পৃথিবী তখনও জন্ম নেয়নি।
সূর্য ছিল না, চাঁদ ছিল না, নক্ষত্রের আলোয় আঁকা কোনো আকাশ ছিল না। মহাশূন্যের বিশাল নীরবতায় তখন কেবল সময়ের প্রবাহ—অসীম, অনন্ত, নিরবচ্ছিন্ন।
সেই আদিম মহাশূন্যের দুই প্রান্তে ছিল দুটি বিশাল রাজ্য—স্বর্গ ও নরক।
স্বর্গের অধিপতি ছিলেন দেবতা দিব্য, আর নরকের অধিপতি ছিলেন দেবতা অগ্নিরাজ। দুজনের রাজ্য ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। স্বর্গে আলো, শান্তি ও সৃষ্টির আনন্দ; নরকে অন্ধকার, আগুন ও ধ্বংসের গর্জন।
কিন্তু এক আশ্চর্য কারণে দুই দেবতার মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না।
কারণ তারা জানতেন—
সৃষ্টি যদি একদিকে এগিয়ে যায়, ধ্বংস তাকে ভারসাম্য দেবে। আর ধ্বংস যদি সীমা ছাড়িয়ে যায়, সৃষ্টি তাকে আবার ফিরিয়ে আনবে।
একদিন তাদের দুই রাজ্যে দুই পুত্রের জন্ম হলো।
স্বর্গের সন্তানটির নাম রাখা হলো পুণ্য।
আর নরকের সন্তানটির নাম রাখা হলো পাপ।
জন্মের মুহূর্ত থেকেই দুজনের মধ্যে ছিল অদ্ভুত এক সাদৃশ্য। দুজনেরই অসীম শক্তি, অসাধারণ বুদ্ধি এবং নিজের ক্ষমতার ওপর সীমাহীন বিশ্বাস।
কিন্তু স্বভাব ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
পুণ্য যেখানে ফুল ফুটাতে চাইত, পাপ সেখানে কাঁটা জন্মাত।
একসময় সেই প্রতিযোগিতা সৃষ্টির সীমা ছাড়িয়ে গেল।
পুণ্য সৃষ্টি করল ভালোবাসা।
পাপ তার পাশে জন্ম দিল ঈর্ষা।
পুণ্য সৃষ্টি করল বন্ধুত্ব।
পাপ সৃষ্টি করল বিশ্বাসঘাতকতা।
পুণ্য মানুষের হৃদয়ে আশা রাখল।
পাপ সেখানে সন্দেহের বীজ বুনল।
দুজনের প্রতিযোগিতা দেখে দুই দেবতাও একসময় চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
তখনও পৃথিবী সৃষ্টি হয়নি।
কিন্তু মহাবিশ্বের অসংখ্য নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ ও অজানা জগতের মধ্যে তাদের প্রতিযোগিতার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছিল।
অবশেষে এক মহাসভা বসানো হলো।
দেবতারা ঘোষণা করলেন,
“তোমাদের প্রতিযোগিতা চলবে। কারণ পাপ ও পুণ্য—দুটিই সৃষ্টির ভারসাম্যের অংশ। কিন্তু আজ থেকে তোমরা একে অপরকে আঘাত করবে না। কেউ কাউকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবে না।”
পাপ মাথা নত করে বলল,
“তাহলে আমরা কীভাবে প্রতিযোগিতা করব?”
দিব্য বললেন,
“তোমাদের জন্য একটি নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করা হবে।”
অগ্নিরাজ বললেন,
“সেই পৃথিবীতে জীব থাকবে, মানুষ থাকবে, তাদের থাকবে স্বাধীন ইচ্ছা।”
দুই ভাই একসঙ্গে তাকিয়ে রইল।
দিব্য আবার বললেন,
“তোমরা দুজন পৃথিবীতে যাবে। কিন্তু অদৃশ্য থাকবে। কাউকে তোমার পথ বেছে নিতে বাধ্য করতে পারবে না।”
“তোমরা কেবল প্রলোভন দেখাতে পারবে।”
“কেবল ভালো হওয়ার পথ দেখাতে পারবে।”
“মানুষ নিজে যে পথ বেছে নেবে, সেটিই তার সত্যিকারের সিদ্ধান্ত।”
তারপর মহাশূন্যের অন্ধকারে প্রথমবারের মতো একটি নীল আলো জ্বলে উঠল।
সেই আলো ধীরে ধীরে একটি গোলকের আকার নিল।
জন্ম হলো—
পৃথিবীর।
পাহাড়, নদী, সাগর, বন, মরুভূমি—সবকিছু সৃষ্টি হলো।
তারপর সৃষ্টি হলো মানুষ।
মানুষের হৃদয়ে রাখা হলো একটি আশ্চর্য ক্ষমতা—
পছন্দ করার ক্ষমতা।
পাপ তখন বলল,
“আমি একা যাব না। আমার সাহায্যকারী চাই”
তাকে অনুমতি দেওয়া হলো,
সে তার সঙ্গী হিসেবে বেছে নিল শয়তানকে।
শয়তান ছিল প্রলোভনের কারিগর। সে মানুষের কানে কথা বলতে পারত, কিন্তু মানুষ তাকে দেখতে পেত না।
পাপ বলল,
“তুমি মানুষের সামনে এমন পথ দেখাবে, যেটি সহজ মনে হবে কিন্তু শেষে তাকে অন্ধকারে নিয়ে যাবে।”
শয়তান হাসল।
“আর তুমি?”
