গ্রামের নাম এখন আর কেউ ঠিকমতো জানে না, কেউ রাজগ্রাম, কেউ জমিদার বাড়ি, কেউ দীঘিরপাড় নামে ডাকে।। পুরোনো মানচিত্রে একসময় নামটি ছিল, কিন্তু কালের গর্ভে সে নাম মুছে গেছে। চারদিকে ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, কাশবন আর জঙ্গল। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল বটগাছ। গাছটির শিকড় মাটির বুক ভেদ করে নেমে গেছে বহু দূর, আর ডালপালা এমনভাবে চারদিকে ছড়িয়ে আছে যে দুপুরের সূর্যও তার নিচে এসে যেন ম্লান হয়ে যায়।

বটগাছটির নিচে পড়ে আছে জমিদার আমলের একটি ইটের বেঞ্চ। ইটগুলো ক্ষয়ে গেছে, কোথাও কোথাও শ্যাওলা জমেছে। তবু অদ্ভুতভাবে বেঞ্চটি এখনো টিকে আছে।

আর বেঞ্চটির ঠিক পাশেই সেই দীঘি।

গ্রামের মানুষ একে বলে কালো দীঘি।

শোনা যায়, প্রায় ছয়শ বছর আগে কোনো এক রাজা এই দীঘি খনন করিয়েছিলেন। তখন এর চারপাশে ছিল রাজপ্রাসাদ, মন্দির আর বিশাল বাগান। রাজপরিবারের পূজা শেষে দেবদেবীর পুরোনো মূর্তি এই দীঘিতেই বিসর্জন দেওয়া হতো।

কিন্তু দীঘিটির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়টি অন্য।

প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, একসময় এই ঘাটেই কুমারী মেয়েদের বলি দেওয়া হতো। রাতের অন্ধকারে মশালের আলোয় তাদের নিয়ে আসা হতো। তারপর কী ঘটত, সে কথা কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারে না। শুধু এটুকুই শোনা যায়—পরদিন ভোরে ঘাটের পানিতে লালচে একটা আভা দেখা যেত।

কালের সঙ্গে রাজা নেই, জমিদার নেই, সেই মন্দিরও নেই।

কিন্তু দীঘিটি রয়ে গেছে।

শত শত বছর ধরে।

ঘাটের ইট ভেঙেছে, বটগাছের শিকড় বেঞ্চটিকে প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে, অথচ দীঘির পানি যেন আগের মতোই আছে। অদ্ভুত কালো। এতটাই কালো যে দুপুরের রোদেও পানির তল দেখা যায় না।

মাঝে মধ্যে দু-একজন বৃদ্ধ এসে সেই ইটের বেঞ্চে বসেন। কেউ গল্প করেন, কেউ চুপচাপ পানির দিকে তাকিয়ে থাকেন।

কিন্তু কেউ দীঘিতে নামে না।

এমনকি গ্রামের সবচেয়ে সাহসী ছেলেটিও নয়।

কারণ বিশ্বাস করা হয়—এই দীঘিতে যে নামে, তার শরীর অবশ হয়ে যায়। সে আর নিজের শক্তিতে ওপরে উঠতে পারে না।

কেউ যেন পানির নিচ থেকে তার পা ধরে টেনে নিয়ে যায়।

অনেকে অবশ্য এসবকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেয়।

কিন্তু যারা একবার সেই পানির কাছাকাছি গিয়েছে, তারা আর দ্বিতীয়বার যেতে চায়নি।

আর অমাবস্যার রাত?

প্রতি অমাবস্যার মধ্যরাতে নাকি দীঘির মাঝখানে দেখা যায় একটি স্বর্ণের নৌকা।

নৌকাটি এত উজ্জ্বল যে দূর থেকেও মনে হয়, কালো পানির ওপর কেউ যেন আগুন জ্বেলে দিয়েছে। নৌকায় দুজন মানুষ বসে থাকে। তাদের মুখ কখনো দেখা যায় না। তারা কোনো বৈঠা চালায় না, অথচ নৌকাটি ধীরে ধীরে পুরো দীঘি ঘুরে বেড়ায়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, নৌকাটি যখন ঘাটের কাছে আসে, তখন পানির ঢেউ একেবারেই ওঠে না।

শুধু বটগাছের পাতাগুলো কাঁপতে থাকে।

কেউ কেউ বলে, ওই নৌকায় বসে থাকে সেই রাজা আর তার পুরোহিত—যারা ছয়শ বছর আগে এই দীঘির রহস্যের সঙ্গে জড়িত ছিল।

আবার কেউ বলে, তারা মানুষ নয়।

তবে দীঘির সবচেয়ে ভয়ংকর রহস্য লুকিয়ে আছে তার মাঝখানের ছোট্ট দ্বীপটিতে।

দূর থেকে দ্বীপটিকে খুব সাধারণ মনে হয়। কয়েকটি পুরোনো গাছ, ঝোপঝাড় আর মাঝখানে কালচে একটা পাথরের মতো কিছু দেখা যায়।

কিন্তু সেখানে কেউ যায় না। প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, সেখানে দ্বীপের মাঝখানে একবার একটা শোল মাছ ও বেজির মহাযুদ্ধ হয়েছিল।
দুটোই দানবাকৃতির ছিল। বেশ এতটুকুই।

প্রায় একশ বছর আগে গ্রামের কয়েকজন সাহসী মানুষ নৌকা নিয়ে সেখানে গিয়েছিল।

তারা যাওয়ার আগে সবাইকে বলেছিল—

“আজ আমরা প্রমাণ করে আসব, এই দীঘিতে কোনো রহস্য নেই।”

তারা আর ফিরে এসে সেই কথা বলতে পারেনি।

ফিরেছিল ঠিকই।

কিন্তু স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে নয়।

তাদের চোখের দৃষ্টি বদলে গিয়েছিল। কেউ সারাক্ষণ পানির দিকে তাকিয়ে থাকত, কেউ অকারণে হাসত, কেউ মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বলত—

“ওরা এখনো দ্বীপে আছে।”

কী দেখেছিল তারা?

মৃত্যুর আগে একজন বৃদ্ধ শুধু একটি কথাই বলেছিলেন—

“ওই মাছটা মাছ ছিল না…”

তারপর তিনি চুপ হয়ে গিয়েছিলেন।

আরেকজন বলেছিল—

"শোল মাছটির আঁশ এখানে পড়ে আছে, সেগুলো এক বর্গফুটেরও বেশি বড়!"

তারা সেই আঁশের কয়েকটি পড়ে থাকতে দেখেছিল।

কিছুক্ষণ পরে তারা মাথায় অনেক ভারী বোঝার চাপ অনুভব করল, দীপটি ভূমিকম্পের মতো কাঁপতে শুরু করল এবং আস্তে আস্তে পানিতে তলিয়ে যেতে লাগলো।

কেউ একজন ভয়ে চিৎকার করে বলেছিল—

“চলো! এখনই চলো!”

তারা নৌকা ঘুরিয়ে পালিয়ে আসে।

এতটুকু বলার পরে আবার সে অচেতন হয়ে পড়েছিল। আর কিছুই বলেনি।

কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, ফিরে আসার পর তারা আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।

একজন সারাক্ষণ বলত, “পানির নিচে শহর আছে।”

আরেকজন বলত, “দ্বীপটা আসলে দ্বীপ নয়।”

তৃতীয়জন শুধু বলত—

“আমরা যা দেখেছি, সেটা আমাদের দেখার কথা ছিল না।”

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাদের কারও মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়নি।

তারপর থেকে কেউ আর ওই দ্বীপে যায়নি।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

প্রায় ত্রিশ বছর আগে এক বর্ষার রাতে প্রচণ্ড ঝড় হয়েছিল। দূর থেকে আসা এক বৃদ্ধ বটগাছের নিচে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন, বৃষ্টি না থামার কারণে তিনি কারো বাড়িতে যেতে পারলেন না। রাত গভীর হলে তিনি দেখেন, দীঘির পানি ধীরে ধীরে ঘূর্ণির মতো ঘুরছে।

তারপর পানির নিচ থেকে উঠে আসে একটি চকচকে স্বর্ণের নৌকা।

বৃদ্ধ ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেন। কিন্তু কানে শব্দ ভেসে এলো — ছপ...ছপ...ছপ
চোখ খুলতেই দেখেন রাজ পোশাক পরিহিত তিনজন লোক
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ দেখে বৃদ্ধা মনে মনে কিছুটা সাহস ফিরে পেল। জিজ্ঞেস করল আপনারা কারা? তারা কোন উত্তর না দিয়ে , উল্টো জিজ্ঞেস করল— "তুমি কোথায় থেকে এসেছো? গত কয়েকশো বছর ধরে এই গাছের নিচে কেউরাত্রি যাপন করেনি। তুমি কি একটা আমানত এই গ্রামের অমুক জেলের কাছে পৌঁছে দিতে পারবে?"
বৃদ্ধা সংশয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তারা একটা ছোট্ট শীতল মাটির হাড়ি বৃদ্ধার হাতে দিয়ে বলল — "এখনই এখান থেকে চলে যাও, এখানে বিপদ আছে"

এই বলে হঠাৎ তারা উধাও হয়ে গেল। বৃদ্ধা ভয়ে কাঁপতে লাগলো। তার সাথে থাকা টর্চের নিভু-নিভু আলোর সাহায্যে দেখলেন, শান বাঁধানো ঘাটের ইটের উপর থেকে শুরু হয়ে তার বসে থাকা বেঞ্চ পর্যন্ত বিস্তৃত ভেজা পায়ের ছাপ আছে। কিন্তু সেগুলো কোন মানুষের নয়। এমনকি পরিচিত কোন প্রাণীর নয়। এটা দেখার পর সে আর সেখানে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। নিভু আলোর টর্চ ও সেই মাটির পাত্র নিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। তখন প্রায় ভোররাত। এক বাড়িতে গিয়ে ডাকাডাকি শুরু করল। আমি এক বিপদগ্রস্ত মানুষ আমাকে সাহায্য করুন। তারা তাকে আশ্রয় দিল। ভোর হতেই তিনি সেই নামের জেলের ঠিকানা জানতে চাইলেন। আশ্রয়দাতা পরিবার জানালেন এইতো কাছেই তাদের বাড়ি।
বৃদ্ধা সেই বাড়িতে গিয়ে জেলের সাথে দেখা করে মাটির হাড়িটি তার হাতে দিয়ে বলল কেউ একজন তোমাকে এটা দিতে বলেছে। জেলে জানতে চাইল, কে বলেছে? কখন বলেছে?
এখন শেষ সম্পূর্ণ ঘটনা জেলেকে খুলে বলল।
তখন জেলে অবাক হয়ে বলল, এই হাঁড়িটি তো আমি চিনি। আমি মাঝেমধ্যে স্বপ্ন দেখি কোন একজন রাজা আমাকে এই হাঁড়িটি আমার হাতে তুলে দিচ্ছে। বৃদ্ধাও অবাক হয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমি এটা দিয়েছেন তিনিও রাজ পোশাক পরিহিত ছিল। তবে তখন আমার স্বাভাবিক বুদ্ধি কাজ করা বন্ধ করেছিল। আমি তাকে কোন প্রশ্ন করতে পারিনি। এবং কি করা উচিত সেটাও বুঝতে পারিনি। যাইহোক হাঁড়িটি ভেঙে দেখি।
আর এটি ভেঙে তারা দেখল একটি চিরকুট ও দুটি স্বর্ণের মুদ্রা একটিতে রাজা ও অন্যটিতে রানীর ছবি দেওয়া। মুদ্রাগুলো প্রায় ৬০০ বছর আগের।

জেলে কাঁপা হাতে মাটির হাঁড়িটি থেকে চিরকুটটি বের করল।

চিরকুটটি এত পুরোনো যে কাগজের রং প্রায় কালচে হয়ে গেছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, লেখাগুলো এখনো স্পষ্ট।

জেলে পড়তে শুরু করল।

চিঠিতে লেখা—

“যার হাতে এই মুদ্রা পৌঁছাবে, সে যেন জানে—সে আমাদেরই বংশধর। আমরা মৃত নই, আবার জীবিতও নই। যে পাপের শুরু হয়েছিল দেবতার নামে, তার শেষ হয়নি আজও। দিঘির জল শুকাও, আমাদের মুক্ত কর। এই অভিশপ্ত কালো জলকে পবিত্র কর"

বৃদ্ধা ও জেলে কিছুই বুঝতে পারলো না। শুধু দজন দুজনার দিকে ফ্যাল ফ্যালিয়ে তাকিয়ে রইল.....

কিছুক্ষণ পরে নীরবতা ভেঙে জেলে বলল,

— “ ছয়শ বছরের এই বিশাল দীঘি কীভাবে শুকাব?”

বৃদ্ধা আবারও হতাশার চোখে জেলের দিকে তাকিয়ে রইল।

সেই রাতেই তারা গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষকে ডেকে চিঠির কথা জানাল।

চিঠির কথা শুনে সবচেয়ে বৃদ্ধ লোকটি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর কাঁপা গলায় বললেন,

— “তোমরা জানো না, এই দীঘি নিয়ে একটা কথা বহু বছর ধরে আমাদের পরিবারে গোপনে চলে আসছে।”
সবাই তার দিকে তাকাল।

তিনি বললেন,
— “এই দীঘি কখনো প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়নি। রাজা এটা খনন করিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু এর নিচে নাকি আরও একটা পুরোনো জলাধার ছিল। খননের সময় মাটির নিচ থেকে একটা পাথরের দরজা পাওয়া যায়। সেই দরজা খুলতেই নাকি ভয়াবহ ঘটনা শুরু হয়।”

জেলে জিজ্ঞেস করল,
— “কী ছিল দরজার ওপারে?”
সেই বৃদ্ধ বললেন,
— “কেউ জানে না। রাজ পরিবার সেটাকে গোপন রাখে।
তবে ধারণা করা হয়, সেদিন থেকেই ওখানে মানুষ বলি দেওয়া হতো।

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

হঠাৎ বাইরে থেকে একটা শব্দ ভেসে এল।
ছপ…ছপ....ছপ.....
সবাই চমকে উঠল।