ইছামতীর ঘাটে নৌকোগুলোর গায়ে এখন শুধু শ্যাওলার প্রলেপ। জলের কিনার ঘেঁষে দাঁড়ানো প্রাচীন হিজল গাছের ছায়া এসে পড়েছে ভাঙা বাড়িটার উঠোনে। হেমন্ত সেখানে এসে দাঁড়াল। ছাব্বিশ বছরের ব্যবধান, তবু তার পায়ের নিচের মাটি আজও ভেজা, আজও চেনা।
উঠোনের ফাটলে ফাটলে বুনো ফার্ন আর কালচে শ্যাওলা জমে আছে। মাঝখানের শানে কড়া রোদ পড়েছে। হেমন্ত চোখ বুজল। বাতাসে এখনও ভেসে আসছে চালের গুঁড়োর সেই ভেজা, মিহি গন্ধ। বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন ফাঁকা হয়ে গেল।
সেদিনও ছিল শ্রাবণের এক গুমোট বিকেল। নারকেল পাতার মাথায় কালচে নীল আকাশ ভার হয়ে নেমে এসেছিল। ভোরে কলকাতার ট্রেন। গোছগাছ সব শেষ, বাকি শুধু একটা বিদায়।
কল্যাণী তুলসীতলার নিচে উবু হয়ে বসে আলপনা আঁকছিল। তার সাদা শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছিল, আঙুলগুলো চালের গুঁড়োয় মাখামাখি। হেমন্তের জুতোর শব্দে সে মুখ তুলল না। ঘামে লেপটে থাকা চুল কপালে আটকে ছিল।
“কাল সকালে...” হেমন্তের গলা শুকিয়ে গেল।
কল্যাণী কোনো উত্তর দিল না। তার তর্জনী পাথরের বুকে পদ্মের পাপড়ি টানছিল। হঠাৎ আঙুলটা কেঁপে উঠল, রেখাটা বেঁকে গেল। সে দ্রুত বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছতে চাইল, কিন্তু পারল না। সাদা প্রলেপে একটা অগোছালো আঁচড় রয়ে গেল।
হেমন্ত ভেবেছিল ও হয়তো কাঁদবে, অন্তত একবার মুখ তুলে বলবে, যেতেই হবে? কিন্তু কল্যাণী মাথা নিচু করে আলপনায় মন দিয়ে রইল। যেন ওই অসম্পূর্ণ পদ্মটুকুই তার শেষ আঁকড়ে ধরা।
তারপর বৃষ্টি নামল। হুড়মুড় করে, বড় বড় ফোঁটায়। মাটির সোঁদা গন্ধে চারপাশ ভারী হয়ে উঠল। হেমন্ত ছাদের নিচে সরে এল, কিন্তু কল্যাণী নড়ল না।
জলের ঝাপটায় আলপনা গলতে শুরু করল। সাদা রেখাগুলো উঠোনের ঢাল বেয়ে জলের স্রোতে মিশে যাচ্ছিল। নিখুঁত পদ্মটা একটা ফ্যাকাসে দাগ হয়ে গেল। কল্যাণীর শাড়ি ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপটে গেছে, হাত বেয়ে সাদা জল গড়িয়ে পড়ছে।
“কল্যাণী, উঠে আয়!” হেমন্তের গলা ভেঙে গেল।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ভিজে চুল গালে লেপটে আছে। একবার মুছে যাওয়া আলপনার দিকে তাকাল। তারপর সোজা হেমন্তের চোখে চোখ রাখল। সেই দৃষ্টিতে কোনো অভিমান ছিল না, শুধু এক অদ্ভুত, নিস্তব্ধ ক্লান্তি।
“বৃষ্টিতে মাটির দাগ মুছে যায়, হেমন্তদা,” তার গলা প্রায় ফিসফিস করে উঠল। “কিন্তু জল তো মাটির ভেতরেই ঢুকে যায়।”
ভিজে শাড়ির আঁচল টেনে সে ধীর পায়ে ঘরের ভেতর চলে গেল। দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
ছাব্বিশ বছর পর এই উঠোনে দাঁড়িয়ে হেমন্তের আঙুল কেঁপে উঠল। সে ঝুঁকে পড়ে শ্যাওলা-ধরা পাথরের শীতল গায়ে হাত রাখল। আকাশে কাঠফাঁটা রোদ। তবু তার মনে হলো, কোথাও খুব কাছে, একটি পুরোনো শ্রাবণ আজও ঝমঝম করে নেমে আসছে।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।