পাপ বলল,
“আমি মানুষের দুর্বলতার ভেতর বাস করব।”
এরপর পুণ্যের পালা।
সবাই ভাবল, সে হয়তো কোনো শক্তিশালী দেবদূতকে বেছে নেবে।
কিন্তু পুণ্য কাউকেই বেছে নিল না।
সে পৃথিবীর একটি ছোট্ট গ্রামে গেল।
সেখানে ছিল এক সাধারণ মানুষ।
তার কোনো রাজপ্রাসাদ ছিল না।
কোনো সেনাবাহিনী ছিল না।
কোনো অলৌকিক ক্ষমতাও ছিল না।
সে ছিল একজন দরিদ্র কৃষক।
দিনভর মাঠে কাজ করত। রাতে নিজের অল্প খাবারটুকু পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে খেত।
পুণ্য সহজ-সরল মন গুলোতে বসবাস শুরু করল।
মানুষগুলো তাকে দেখতে পেল না।
কিন্তু সেই রাতে সে অদ্ভুত এক অনুভূতি পেল।
বাড়ি ফেরার পথে একজন কৃষক দেখল, রাস্তার পাশে এক বৃদ্ধ ক্ষুধায় বসে আছে।
তার নিজের ঘরেও খাবার অল্প।
তবু কৃষক নিজের খাবারের অর্ধেকটা বৃদ্ধের হাতে তুলে দিল।
সেই মুহূর্তে পুণ্য তার হৃদয়ে প্রবেশ করল।
পাপ দূর থেকে সবকিছু দেখছিল।
সে হেসে উঠল।
“একজন দরিদ্র মানুষের হৃদয়? এ দিয়ে তুমি আমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে?”
পুণ্য শান্তভাবে বলল,
“দেখা যাক।”
তারপর শুরু হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতিযোগিতা।
পাপ মানুষের মনে লোভ ঢুকিয়ে দিল।
পুণ্য বলল—
“যা তোমার নয়, তা নেওয়া উচিত নয়।”
পাপ মানুষের মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বালাল।
পুণ্য বলল—
“ক্ষমা করো।”
পাপ বলল—
“তাকে হারাও।”
পুণ্য বলল—
“নিজেকে জয় করো।”
পাপ বলল—
“অন্যকে পরাজিত করো।”
পাপ রাজপ্রাসাদে গেল।
পুণ্য গেল কুঁড়েঘরে।
পাপ গেল যুদ্ধক্ষেত্রে।
পুণ্য গেল আহত মানুষের পাশে।
পাপ ধনীর হৃদয়ে লোভ বাড়াল।
পুণ্য দরিদ্রের হাতে অল্পটুকু খাবারও ভাগ করে দেওয়ার সাহস দিল।
শতাব্দী পেরিয়ে গেল।
সহস্রাব্দ পেরিয়ে গেল।
পৃথিবীতে সভ্যতা উঠল, সভ্যতা ধ্বংস হলো।
রাজা এল, রাজা গেল।
সাম্রাজ্য জন্ম নিল, আবার মাটির সঙ্গে মিশে গেল।
কিন্তু পাপ ও পুণ্যের প্রতিযোগিতা থামল না।
অবশেষে একদিন মহাজাগতিক বিচারসভা বসানো হলো।
দুই ভাইকে ডাকা হলো।
দিব্য বললেন,
“তোমাদের প্রতিযোগিতার ফল আমরা দেখেছি। এবার বলো, কে জিতেছে?”
পাপ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে এল।
তার পেছনে দাঁড়িয়ে শয়তান।
পাপ বলল,
“আমি অসংখ্য মানুষকে লোভী করেছি, হিংস্র করেছি, মিথ্যাবাদী করেছি। যুদ্ধ বাধিয়েছি, ভাইকে ভাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছি। আমার জয় নিশ্চিত।”
পুণ্য কিছু বলল না।
দিব্য তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি?”
