এক প্রত্যন্ত গ্রামে শত শত বছরের পুরোনো একটি কূপ ছিল। গ্রামের জন্ম, মৃত্যু, উৎসব, দুর্ভিক্ষ—সবকিছুরই নীরব সাক্ষী যেন সেই কূপ। গ্রামের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তার জল ব্যবহার করে এসেছে। আশ্চর্যের বিষয়, গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষটিও কোনোদিন কূপটিকে শুকিয়ে যেতে দেখেননি। খরা এসেছে, নদী শুকিয়েছে, পুকুরের তলদেশ ফেটে গেছে—কিন্তু সেই কূপের জল কখনো এক আঙুলও কমেনি।
গ্রামের শিশুদের কাছে কূপটি ছিল বিস্ময়ের, আর বৃদ্ধদের কাছে ছিল এক অমীমাংসিত রহস্য।
একদিন গ্রামের এক কৌতূহলী ছেলে তার দাদার কাছে জানতে চাইল,
—"দাদু, এই কূপে এত পানি কোথা থেকে আসে?"
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—"আমি ছোটবেলা থেকেই একে এমন দেখছি। আমার দাদাও বলতেন, তাঁর দাদার সময়েও কূপটি এমনই ছিল। তবে একটা কথা মনে রাখিস—ভাদ্র মাসের অমাবস্যার রাতে কূপের ভেতর সারারাত এক অদ্ভুত আলো জ্বলে। বহু বছর আগে কয়েকজন সাহসী লোক সেই আলো দেখতে গিয়েছিল। ভোর হওয়ার আগেই তারা সবাই নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে তাদের লাশও আর পাওয়া যায়নি।"
এই সতর্কবাণী অন্যদের ভয় পাইয়ে দিলেও ছেলেটির কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।
কয়েক মাস পর গ্রামের কয়েকজন তরুণ সিদ্ধান্ত নিল—রহস্যের শেষ আজই হবে।
তারা বিশাল সব সেচযন্ত্র এনে দিনের পর দিন কূপের পানি তুলতে লাগল। হাজার হাজার কলস পানি বের হলো, কিন্তু কূপের জলের স্তর এক চুলও কমল না। যেন অদৃশ্য কোনো সমুদ্র নিরন্তর তাকে পূর্ণ করে চলেছে।
অবশেষে গ্রামের সবচেয়ে দক্ষ কয়েকজন ডুবুরি কূপের তলদেশ খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিল।
তারা একে একে ডুব দিল।
নিচে...
আরও নিচে...
আরও গভীরে...
কিন্তু কূপের তলা যেন শেষই হচ্ছিল না।
একসময় সবাই ফিরে এলেও একজন দক্ষ ডুবুরি আরও গভীরে নামতে লাগল।
হঠাৎ চারপাশ বদলে গেল।
সংকীর্ণ কূপের দেয়াল মিলিয়ে গেল। সামনে খুলে গেল সীমাহীন এক জগৎ—অন্ধকার অথচ অসীম, যেন সমুদ্রের অতল গহ্বর। চারদিকে অদ্ভুত নীলাভ আলো ভাসছে। দূরে বিশাল প্রবালপ্রাচীরের মতো পাথুরে কাঠামো, অথচ সেখানে কোনো মাছ নেই, কোনো স্রোত নেই—শুধু নিস্তব্ধতা।
সেই নিস্তব্ধতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল লোহার সিন্দুক।
সিন্দুকটির গায়ে এমন সব অচেনা লিপি খোদাই করা, যা পৃথিবীর কোনো ভাষার সঙ্গে মেলে না।
ডুবুরি কাছে যেতেই সিন্দুকের ঢাকনা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন সাদা পোশাক পরা এক বৃদ্ধ।
তার মুখে শতাব্দীর ক্লান্তি, চোখে অদ্ভুত দীপ্তি।
তিনি শান্ত স্বরে বললেন,
—"কে তুমি? কেন এসেছ? তোমাদের কূপ কি শুকিয়ে গেছে?"
অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে ডুবুরি এতটাই হতবাক হয়ে গেল যে উত্তর দেওয়ার আগেই তার শ্বাস ফুরিয়ে আসতে লাগল। প্রাণপণে সে উপরে উঠে এল।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার ডুব দিল।
এবার বৃদ্ধ আগেই তার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
—"উত্তর না দিয়েই চলে গেলে কেন? যদি তোমাদের কূপ শুকিয়ে যেত, তবে তোমার এখানে আসার অধিকার ছিল। কিন্তু কৌতূহল মানুষকে এমন সব দরজার সামনে নিয়ে আসে, যেগুলো কখনো খোলা উচিত নয়।"
ডুবুরি কাঁপা গলায় বলল,
—"কূপে পানির অভাব নেই। আমরা শুধু জানতে চেয়েছিলাম, এই পানি কোথা থেকে আসে।"
বৃদ্ধের মুখের শান্ত ভাব মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
তিনি দীর্ঘক্ষণ ডুবুরির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর কোমর থেকে একটি ছোট পাত্র বের করে বললেন,
—"এই তেল শরীরে মেখে নাও। এরপর তুমি এই জগতে শ্বাস নিতে পারবে। কারণ আমি যা বলতে যাচ্ছি, তা শুনতে তোমার অনেক সময় লাগবে।"
ডুবুরি তেল মাখতেই বিস্ময়ে বুঝতে পারল—সে এখন পানির নিচেও স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছে।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
"আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে এখানে কোনো গ্রাম ছিল না। ছিল দিগন্তজোড়া মরুভূমি। আমরা ছিলাম সাত বন্ধু। দুর্ভিক্ষে সব হারিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে বহু দূর দেশ থেকে এখানে এসেছিলাম।
খাবার জুটেছিল, কিন্তু পানির কোনো উৎস ছিল না।
তাই আমরা একটি কূপ খনন শুরু করলাম।
দিনের পর দিন মাটি কাটতে কাটতে একসময় হঠাৎ করেই শুনতে পেলাম শিশুদের আর্তচিৎকার।
চারদিকে তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেলাম না।
মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের সামনে উপস্থিত হলো এক দৈত্যাকার মানুষ—মানুষ বললেও ভুল হবে। সে আমাদের চেয়ে প্রায় দশ গুণ উঁচু। তার চোখ জ্বলছিল অগ্নিশিখার মতো।
সে বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল—
'আমার সন্তানকে কে হত্যা করেছে?'
আমরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
আমাদের একজন বলল,
'আমরা কাউকে দেখিনি। আমরা শুধু পানি খুঁজছিলাম।'
কিন্তু সে বিশ্বাস করল না।
রাগে সে আমাদের এক বন্ধুকে মুহূর্তের মধ্যে হত্যা করল।
ঠিক তখনই আরও কয়েকজন বিশালাকৃতির সত্তা এসে উপস্থিত হলো। তাদের পোশাক ছিল রাজকীয়, মুখে ছিল কঠোর গাম্ভীর্য।
তাদের মধ্যে একজন বললেন,
'থামো। এরা আমাদের দেখতে পায় না। বিচার না করে শাস্তি দেওয়া অন্যায়।'
তারপর তিনি আমাদের বললেন,
'তোমরা যে গর্ত খনন করেছ, সেটি আসলে আমাদের শিশুদের আবাসস্থল ছিল। বহু যুগ আগে পাহাড় ধসে এই গুহা মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। এর শেষ প্রান্ত পৃথিবীর গভীর সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত। এই ভূগর্ভস্থ জগতে আমাদের অসংখ্য জাতি বসবাস করে। তোমাদের কোদালের আঘাতে একটি শিশু মারা গেছে।'
আমরা ক্ষমা ভিক্ষা করলাম।
তখন তাদের প্রধান বিচারক রায় ঘোষণা করলেন—
'তোমাদের বন্ধু একজনকে হত্যা করা হয়েছে, তাই প্রতিশোধ সম্পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি কোদাল চালিয়ে শিশুটিকে হত্যা করেছে, তাকে অনন্তকাল এই কূপের প্রহরী হয়ে থাকতে হবে।
তাকে এই সিন্দুকে বন্দী রাখা হবে।
বিনিময়ে পৃথিবীর উপরিভাগে তোমাদের বংশধরেরা এই কূপ থেকে চিরকাল বিশুদ্ধ পানি পাবে।
