বৃষ্টিতে ভেজাবো
এমন প্রতিজ্ঞা কেউ করে বলুন। বৃষ্টিতে ভেজার কত সমস্যা। ঠাণ্ডা লাগতে পারে।জ্বর আসতে পারে।পরণের কাপড় চোপড় ভিজে কত অসুবিধে হতে পারে একবার ভাবুন।জামা পড়লে তবু সামলানো যায়। কিন্তু শাড়ী পড়া থাকলে সামলানো খুব মুশকিল।গায়ের সাথে এমনভাবে ল্যাপ্টে থাকে যে আশেপাশের লোকগুলোর চোখ যেন সরতে চায় না। এসব মনে পড়লে গা ঘিনঘিন করতে থাকে। তখন যদি কেউ বলে –বৃষ্টিতে ভেজাবো- তাকে কী করতে ইচেছ করে।–মৌমিতার চটাং চটাং কথা শুনে শুভ বলল-ও, তুমি শুধু বৃষ্টিতে ভেজার খারাপ দিকটা দেখলে। আর বৃষ্টি ভেজা মেয়েকে দেখে কত ছেলে প্রেমে পড়ল, কবি কালিদাস মেঘদূত লিখল, কত গীতিকার গান বাঁধল, সুরকার সুর করল, শিল্পী গাইল, কত নায়ক-নায়িকা অভিনয় করে কত দর্শকের মন জয় করল সেটা দেখলে না।আর শুধু ছেলেরা মেয়েদের দিকে তাকায় না, মেয়েরাও ছেলেদের দেখে বলাবলি করে -ওয়াও কী স্মার্ট দেখতে।–ওকে থামিয়ে দিয়ে কণিকা বলল-গল্প আর বাস্তবতা এক নয়। বৃষ্টি ভেজা পথে চলাফেরা করা কত কষ্ট, একবার গাড়ি নিয়ে বের হলে পরিষ্কার করাতে পয়সা নষ্ট, গাড়ির চাকা থেকে ছিটকে আসা কাদায় পোশাকের বারোটা বাজে, চটি কিংবা জুতোর কাদায় পেছনে নকশা সৃষ্টি হওয়ার কথা কে বলবে!-ওর কথা শেষ হতেই তামান্না বলল-তোমরা যা-ই বল, আমার কিন্তু বাড়ির ছাদে বৃষ্টিতে ভিজতে দারুণ লাগে। আর টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ সে যে কী মজার তা বলে বুঝানো যাবে না। আরে রাতে বৃষ্টি হলে কী চমৎকার ঘুম হয়। বিয়ে করলে বুঝবে বৃষ্টির রাত কত রোমান্টিক।–সাথে সাথেই প্রীতম বলল- রোমান্টিক না ছাই!বৃষ্টি হলে ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ হয়। ঠিকমতো মাল আনা নেওয়া করা যায় না, পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, সময়মতো ডেলিভারী দেয়া যায় না, প্রফিট মার্জিন কম হয়। বাজারে কিছু পাওয়া যায় না, দাম যায় বেড়ে। বৃষ্টি হওয়া মানে ক্রেতা বিক্রেতা উভয়েরই ক্ষতি।–শুনে পায়েল বলল- শুধু ক্ষতি হবে কেন, লাভও তো হয়। চাতকের প্রতীক্ষার অবসান হয়। গাছেরা বৃষ্টিতে পরিপুষ্ট হয়।উত্তপ্ত বসুন্ধরা শীতল হয়। এই বৃষ্টির উপর নির্ভর করে কৃষক ফসল ফলায়। স্বাতী নক্ষত্রে একফোঁটা বৃষ্টি পেলে ঝিনুকের বুকে জন্মে মুক্তা, হাতির মাথায় হয় গজমোতি।–সন্দীপণ বলল-মামার বাড়িতে বেড়াতে গেলে দেখতাম বৃষ্টির রাতে মেজমামা জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়তো। আর অনেক কই মাছ নিয়ে ফিরতো। তাছাড়া বেশি বৃষ্টি হলে স্কুলে যেতে হয় না। বাড়িতে বসে টিভি দেখে, ভিডিও গেইম খেলে, গল্প বই পড়ে সময় কাটানো যায়। বৃষ্টি আমাদের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দেয় বলতে পারো। -আলোচনা যখন জমে উঠেছে ঠিক তখনই পায়েলের ম্যাসেঞ্জারে একটা ম্যাসেজ এল। মোনালিসা আর নেই। কান্নায় তার দুচোখ ভরে গেল। সবাই জানতে চাইল কী হয়েছে। বলল- মোনা আমাদের ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে গেছে। আর কেউ বৃষ্টিতে ভেজাবো বলে জিদ করবে না। -সবার মুখ কালো মেঘে ঢেকে গেল। মেঘের গর্জনের মতো শোনাতে লাগল চাপা কান্নার শব্দ। বিজলী চমকানোর মতোই হঠাৎ মৌমিতা বলল- বড্ড জেদি ছিল মেয়েটা। সেদিন আমাদের বৃষ্টিতে ভেজাবে বলে কী জেদটাই না করলো। শেষে ফুচকা খাওয়াবে বলে সবাইকে বৃষ্টিতে ভেজালো। নিজেও খুব করে ভিজলো। তারপর শুনলাম জ্বর এসেছে রাতে। পরের দিন হসপিটালে নিতে হলো। মাত্র তিন দিনের জ্বরে মেয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে গেল।–শুভ বলল- ও সবসময় বলতো ফার্স্ট হয়ে দেখিয়ে দেবে ও কারো চেয়ে কম নয়। তাই বুঝি আমাদের আগে গিয়ে স্বর্গে প্রথম স্থান দখল করলো।–কণিকা বলল- ও আমাকে অনুরোধ করতো “বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি” গানটা শোনাতে, গাইতোও আমার সাথে, কী মিষ্টি ছিল ওর কণ্ঠ, সেই শান্তির বারি আজ তাকে চিরতরে শান্ত করে দিল।–তামান্না বলল- আমি বুঝতে পারছিনা যে, এমন চঞ্চল, সবাইকে সবসময় যে আনন্দ দিতো সে এমন কী অপরাধ করলো যে তাকে এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে যেতে হলো।শুধুই কি বৃষ্টিতে ভিজেছিল বলে, নাকি অন্য কোন কারণ। -প্রীতম বলল- আমরা কত অসহায়। আমাদের প্রিয় মানুষগুলো যখন আমাদের ছেড়ে চলে যায় তখন আমাদের কিছুই করার থাকে না।–সন্দীপণ বলল- প্রতিবছর বর্ষার প্রথম দিন ও এসে বলতো মেঘমল্লার রাগে একটা খেয়াল শোনাতে। বর্ষা ওর খুব প্রিয় ঋতু ছিল।তাই এই বর্ষায় তার আপন ঘরে ফিরতে হলো। এখন থেকে বৃষ্টি এলে সে আসবে আমাদের স্মৃতিতে, মনের আকাশে জমবে কালো মেঘ, বৃষ্টি হয়ে ঝরবে দুচোখে। চোখের জলে ভিজবো আমরা। আর সে হেসে বলবে – বলেছিলাম না! তোমাদের বৃষ্টিতে ভেজাবো।
মন্তব্য (10)