পুণ্য মৃদু হাসল।
“আমি কাউকে জিততে বাধ্য করিনি।”
“আমি শুধু অপেক্ষা করেছি।”
“যখন একজন মানুষ প্রতিশোধ নিতে পারত কিন্তু ক্ষমা করেছে—আমি সেখানে ছিলাম।”
“যখন একজন মানুষ নিজের ক্ষুধার মধ্যেও অন্যকে খাবার দিয়েছে—আমি সেখানে ছিলাম।”
“যখন একজন মানুষ অন্ধকারের মধ্যেও সত্য বলেছে—আমি সেখানে ছিলাম।”
“আর যখন একজন মানুষ পাপ করার সমস্ত সুযোগ পেয়েও নিজেকে থামিয়েছে—সেদিন আমি সবচেয়ে বেশি জিতেছি।”
সভা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তখন পাপ হঠাৎ বলল,
“কিন্তু আমার অনুসারী তো পৃথিবীতে অনেক বেশি!”
পুণ্য তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সংখ্যা দিয়ে কি সবসময় জয় মাপা যায়?”
পাপ চুপ হয়ে গেল।
তখন মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন আয়নাটি আনা হলো।
সেই আয়নায় মানুষের বাহ্যিক রূপ দেখা যায় না।
দেখা যায় মানুষের সিদ্ধান্ত।
আয়নায় দেখা গেল—
একজন মানুষ অন্যায় করার সুযোগ পেয়েও অন্যায় করেনি।
একজন প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা পেয়েও ক্ষমা করেছে।
একজন ক্ষুধার্ত হয়েও নিজের খাবার ভাগ করেছে।
একজন একা হয়েও অন্য এক অসহায় মানুষকে পাশে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছে।
আর তখন দেখা গেল সেই দরিদ্র কৃষককে—যার হৃদয়ে পুণ্য প্রথম আশ্রয় নিয়েছিল।
তার মৃত্যুর বহু বছর পরও তার সন্তানরা মানুষের উপকার করে চলেছে।
তারপর তাদের সন্তানরা।
তারপর তাদেরও সন্তানরা।
পুণ্য বলল,
“পাপ মানুষের একটি মুহূর্তকে নষ্ট করতে পারে।”
“কিন্তু একটি ভালো কাজ কখনো কখনো শত প্রজন্মের হৃদয়ে আলো রেখে যায়।”
দিব্য উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি ঘোষণা করলেন—
“পাপ কখনো হারিয়ে যাবে না। পুণ্যও কখনো শেষ হবে না। কারণ মানুষকে আমরা স্বাধীনতা দিয়েছি। মানুষের হৃদয়েই তোমাদের চিরন্তন যুদ্ধ চলবে।”
তারপর তিনি পুণ্যের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোমার বিজয়ের পুরস্কার কী চাও?”
পুণ্য কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“আমি কোনো সিংহাসন চাই না।”
“তবে?”
“আমি চাই, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে একটি ছোট্ট দরজা থাকুক। যখনই সে ভুল পথে যাবে, দরজাটি যেন ভেতর থেকে একবার খুলে যায়।”
“সেখানে যেন একটি কণ্ঠ তাকে বলে—”
পুণ্য থামল।
তারপর বলল—
“তুমি চাইলে এখনো ফিরে আসতে পারো।”
সেই দিন থেকে মানুষের হৃদয়ে জন্ম নিল একটি অদ্ভুত অনুভূতি—
বিবেক।
পাপ আজও মানুষের কানে ফিসফিস করে।
শয়তান আজও প্রলোভন দেখায়।
কিন্তু গভীর রাতের নিস্তব্ধতায়, যখন একজন মানুষ নিজের সঙ্গে একা হয়ে যায়, তখন হৃদয়ের ভেতর থেকে আরেকটি কণ্ঠ শোনা যায়—
“এটা করো না।”
“ক্ষমা করো।”
“সত্য বলো।”
“অন্যের কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করো।”
সেই কণ্ঠটি খুব ক্ষীণ।
কিন্তু মহাবিশ্বের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত—
সে কণ্ঠ কখনো হারেনি।
আর পাপ ও পুণ্যের সেই মহাযুদ্ধ?
সেটি কোনো স্বর্গে বা নরকে নয়।
প্রতিদিন, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের ভেতরেই তার নতুন অধ্যায় লেখা হচ্ছে।
[বিঃদ্রঃ এটি আমার ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, এটি একটি গল্প মাত্র]

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।