শুধু প্রতি বছর ভাদ্র মাসের অমাবস্যা রাতে কূপ তার পুরানো মালিকের মালিকানাধীন থাকবে।
যতদিন কেউ কূপের তলদেশে আসবে না, ততদিন এই চুক্তি বহাল থাকবে।
কিন্তু যেদিন কৌতূহলী কোনো মানুষ এখানে পৌঁছাবে, সেদিন বন্দীর মুক্তি ঘটবে।
আর নতুন আগন্তুক তার স্থলাভিষিক্ত হবে।
সে যদি এই দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে, তবে সাত দিনের মাথায় তার মৃত্যু অনিবার্য।'
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।
তারপর মৃদু হেসে বললেন,
'হাজার বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি। রাজ্য উঠেছে, রাজ্য ধ্বংস হয়েছে। ভাষা বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু কেউ এখানে আসেনি।
আজ তুমি এসেছ।
অবশেষে আমার মুক্তির সময় হয়েছে।'
কথাগুলো শেষ হতেই বৃদ্ধের শরীর থেকে অদ্ভুত এক সাদা আলো বের হতে লাগল।
ধীরে ধীরে তার শরীর ধুলোয় পরিণত হলো।
সেই ধুলো পানির সঙ্গে মিশে মিলিয়ে গেল।
ঠিক তখনই সিন্দুকের ভারী ঢাকনাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।
অদৃশ্য কোনো শক্তি ডুবুরিকে ধীরে ধীরে তার দিকে টেনে নিতে লাগল।
সে প্রাণপণে সাঁতরে উপরে উঠে এল।
গ্রামে ফিরে এসে ডুবুরি কাউকে কিছুই বলল না। শুধু ঘটনার প্রতিটি খুঁটিনাটি লিখে একটি সিলমোহর করা চিঠি গ্রামের প্রধানের হাতে তুলে দিয়ে বলল,
—"আমি যদি সাত দিনের মধ্যে ফিরে না আসি, তখনই শুধু এই চিঠি খুলবেন। তার আগে নয়।"
এরপর সে গ্রামের সবাইকে একত্র করে বলল,
"এই কূপে আর কোনোদিন কেউ নামবে না। কিছু রহস্য মানুষের অজানাই থাকা উচিত। যে সত্য মানুষের জন্য নয়, তাকে জানার চেষ্টা করাই সবচেয়ে বড় বিপদ।"
পরদিন সকালে কূপের পাশে একটি কাঠের ফলক দেখা গেল। সেখানে খোদাই করা ছিল মাত্র একটি বাক্য—
"যে তলদেশ জানতে চায়, সে আর আকাশ দেখতে পায় না।"
সেই দিনই ডুবুরি বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। সবাই ভেবেছিল, সে দূরের কোনো দেশে কাজের সন্ধানে গেছে।
সাত দিন কেটে গেল।
অষ্টম দিনের সকালে গ্রামের প্রধান ডুবুরির রেখে যাওয়া চিঠিটি খুললেন।
চিঠির শেষ লাইনটি পড়ে তাঁর হাত কাঁপতে শুরু করল।
সেখানে লেখা ছিল—
"আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমি ফিরে যাচ্ছি... কূপের নিচে। পানির অপর নাম জীবন। আমি জীবনের জন্য জীবন উৎসর্গ করলাম। আমার ব্যাপারে কৌতুহলী হয়ো না। কিছু রহস্য সময়ের চেয়েও প্রাচীন, কখনো কখনো তার আড়ালে মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর কিছু লুকিয়ে থাকে।"
সেই চিঠি গ্রামের মানুষ কখনো প্রকাশ করেনি।
আজও প্রতি বছরের ভাদ্র মাসের অমাবস্যার রাতে কূপের গভীর থেকে এক অস্বাভাবিক সাদা আলো আকাশ ছুঁয়ে ওঠে। গ্রামের প্রবীণরা বিশ্বাস করেন, সেদিন সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত কূপটি আর মানুষের থাকে না—তার প্রকৃত মালিক ফিরে আসে নিজের হারানো অধিকার ফিরে নিতে।
সেই রাতে কেউ কূপের ধারে যায় না। কারণ লোকমুখে প্রচলিত আছে, কূপের চারপাশে তখন দুটি ছায়ামূর্তি ঘুরে বেড়ায়—একটি বিশালাকার দৈত্যের, অন্যটি সাদা পোশাক পরা এক নীরব মানুষের। একজন প্রভু, অন্যজন চিরন্তন প্রহরী।
আর গভীর রাতের নিস্তব্ধতায়, যদি কোনো দুর্ভাগা মানুষ কৌতূহলবশত কূপের কিনারায় দাঁড়িয়ে কান পাতে, তবে অতল গভীর থেকে ভেসে আসে একটি ক্লান্ত কণ্ঠ—
"তোমাদের কূপ... এখনও কি শুকিয়ে যায়নি?"

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।