শহরের কংক্রিটের গলায় যখন দুপুরের রোদ ছুরির ফলার মতো বিঁধে থাকে, তুমি হঠাৎ নিজের ছায়ার সামনে থমকে দাঁড়াও। সেই ছায়া কি সত্যিই তোমার? নাকি সে এক ক্লান্ত, মেরুদণ্ড-বাঁকা, শৃঙ্খলিত জানোয়ার; যার পাঁজরের ভেতর থেকে এক অবরুদ্ধ চিৎকার গলা ফাটিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়, অথচ অভ্যাসের নিষ্ঠুর আঙুল তাকে চেপে ধরে রেখেছে।
তুমি রোজ সকালে ঘুম ভেঙে ওঠো, আয়নার সামনে মুখে মেকি হাসির মুখোশ আঁটো, নাগরিক ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে সান্ত্বনা দাও, “এটাই তো জীবন।” কিন্তু রাতের গভীর নীরবতায়, যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে, তখন নিজের বুকের খাঁচায় হাত ঢুকিয়ে অনুভব করো; ভেতরটা হিম, ফাঁপা, শূন্য। সেখানে একটি ছোট্ট, রক্তাক্ত, ডানা-ভাঙা পাখি এখনও প্রাণপণে ডানা ঝাপটায়। জন্মের প্রথম কান্নায় যে আদিম প্রাণ পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, আজ সেই প্রাণই নিজের তৈরি অদৃশ্য কবরে ধুঁকে ধুঁকে মরছে।
এই কারাগারের কোনো লোহার গরাদ নেই। এর দেয়াল তৈরি হয়েছে তোমার ভয়, লোকলজ্জা, নিরাপত্তার লোভ আর “কী বলবে লোকে”-র বিষাক্ত ইট দিয়ে। তুমি ভাবো তুমি সুরক্ষিত। আসলে তুমি হাঁটতে থাকা এক নিভে যাওয়া প্রদীপ; যার মাঝে আলো নেই, কেবল উষ্ণতার স্মৃতিটুকু অবশিষ্ট আছে, অথচ আত্মা অদৃশ্য শিকলে বাঁধা।
মানুষ কেন শিকলকে এত আঁকড়ে ধরে? কারণ শিকল সিদ্ধান্তের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়। শিকল ফিসফিস করে বলে, “চুপ করো, মানিয়ে নাও, যেমন চলছে তেমনই চলুক।” কিন্তু প্রতিটি শিকলের দাম তোমার সত্তার একেকটি জীবন্ত টুকরো। তোমার ভেতরের উন্মাদ প্রেমিক, দুর্দান্ত স্বপ্নদ্রষ্টা, নগ্ন সত্যকে চেটে খাওয়া সেই আদিম পশুটা ধীরে ধীরে পচে যায়।
কিন্তু আত্মা কখনো পুরোপুরি মরে না।
হঠাৎ একদিন, হয়তো মাটির সোঁদা গন্ধে, হয়তো অচেনা চোখের অতলে তাকিয়ে, অথবা আয়নায় নিজের নিষ্প্রাণ দৃষ্টির সামনে, ভেতরের কিছু একটা সশব্দে ভেঙে যায়। শত শত বছরের অবদমিত দীর্ঘশ্বাস আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। সেই প্রলয়ঙ্কর মুহূর্তে তুমি বুঝতে পারো, এই নিরাপদ মৃত্যুর চেয়ে বাইরের রক্তাক্ত, ঝড়ো, অনিশ্চিত জীবন হাজার গুণ পবিত্র।
শিকল ভাঙা কোনো উৎসব নয়; এটা একটা হত্যাকাণ্ড। নিজের ভেতরের ভীতু, আরামপ্রিয়, আপসকামী সত্তাটিকে নিজ হাতে কুপিয়ে মারার নির্মম বলিদান। রক্ত ঝরবেই। কবজিতে গেঁথে যাওয়া লোহা ছিঁড়তে গেলে মাংস ছিঁড়বে, হাড় ফাটবে; চোখে তখন জল থাকে না, থাকে দগ্ধ আলোর তীব্রতা। আর সেই রক্তের স্রোতের উপর দাঁড়িয়েই প্রথমবার ফুটে উঠবে তোমার আসল, ভয়ংকর সুন্দর মুখ।
সেই মুহূর্তে তুমি ভয়ংকর একা হয়ে যাবে। কিন্তু সেই একাকীত্ব শূন্যতা নয়; তা নিজেকে ফিরে পাওয়ার প্রথম নগ্ন, কাঁপা কাঁপা আলিঙ্গন।
এরপর আসে সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। শুধু ভাঙা নয়, ধ্বংসস্তূপের উপর নিজের এক নতুন, সত্য, স্বাধীন সত্তা গড়ে তোলা। পুরনো খোলস ফেলে নতুন ডানায় উড়তে শেখা। নিজের সীমার গভীরে অসীমের সুর বাজানো।
মুক্তি কোনো বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। মুক্তি লেখা হয়: নিজের রক্ত-মাংসের নিবিড় অভিজ্ঞতায়, ঘামের লবণে, অশ্রুর দীপ্তিতে, আর ভাঙা হৃদয়ের টুকরোগুলো নিজ হাতে জোড়া দিয়ে।
যেদিন তুমি তোমার সমস্ত ভয়কে চুমু খেয়ে বলবে, “আয়, আমার সাথে চল”; সেদিন পৃথিবীর সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে এক অপার্থিব সুর বেজে উঠবে।
সেই সুর কোনো দেশের নয়, কোনো কালের নয়; তা মানবাত্মার চিরন্তন বিজয়ের গান।
তুমি যেদিন নিজের শর্তে একটি মুহূর্তও বাঁচতে শিখবে; সেদিন তুমি আর কেবল বেঁচে থাকবে না, তুমি জ্বলবে। আর তোমার বুকের সেই লেলিহান আগুন শত শত নিভু নিভু প্রদীপকে জ্বালিয়ে তুলবে।
এটাই মুক্তির স্বরলিপি। এটাই জীবনের গভীরতম সত্যের স্বরলিপি।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।