গতদুই দিন ধরে আম্মার শরীরটা খারাপ। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে থাকে কিন্তু কিছু বলে না। কয়েক বছর আগে স্ট্রোক করে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার আছে ডায়াবেটিস জনিত বিভিন্ন জটিল রোগ। তাই ছেলেরা এবং ছেলের বউরা যথেষ্ট সেবা যত্ন করে আরামে রাখার চেষ্টা করে। আমি ছুটিতে আসবো তাই আম্মার সাথে এক ঘন্টা কথা হয় চার ভাইয়ের যৌথ পরিবার নিয়ে। কিন্তু একবারও বলে নাই উনার শরীর খারাপ। সামন্য জ্বর হয়েছে বলে স্থানীয় ডাক্তার হতে যৎসামান্য ঔষধ নিয়ে আসে। আমার সাথে কথার ফাঁকে জানায় সব ঔষধ আছে সেবা যত্নের কোনো ঘাটতি হচ্ছে না। কিন্তু পরের দিন (০৪-০২-২৬) সকালে ঘুম ভাঙ্গে মায়ের মৃত্যু খবর শুনে অথচ পাঁচ তারিখে আমি দেশে আসবো। সুস্থ স্বাভাবিক মায়ের মৃত্যু । আম্মাকে আর ছুঁয়ে দেখা হয়নি , বলা হয়নি অনেক অনেক মনের কথা।
চিওড়া রাস্তার মাথা হতে যমুনা পরিবহনে উঠলাম ধাক্কাধাক্কি করে। শুক্রবার হওয়ায় ফেনী শহরে এসে জুয়ার নামাজ পড়ার ইচ্ছা। এত জ্যাম যে মহিলা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছে। চলন্ত গাড়িতে লম্বা সুন্দর মুখ ভর্তি কালো দাড়ির মধ্য বয়সী একটা লোক অকথ্য ভাষায় বিশ বছরের এক যুবককে গালি দিতেছে।
তুই চোর, আজই আমার বাড়ি হতে বাহির হয়ে যাবি। তোর হাতে দামি মোবাইলটাও আমার। এইসব কথার ফাঁকে-ফাঁকে বিশ্রীভাবে মা-বাপ তুলেও গালি দিচ্ছে সমানে। হঠাৎ যুবকটা কী যেনো বললো। এতে লোকটার গালি আরো বাড়লো। উনার মা ও স্ত্রী পাশে বসা। প্রচণ্ড লজ্জিত বুঝা যায় তাই চুপিসারে কী যেনো বলতে চেষ্টা করে মাঝে মাঝে। এতে লোকটা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে। আমার পাশে দুই/তিন আসনে শালীন ও সম্ভ্রান্ত নারী বসা। আমি ও অন্যরাও অশ্রাব্য ভাষার কারণে লজ্জা পাচ্ছি যেনো।
আমি ওই লোকটাকে বড় বড় চোখ করে দেখলাম বেশ কয়েকবার। ভাবছি কিছু বলি। সুন্দরীরা আমার বিরক্তি ভাব দেখে মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। লোকজনের চোখের ভাব দেখে মনে হয় তারা চায় আমি কিছু বলি অভদ্রটাকে। সামনে বাস থামলেই যুবকটা নেমে যায় কিন্তু লোকটার গালি বন্ধ হয় না। আমিও একটু পরে আসন পেয়ে যাই নারী দুইজন নেমে যাওয়ায়। কানকে বিশ্বাস করাতে পারছিনা কোনো সন্তান মাকে এইভাবে অশালীন গালি দেয়। মা কী যেনো বলতেই বললো তোমাকে এখনই গলা টিপে মেরে বাসের জানালা দিয়ে ফেলে দিবো। মা আমতা আমতা করে বলে তাই ভালো এই অপমান হতে। লোকটা ফোন করে কাকে যেনো বলে এই চোর শালার পোলা যেনো ঘরে ডুকতে না পারে। মা কাঁদছে দেখে মনটা বিগলিত হয়ে উঠল। আমি কয়েক মাস আগেই মা হারা হয়েছি। মায়ের স্মৃতি উঁকি দিলো স্বপ্নের মত।
চিওড়া এসেছি এক মাকেই দাফন করতে। যে মা গত দুই বছর মৃত্যুর সাথে লড়াই করেছে শরীরে মরণব্যাদী ক্যান্সার নিয়ে। তাঁর এক মাত্র সন্তান নিজের টাকা-পয়সা ধ্যান-জ্ঞান সব উজাড় করেছে মাকে ক্যান্সার হতে বাঁচিয়ে সুস্থ করে তুলতে। নামী দামী হাসপাতালে ছুটেছে মায়ের জন্য। রোগের ভয়ার্ত ছোবল দেখে ডাক্তার নির্বাক হয়ে বলেছে আমরা রুগীর সুস্থতা কামনা করি কিন্তু কখনো কখনো মৃত্যুও কামনা করি। আপনার মায়ের এত কষ্ট দেখে তাই মৃত্যুই শ্রেয় বলবো। শরীরে পচন ধরলেও আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য চেষ্টা করেছে। ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়াতে পরিবার এতে সহায় সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোগীও বাঁচেনা। ক্যান্সার দুইদিকে শেষ করে নিয়ে যায়। অথচ এই সমাজের আরেকজন সন্তান চলন্ত বাস হতে মাকে ফেলে দিতে চায়।
আবার গালি দিতেই আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম। ড্রাইভার সাহেব গাড়ি থামান এই বেয়াদবটাকে বাস হতে নামিয়ে দিন। সাথে সাথে বাসের সব মানুষ আগুনের ফুলকির মত জ্বলে উঠলো। চিৎকার আর চেঁচামেচিতে লোকটা ভয় ফেলো। মা ও বউ বসা হতে উঠে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি শুরু করলো। (বাকি)
Comments (1)