এগারো হিজরী, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স তখন তেষট্টি। কয়দিন আগে বিদায় হজ্বের ভাষণে তিনি সমবেত সবাইকে বিদায়ী নসীহত করে এসেছেন। সেই সফরেই আরাফা প্রান্তরে জুমার দিন বিকেলে নাযিল হয়- الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلامَ دِيناً আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিআমাত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবূল করে নিলাম।-[সুরা মায়েদা ৩] সে দিনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দ্বীন যেহেতু পূর্ণ হয়ে গেছে, এই ইহজগতে তাঁর কর্তব্যও ফুরিয়ে আসছে। শীঘ্রই তাঁকে আল-বিদা জানাতে হবে দুনিয়ার জীবনকে। নবিজী হজ্বের কার্যক্রম শেষ করে মক্কা থেকে মদিনায় ফিরে এলেন। ওফাতের আগ পর্যন্ত মদিনাতেই রইলেন। এই সময় তিনি মুতার যুদ্ধের শহীদদের প্রতিশোধ নিতে এবং রোমান সীমান্ত সুরক্ষিত করতে উসামা বিন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে বালকা ও ফিলিস্তিন অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার জন্য বাহিনী গঠন করেন। জীবনের শেষ কয়দিন- সফর মাসের শেষ দিকে অথবা রবীউল আউয়াল মাসের প্রথম দিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হন, এই অসুস্থতায়ই তিনি দুনিয়ার সফর শেষ করেন। ওফাতের পাঁচদিন আগে বুধবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতা বেড়ে যায়। এ সময় হযরত উম্মে সালামা ও উম্মে হাবীবা রাদিয়াল্লাহু আনহা হাবশাতে দেখা খ্রিষ্টান ধর্মনেতাদের জাঁকজমকপূর্ণ কবরের কথা আলোচনা করেন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْيَهُوْدِ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوْا قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ইয়াহূদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর লা'নত, তারা তাদের নবীদের (নবীদের) কবরকে মাসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।-[বুখারী ৪৪৪৩] এরপর তিনি বেহুঁশ হয়ে যান। হুঁশ ফিরলে তিনি বলেন- هَرِيْقُوْا عَلَيَّ مِنْ سَبْعِ قِرَبٍ لَمْ تُحْلَلْ أَوْكِيَتُهُنَّ لَعَلِّيْ أَعْهَدُ إِلَى النَّاسِ তোমরা আমার ওপর সাতটি মশক থেকে পানি ঢালো, যেগুলোর মুখ এখনও খোলা হয়নি, যাতে আমি সুস্থ হয়ে মানুষকে নসিহত করতে পারি। -[সহীহ বুখারী ৪৪৪২] এরপর তিনি বাইরে বের হন, এক পর্যায়ে তিনি দেখেন আনসারী সাহাবীরা কান্না করছে। তখন তিনি তাঁদেরকে শান্তনা দেওয়ার জন্য মাথায় পট্টি বেঁধে শেষবারের মত মিম্বরে আরোহন করেন। এরপর আর কখনো তিনি মিম্বরে আরোহন করেননি। তখন তিনি সমবেতদের উদ্দেশ্য করে বলেন- أُوصِيكُمْ بِالأَنْصَارِ فَإِنَّهُمْ كَرِشِيْ وَعَيْبَتِيْ وَقَدْ قَضَوْا الَّذِيْ عَلَيْهِمْ وَبَقِيَ الَّذِيْ لَهُمْ فَاقْبَلُوْا مِنْ مُحْسِنِهِمْ وَتَجَاوَزُوْا عَنْ مُسِيئِهِمْ আমি তোমাদেরকে আনসারদের বিষয়ে অসিয়ত করে যাচ্ছি। তারা আমার বিশ্বস্ত ও অন্তরঙ্গ। তারা তাদের দায়িত্ব সম্পূর্ণ করেছে। কিন্তু তাদের প্রাপ্য বাকী রয়েছে। অতএব তোমরা তাদের উত্তমগুলি গ্রহণ করো এবং ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দিয়ো। -[বুখারী ৩৭৯৯] অতঃপর নবিজীর অসুস্থতা আরো বেড়ে যায়, সে সময় বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু নবিজীকে ﷺ নামাযের সময় হয়েছে বলে খবর দিতে যান। উত্তরে নবিজী বলেন- আবু বকরকে বলো সে যেন নামায পড়ায়। তখন বিলাল ও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কোমল হৃদয়ের কথা তুলে ধরে আপত্তি জানান। তারা বলেন- আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কোমল হৃদয়ের লোক, তিনি আপনার স্থানে দাঁড়ালে কেঁদে ফেলবেন এবং কিরাআত পড়তে পারবেন না। কিন্তু নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকেই ইমামতি করার আদেশ করেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নামায পড়ান। নামাযের সময় নবী ﷺ দুই ব্যক্তির কাঁধে ভর করে বের হয়ে আসেন। দুর্বলতার কারণে নিজের পা দুটো মাটিতে টেনে টেনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। যখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে দেখতে পেলেন, তখন তিনি পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু নবী ﷺ তাঁকে ইশারা করে বললেন, "তুমিই নামাজ পড়াও।" -[বুখারী ৭১২] এরপর থেকে ওফাত পর্যন্ত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নামায পড়ান। শেষ দিন- সেদিন ছিল সোমবার, সাহাবায়ে কেরাম কাতারবদ্ধ হয়ে ফযরের নামায আদায় করছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজরার পর্দা সরিয়ে এই দৃশ্য দেখলেন। দেখে খুবই অভিভূত হলেন, মুগ্ধ হলেন। তিনি দেখছিলেন- তাঁর তেইশ বছরের মেহনত সফল, তাঁর হাতে গড়া সাহাবীদের রবের সাথে সম্পর্ক তাঁর অনুপস্থিতিতেও অটল, এই সম্পর্ক বড় মজবুত, যা কখনো ভাঙবার নয়। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ সেদিন ছিল সোমবারের ভোর। সাহাবায়ে কেরাম ফজরের সালাতে কাতারবদ্ধ। সামনে দাঁড়িয়ে আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইমামতি করছেন। হঠাৎ আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হুজরার পর্দা সরে গেল। উঁকি দিয়ে তাকালেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। সারিবদ্ধভাবে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয় সাহাবিদের দেখে তাঁর পবিত্র মুখে ফুটে উঠল এক টুকরো মুচকি হাসি। রাসূলুল্লাহ ﷺ হয়তো সালাতে অংশ নিতে বাইরে আসছেন ভেবে আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু পেছনের কাতারে গিয়ে শামিল হতে চাইলেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- সে সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখে সাহাবিদের হৃদয়ে আনন্দের এমন এক হিল্লোল বয়ে গেল যে, খুশিতে তাদের নামায প্রায় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন হাতের ইশারায় তাঁদের সালাত পূর্ণ করার আদেশ দিলেন। তারপর তিনি হুজরায় ফিরে গেলেন এবং পর্দা নামিয়ে দিলেন।-[বুখারী ৪৪৪৮]

ওফাতের আগে তিনি রবের দরবারে হাজির হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। বারবার বলছিলেন-
اللهُمَّ الرَّفِيْق الْأَعْلَى
হে আল্লাহ! আমি সর্বোচ্চ বন্ধুর সান্নিধ্য চাই।
এরপর নবিজীর মৃত্যুর কষ্ট শুরু হয়। সে সময়কার পুরো বর্ণনা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
আমার প্রতি আল্লাহ তাআলার অনেক বড় অনুগ্রহ যে, আমার ঘরে, আমার পালার দিনে এবং আমার গন্ডদেশ ও সিনার মাঝে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকাল হয় এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁর ইন্তিকালের সময় আমার থুথু তাঁর থুথুর সঙ্গে মিশ্রিত করে দেন। এ সময় আবদুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার কাছে আসেন এবং তার হাতে মিসওয়াক ছিল। আর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (আমার বুকে) হেলান অবস্থায় রেখেছিলাম। আমি লক্ষ্য করলাম যে, তিনি 'আবদুর রহমানের দিকে তাকাচ্ছেন। আমি বুঝলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিসওয়াক চাচ্ছেন। আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি আপনার জন্য মিসওয়াক নিব? তিনি মাথা নাড়িয়ে বললেন যে, হ্যাঁ। তখন আমি মিসওয়াকটি নিলাম। কিন্তু মিসওয়াক ছিল তার জন্য শক্ত, তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি এটি আপনার জন্য নরম করে দিব? তখন তিনি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললেন। তখন আমি তা চিবিয়ে নরম করে দিলাম। এরপর তিনি ভালভাবে মিসওয়াক করলেন। তাঁর সম্মুখে পানির পাত্র ছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় হস্তদ্বয় পানির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে তার দ্বারা তাঁর চেহারা মুছতে লাগলেন। আর তিনি বলছিলেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সত্যিই মৃত্যু-যন্ত্রণা কঠিন। তারপর দুই হাত উপরের দিকে উঠিয়ে বলছিলেন, আমি সর্বোচ্চ বন্ধুর সান্নিধ্য চাই। এই অবস্থায় তাঁর ইন্তিকাল হল আর হাত শিথিল হয়ে গেল। -[বুখারী ৪৪৪৯]