ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির পাশের বাগানটাই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। বিশাল বিশাল আম, কাঁঠাল, শিমুল আর বটগাছ মাথা উঁচু করে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকত, যেন তারা আকাশকে ধরে রেখেছে। দুপুরের রোদ পাতার ফাঁক দিয়ে ছিটকে পড়ত মাটিতে, আর বাতাসে ভেসে আসত অজানা পাখির ডাক।

আমি প্রায়ই একা একা সেখানে ঘুরতে যেতাম।

গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ ওপরে তাকিয়ে থাকতাম। হঠাৎ একসময় মনে হতো, গাছের ডালপালার ফাঁকে কেউ উড়ে বেড়াচ্ছে।

তারা মানুষ, কিন্তু মানুষের মতো বড় নয়। ফড়িংয়ের চেয়েও সামান্য বড়। তাদের স্বচ্ছ ছোট ছোট ডানা রোদের আলোয় চিকচিক করত। কেউ ফুলের ওপর বসছে, কেউ পাতার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে, আবার কেউ হঠাৎ উড়ে অন্য গাছে চলে যাচ্ছে।

আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাদের দেখতাম।

তখন মনে হতো, এ পৃথিবী শুধু আমাদের নয়। এই বাগানের ভেতরেই আরেকটি পৃথিবী আছে—এত ছোট যে বড় মানুষের চোখে ধরা পড়ে না।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমি যতক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, সবকিছুই বাস্তব মনে হতো। বাতাসের শব্দ, পাতার দোলা, পাখিদের ডাক—সব যেন সেই ছোট মানুষগুলোর ভাষা হয়ে উঠত।

কিন্তু হঠাৎ কোনো পাখি জোরে ডেকে উঠলে, কিংবা দূর থেকে মা ডাকলে, আমার খেয়াল ভেঙে যেত।

চোখের পলকে সব মিলিয়ে যেত।

শুধু গাছ, পাতা আর আকাশ।

বছরের পর বছর কেটে গেছে।

আজ আমি বড় হয়েছি। সেই বাগানের অনেক গাছ আর নেই। তবু মাঝে মাঝে সেখানে দাঁড়ালে অদ্ভুত এক অনুভূতি জেগে ওঠে।

মনে হয়, কেউ যেন এখনও আমাকে দেখছে।

কয়েক মাস আগে বাড়িতে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগে একা বাগানের দিকে হাঁটছিলাম। হঠাৎ বাতাস থেমে গেল। চারপাশ নিস্তব্ধ।

ঠিক তখনই, একটি সাদা বুনো ফুলের ওপর ক্ষণিকের জন্য আলো ঝলসে উঠল।

আমি স্পষ্ট দেখলাম—একটি ক্ষুদ্র ডানাওয়ালা অবয়ব উড়ে পাশের পাতার আড়ালে চলে গেল।

আমি দৌড়ে কাছে গেলাম।

কিছুই নেই।

শুধু ফুলটি অদ্ভুতভাবে দুলছিল, অথচ বাতাস ছিল না।

সেদিন প্রথমবার মনে হলো—

হয়তো ছোটবেলায় আমি কল্পনা করিনি।

হয়তো শিশুরা এমন কিছু দেখতে পায়, যা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলে।