ধলা ভূতের ভয়ংকর মানুষের গল্প (একটি শিশুতোষ গল্প)
-সাইফ উদ্দিন সায়েম

একদা ভরদুপুরে ধলা ভূতের নাতি দুজন তার কাছে বায়না ধরল মানুষের গল্প শোনার।

ধলা ভূত তখন বটগাছের ছায়ায় বসে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছিল। নাতিদের বায়না শুনে চোখ মেলে বলল,

— এই ভরদুপুরে মানুষের গল্প শুনবি? মানুষের গল্প শুনলে ভয় পেয়ে দুপুরের ঘুমও হারাম হয়ে যাবে। তার চেয়ে এখন ঘুমিয়ে পড়। রাত গভীর হলে তোদের না হয় মানুষের ভয়ংকর গল্প শোনাব।

কিন্তু নাতি দুজন নাছোড়বান্দা। তারা এই ভরদুপুরেই মানুষের গল্প শুনবে। একসময় দুজনেই কান্নাকাটি শুরু করে দিল।

অগত্যা ধলা ভূত বলল,

— আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে গল্প শুনে ভয় পেলে কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবি না।

নাতি দুজন খুশি হয়ে দাদার পাশে এসে বসল।

ধলা ভূত গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

— মানুষ দুই ধরনের হয়। বেডা মানুষ আর বেডি মানুষ। আমাদের ভূত আর পেত্নীর মতোই। তবে বেডা মানুষের চেয়ে বেডি মানুষ অনেক বেশি ভয়ংকর।

বড় নাতি অবাক হয়ে বলল,

— বেডি মানুষ আবার কীভাবে ভয়ংকর হয়?
ধলা ভূত বলল,

— সেটা তোদের গল্প শুনলেই বুঝতে পারবি। বল, কোন মানুষের গল্প শুনবি?

দুই নাতি একসঙ্গে বলে উঠল,
— বেডি মানুষের গল্প!

ধলা ভূত একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— ঠিক আছে। তবে ভয় পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরবি না যেন!

দুই নাতি বলল,
— না, আমরা ভয় পাব না।

ধলা ভূত গল্প শুরু করল।
— সে অনেক বছর আগের কথা। তখন আমি আর আমার বন্ধু ফেক্লা ভূত একসঙ্গেই চলাফেরা করতাম। যেখানে আমি, সেখানে ফেক্লা। যেখানে ফেক্লা, সেখানে আমি। দুজনের বন্ধুত্ব ছিল একেবারে গলায় গলায়।

একদিন আমাদের খুব মাছ খেতে ইচ্ছে হলো।
আমরা জানতাম, গ্রামের এক বেডা মানুষ প্রায়ই রাতে নদীতে মাছ ধরতে যায়। আমরা ঠিক করলাম, সেদিন তার পিছু নেব। সে মাছ ধরবে, আর আমরা সুযোগ বুঝে দু-একটা মাছ চুরি করে খাব।

রাতের অন্ধকারে আমরা লোকটির পিছু নিলাম।
মানুষের চোখে আমরা ছিলাম অদৃশ্য। তবে ভূতেরা তো জানে, মানুষের আশপাশে থাকলে সাবধানে চলতে হয়। কারণ মানুষ ভূত দেখতে না পেলেও অনেক সময় তাদের উপস্থিতি টের পায়।

লোকটি নদীর ধারে গিয়ে মাছ ধরতে বসল। আমরা একটু দূরে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর তার বড়শিতে একটা মাছ উঠল।

ফেক্লা আমার কানে কানে বলল,
— ধলা, আজ তো মনে হচ্ছে ভালোই ভোজ হবে!

আমি বললাম,
— চুপ করে থাক। লোকটা চলে গেলেই মাছ নিয়ে পালাব।

কিন্তু তখনই লোকটি হঠাৎ পেছন ফিরে তাকাল।

আমরা দুজন সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে গেলাম।

লোকটি কিছুক্ষণ নদীর চারপাশে তাকিয়ে আবার মাছ ধরতে লাগল।

ফেক্লা ফিসফিস করে বলল,
— সে কি আমাদের টের পেয়েছে?

আমি বললাম,
— মনে হয় তাই। তবে ভয় নেই। মানুষ তো আমাদের দেখতে পায় না।

লোকটি আর কোনো কথা বলল না। কিছুক্ষণ পর মাছ ধরা শেষ করে ঝুড়ি হাতে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

আমরাও দূরত্ব রেখে তার পিছু নিলাম।

কিছুক্ষণ পর লোকটি হঠাৎ থেমে গেল।
সে চারদিকে তাকাল।
তারপর খুব আস্তে করে বলল,
— কেউ কি আমার পিছু নিচ্ছে?

আমরা দুজন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম।

লোকটি আবার হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু এবার তার হাঁটার গতি বেড়ে গেল।

আমরাও পিছু নিলাম।
অবশেষে সে বাড়িতে পৌঁছে গেল।

তার স্ত্রী দরজা খুলে দিল।

স্ত্রীকে মাছের ঝুড়ি দিয়ে লোকটি বলল,
— আজ অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটেছে।

তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল,
— কী হয়েছে?

