একদিন আমাদের গ্রামে এক অচেনা ওঝা এলেন। গ্রামের কেউ তাঁকে আগে কখনও দেখেনি বা চিনত না। গ্রামের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখতে দেখতে তিনি হঠাৎ নানুবাড়ির পাশের সেই বহু বছরের পুরোনো, পরিত্যক্ত বাড়িটির সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ নীরবে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করার পর তিনি পাশের বাড়ির উঠানে গিয়ে বসলেন।
বাড়ির লোকজনকে ডেকে তিনি বললেন,
— “আমি একজন সাপুড়ে। অনেক দূর থেকে এসেছি। এখানে কিছু একটা অস্বাভাবিক অনুভব করছি। আপনাদের অনুমতি পেলে জায়গাটা পরীক্ষা করে দেখব। যদি কোনো সাপ থাকে, তাহলে ধরে নিয়ে যাব।”
বাড়ির লোকজন অনুমতি দিলে আমরা কৌতূহলী হয়ে সেখানে জড়ো হতে শুরু করলাম।
তিনি একটি বড় গামলা আনতে বললেন। তারপর উঠানের মাটিতে পরপর তিনটি বড় বৃত্ত আঁকলেন—একটির ভেতরে আরেকটি, ক্রমশ ছোট। সবচেয়ে ভেতরের বৃত্তে তিনি নিজে বসলেন। সামনে রাখা গামলায় পানি ঢেলে তাতে অজানা কোনো গুঁড়ো বা বস্তু ছিটিয়ে দিলেন।
এরপর তাঁর সাগরেদদের নির্দেশ দিলেন, তারা যেন পুরো বাড়িজুড়ে এবং আশেপাশের বাড়িতেও ধানের কুঁড়া ছিটিয়ে দেয়। আশ্চর্যের বিষয়, সেই কুঁড়াগুলো তাদের ব্যাগেই আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল।
সব প্রস্তুতি শেষ হলে তিনি তন্ত্র-মন্ত্র পাঠ শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর গামলার পানির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলতে লাগলেন,
— “ওখান থেকে অমুক নামে দুটো সাপ আসছে... ওদিক থেকে অমুক নামের একটি সাপ আসছে.... ইত্যাদি... ইত্যাদি”
আমরা বিস্ময়ে দেখলাম, সত্যিই বিভিন্ন দিক থেকে একের পর এক সাপ এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। দূরের ঝোপঝাড়, বাঁশঝাড়, এমনকি চার বিঘারও বেশি দূরে থাকা আমার নানুবাড়ির গোয়ালঘরের দিক থেকেও দুটি সাদা দুধরাজ সাপ বেরিয়ে আসছিল। পরে নানাভাই দূর থেকে আমাদের ডাক দিয়ে বলেছিলেন, “এখান থেকে দুটো সাপ বের হয়ে যাচ্ছে!”
অদ্ভুত বিষয় হলো, নানুবাড়িটি এতটাই দূরে ছিল যে সেখানকার ঘটনা ওঝার পক্ষে সরাসরি দেখা সম্ভব ছিল না। অথচ তিনি গামলার পানির দিকে তাকিয়েই বলে দিয়েছিলেন যে ওই দিকের গোয়ালঘর থেকে দুটি সাদা দুধরাজ সাপ বেরিয়ে এসেছে।
কিছুক্ষণ পরে পাশের পুকুরের দিক থেকেও দুটি দোরা সাপ (যাকে অনেকে মাছরাঙা সাপও বলতেন) এগিয়ে আসতে লাগল। কিন্তু ওঝা গামলার পানির ওপর আঙুল দিয়ে ক্রসের মতো একটি চিহ্ন এঁকে বললেন,
— “যা, তোরা ফিরে যা।”
অবিশ্বাস্যভাবে সাপ দুটি আবার যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকেই ফিরে যেতে লাগল।
এদিকে তাঁর সাগরেদরা প্রয়োজনীয় সাপগুলো নির্ভয়ে তুলে ঝুলিতে ভরে নিচ্ছিল। ওঝা আগেই সবাইকে আশ্বস্ত করেছিলেন,
— “আমার মন্ত্রে যে সাপগুলো আসবে, তারা কাউকে কামড়াতে পারবে না।”
সত্যিই, এত সাপের ভিড়েও কাউকে আক্রমণ করতে দেখা যায়নি। এমনকি সাগরেদরা খালি হাতে সাপ ধরে ঝুলিতে ভরলেও তাদের কোনো রকম সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়নি।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ওঝার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তিনি গম্ভীর হয়ে ধীরে ধীরে বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে এলেন। তারপর খালের পাড়ঘেঁষা পুকুরের বাঁধের দিকে হাঁটতে লাগলেন (পূর্বের গল্পে উল্লিখিত সেই বাঁধ, যেখানে খালের সাথে পুকুরের সংযোগ বন্ধ করে দিলে, সেই ব্যক্তি জ্বর আসে বা অন্য কোন সমস্যা হয়)। আমরাও কৌতূহল নিয়ে তাঁর পেছন পেছন গেলাম।
সেখানে গিয়ে দেখি, একটি পুরোনো তেঁতুল গাছের গোড়ায় কালো রঙের একটি সাপ ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা ভেবেছিলাম এবার তিনি সেটিকেও ধরে ফেলবেন। কিন্তু ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা।
তিনি সাপটির সামনে গিয়ে দুই হাত জোড় করে মাথা নত করলেন। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন,
“আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি এখানে আছেন, আমি জানতাম না। দোহাই আপনার, আমার এবং আমার সঙ্গী-সাথীদের কারও কোনো ক্ষতি করবেন না। আমি এই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আর এখানে কোনো সাপ ধরব না। যেগুলো ধরেছি, সেগুলোও এখনই ছেড়ে দিচ্ছি।”
এরপর তিনি তাঁর সাগরেদদের নির্দেশ দিলেন, ধরা সব সাপ ছেড়ে দিতে।
আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে কারণ জানতে চাইলাম। কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। নীরবে তাঁর জিনিসপত্র গুছিয়ে সঙ্গীদের নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেন।
আজও সেই দিনের ঘটনাগুলো আমার স্পষ্ট মনে আছে। ঠিক কী ঘটেছিল, তার ব্যাখ্যা আমি দিতে পারি না। এটি অলৌকিক ছিল, নাকি এমন কোনো কৌশল যার রহস্য আমরা বুঝতে পারিনি—সেটা পাঠকের বিচারেই রইল। তবে আমাদের গ্রামের লোকমুখে এই ঘটনাটি আজও এক রহস্যময় স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।