কত যুগ যেন কেটে গেল,
জন্মজন্মান্তর পার হলো,
কেউ আসল মুখটা দেখাল না!

এই পরিচিত ভিড়ের ভেতর
আমি এক অপরিচিত সত্তা,
খুঁজে ফিরি
এক টুকরো নির্ভেজাল মানুষের মুখ।

কথা ছিল,
অন্ধকার চিরে আলো ফুটলে
খসে পড়বে সব ছদ্মবেশ।
অথচ রোদ্দুর উঠতেই
শুরু হলো নতুন রঙের উৎসব!
মুখোশের মেলা চারদিকে!

ভোরের শিশির-ধোয়া শিউলির মতো স্নিগ্ধ মুখোশ,
দাওয়ায় বসা উদাস বাউলের মতো নির্লিপ্ত মুখোশ,
প্রেমিকার চোখের সেই গভীর, দীঘল-কালো মায়াবী মুখোশ,
সবই নিখুঁত,
সবই নিপুণ তুলির আঁচড়ে আঁকা শিল্প।

নেতার ভাষণে,
বন্ধুর আলিঙ্গনে,
প্রেমিকের গাঢ় চুম্বনে,
কোথাও কোনো খাদ নেই,
শুধু এক চিলতে প্রাণটুকু ছাড়া।

আমি তো চেয়েছিলাম
ভুল-ভ্রান্তিতে ভরা জ্যান্ত একটা মুখ,
যে মুখে আষাঢ়ের মেঘের মতো জমবে অবাধ্য অভিমান,
যে মুখে থাকবে হেমন্তের ঝরাপাতার মতো মলিন, অকৃত্রিম বিষাদ,
যার হাসিতে থাকবে না মেপে-রাখা কোনো জ্যামিতিক রেখা।

অথচ এই ইট-পাথরের নগরে,
এই নিয়ন-জ্বলা রাজপথে
হাজার রঙের খোলসের নিচে
ডুকরে কাঁদে একলা আত্মা।

সবাই ছুটছে, সবাই হাসছে,
যেন এক নিপুণ নাট্যমঞ্চে
চলছে মহড়াহীন নিখুঁত অভিনয়।

বুকের ভেতর
একটা আস্ত নদী শুকিয়ে কাঠ,
তবুও ঠোঁটের কোণে
আমরা ঝুলিয়ে রাখি এক চিলতে রৌদ্রোজ্জ্বল হাসি।
কারণ এই মেলায়,
বিনা মুখোশে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ।

আজকাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
যখন নিজের দিকে তাকাই,
বড় তৃষ্ণা পায়,
বড় কান্না পায়।

শিউরে উঠে দেখি,
আমার নিজের মুখটাই বা কোথায়?
কবে যেন, কোন অলক্ষ্যে,
আমার নিজের চামড়াও
হয়ে গেছে নিটোল এক মুখোশ!

এবং সবচেয়ে হিমশীতল সত্যটি হলো,
এই মুখোশটা এখন আর খোলার নয়,
এটাই হয়ে গেছে আমার একমাত্র মুখ।