিবেকের যন্ত্রনায়। মনে মনে নিজেকে নিজেই গালি দেয়, অন্যদের মত বিবেক কে বিসর্জন দিয়ে নিজের মনকে শান্তনা দেওয়ার মত কোন ভ্রান্ত যুক্তি দাঁড় করাতে পারে না। পরাজিত হয় বিবেকের কাছে, পরিনতি হয় ঠিক ভেরুরই মত। ভেরু শিং, তোমাকে হাজার সেলুট।
Comments (11)