লোকটি বলল,
— মনে হচ্ছে, কোনো ভূত আমার পিছু নিয়েছে। আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু বুঝতে পারছি কেউ আমার আশপাশে আছে।

স্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মুচকি হেসে বলল,
— ভূত যদি মাছ খেতে আসে, তাহলে তাকে মাছ দিয়েই আপ্যায়ন করতে হয়।
লোকটি অবাক হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকাল।

— তুমি কী করতে চাও?
বেডি মানুষটি বলল,
— তুমি শুধু চুপ করে থাকো। আমি দেখছি।

তারপর সে মাছগুলো পরিষ্কার করে কড়াইতে তেল ঢেলে চুলায় বসাল।

আমরা দুজন জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলাম।

ফেক্লা আমার কানে কানে বলল,
— ধলা, মনে হচ্ছে আজ আমাদের ভাগ্য খুলে গেছে!

আমি বললাম,
— এত খুশি হোস না। বেডি মানুষকে আমি বিশ্বাস করি না।
কড়াইতে তেল গরম হতে শুরু করল।

বেডি মানুষটি একে একে ছোট ছোট মাছ কড়াইতে ভাজতে লাগল।

তারপর হঠাৎ একটা ছোট মাছ জানালার বাইরে ছুড়ে দিল।

ফেক্লার চোখ চকচক করে উঠল।

সে বলল,
— ধলা! মাছ!

আমি তাকে থামিয়ে বললাম,
— দাঁড়া। আগে দেখি ব্যাপারটা কী।

কিছুক্ষণ পর বেডি মানুষটি আবার একটা ছোট মাছ বাইরে ছুড়ে দিল।

এবার ফেক্লা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে মাছটির দিকে এগিয়ে গেল।

আমি তার হাত ধরে বললাম,
— সাবধান! আমার ভালো লাগছে না।

ফেক্লা বলল,
— আরে ধলা, ভয় পাস না। সে তো আমাদের দেখতে পায় না!

আমি বললাম,
— দেখতে না পেলেও উপস্থিতি টের পেতে পারে।

ফেক্লা হেসে বলল,
— তুই সব সময় এত ভয় পাস কেন?

সে ধীরে ধীরে মাছটির কাছে এগিয়ে গেল।

বেডি মানুষটি ভেতর থেকে সবকিছু বুঝতে পারছিল।

সে আরেকটি মাছ বাইরে ছুড়ে দিল।

ফেক্লা আরও কাছে গেল।

তারপর আরেকটি।

ফেক্লা এবার একেবারে জানালার নিচে।

আমি দূর থেকে চিৎকার করে বললাম,
— ফেক্লা! ফিরে আয়!

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

বেডি মানুষটি হঠাৎ কড়াইটি দুই হাতে তুলে নিল।

তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে সমস্ত গরম তেল জানালার বাইরে ঢেলে দিল!
এক মুহূর্তের জন্য চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

ফেক্লার আর্তচিৎকারে রাতের নীরবতা ভেঙে গেল।

— ধলা...!

আমি ছুটে গেলাম।

কিন্তু আমার চোখের সামনে আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ফেক্লা নিথর হয়ে পড়ে রইল।
আমি তাকে ডাকলাম।
— ফেক্লা! ফেক্লা!

কিন্তু সে আর সাড়া দিল না।

বেডি মানুষটি ঘরের ভেতর থেকে শুধু বলল,
— মাছ খেতে এলে মাছের সঙ্গে তেলও খেতে হয়!

আমি ভয়ে আর সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়ালাম না।
সেই রাতেই আমি একা ফিরে এলাম।

পরদিন সকালে আবার সেখানে গেলাম।
ফেক্লার কোনো চিহ্ন নেই।
শুধু বাড়ির পাশের একটি গাছের ডালে একটা কালো কাক বসে ছিল। কাকটি আমাকে দেখেই ডাকল,
— কা... কা...
আমি থমকে দাঁড়ালাম।
সেই ডাকের মধ্যে যেন আমি ফেক্লার কণ্ঠ শুনতে পেলাম।

আমি বললাম,
— ফেক্লা?
কাকটি আবার ডাকল,
— কা... কা...

সেদিন থেকে আমার মনে হলো, ফেক্লা ভূত মারা গিয়ে কাক হয়ে গেছে।
ধলা ভূত এতটুকু বলে চুপ করে গেল।

তার দুই নাতিও একেবারে চুপ।

বড় নাতি দাদার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
— দাদা... বেডি মানুষটা কি সত্যিই এত ভয়ংকর?

ধলা ভূত ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ। সে আমাদের দেখতে পায়নি। কিন্তু আমাদের উপস্থিতি বুঝেছিল। আর সেই বুঝতে পারাটাকেই কাজে লাগিয়ে ফেক্লাকে ফাঁদে ফেলেছিল।

ছোট নাতি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
— দাদা... তাহলে মানুষ ভূত দেখতে না পেলেও ভূতের জন্য ফাঁদ পাততে পারে?

ধলা ভূত বলল,
— পারে। আর এ কারণেই বলি, মানুষকে কখনোই সহজ মনে করিস না।

হঠাৎ পাশের গাছের ডাল থেকে একটা কাক ডেকে উঠল—
— কা... কা...
দুই নাতি আঁতকে উঠে দাদাকে জড়িয়ে ধরল।

ছোট নাতি কাঁপা গলায় বলল,
— দাদা... ওটা কি ফেক্লা?

ধলা ভূত কাকটির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— কে জানে! হয়তো আমার পুরোনো বন্ধু এখনো আমাদের পাহারা দেয়।

কাকটি আবার ডাকল—
— কা... কা...

আর ভরদুপুরের নীরব বটগাছের নিচে বসে ধলা ভূত তার দুই নাতিকে আরও শক্ত করে কাছে টেনে নিল।

সমাপ্ত।