সে আমার স্কুল ও কলেজ জীবনের অতি ঘনিষ্ট বন্ধু খোকন দাস । ইদানীং মানে গত দশ / বারো বছর ধরে মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পরে। কিন্তু এক মিনিটের জন্যও কখনো ভুলেনি সে একজন স্কুল মিসেস এর স্বামী বা এটাও ভুলেনি যে আমি তার ঘনিষ্ট বন্ধু। আজকের দিনে তাকে নিয়ে দু'একটা স্মৃতি কথা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করি।
- কলেজ জীবনে যদিও সে রামঠাকুর কলেজে আর আমি এম. বি. বি কলেজের ছাত্র, বি.কম. ফাইনাল পরীক্ষার সময়ে যাতায়াত ও যানবাহনের অসুবিধার কারনে দুমাসের জন্য আমাকে আগরতলা মঠ চৌমুহনী ভাড়া যেতে হয়েছিল, সে আমাকে এতটাই ভালোবাসতো যে, এক্ষেত্রে তার কোন অসুবিধা না থাকা স্বত্বেও শুধুমাত্র আমার কথা ভেবে উল্টোদিকে আমার সঙ্গে চলে গিয়েছিল। শুধুমাত্র আমার সাহচর্য ও সান্নিধ্যের এই কথাটা শেয়ার করলাম এই কারনে যে, সে সময়ে এই কাণ্ডটা করার মতো আর্থিক অবস্থা আমাদের কারোর ছিল না । আমিতো এই দু-মাসের খরচের দায় মেটানোর জন্য শেষ পর্যন্ত সাধের বাই-সাইকেলটাকে বিক্রি করে দিতে হয়েছিল । এ প্রসঙ্গে আরোও অনেক কথাই মনে পরছে তবে আজকের দিনে আর বেশি কিছু লিখলাম না ।
** ছোটবেলা থেকেই সে সাদাসিধা, সরল এবং প্রাণবন্ত একটা ছেলে , সেই সঙ্গে জুড়ি ছিল অমল দে । পাশাপাশি বাড়ি, অমল যদিও আমাদের ক্লাসমেট নয় তবে একজোট ছিলাম । একবার আমাদের বয়েসের থেকে বড় এক বন্ধুর বিয়েতে গিয়ে দু-তিনজন বান্ধবী জুটে গেছিল । তাদের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় সাত আট কিলোমিটার দূরে । সেই বন্ধুত্বের সুবাদে কোন না কোন বাহানায় বাই-সাইকেলে প্রায়ই ওদের বাড়িতে যেতাম । কিছুদিন পর আমাদের নিজেদের কাছেই বিষয়টা দৃষ্টিকটু লাগছিল । তবুও যৌবনের জৌলুষ, সুন্দরীদের বাড়ি যাওয়ার একটা ভাল বাহানা খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে হঠাৎ করে মাথায় এলো, কারোও বিয়ের নিমন্ত্রন করতে যেতে পারি বটে । যেই কথা সেই কাজ, পাত্র ঠিক, সেই পাত্র আর কেউ নয়, একমাত্র বলির পাঁঠা খোকন কেননা আমরা তো সেই মেয়েদের পছন্দ করি তাই আমাদের কারো বিয়ে বলা যাবে না, যদিও খোকন একজন কে পছন্দ করতো তবুও আমাদের স্বার্থে সে সেই প্রস্তাব অনায়াসে মেনে নিয়েছিল । এ জন্যেই এই স্বার্থপর জগতে এমন বন্ধুকে বলির পাঁঠা’ই বলতে হয় বটে । সেদিনের সে সময়ের তার সেই মিথ্যে অভিনয় আমাকে বা আমাদেরকে এতটাই মুগ্ধ ও স্তম্ভিত করেছিল যে, আজ প্রায় ৩০ বছর পরেও সে কথা ভুলতে পারিনি বা ভুলিনি । পরিনতি জানার আগ্রহ দেখাবেন না কেউ, কেননা যে সময়ের গল্প করছি সে বয়সের অনেক গল্পের পরিনতিই অজানা থাকে ।
*** আরেকটা বিশেষ দিনের কথা বলে শেষ করবো, আমাদের বিয়ের আগের কথা । আগেই বলেছি ছোটবেলা থেকেই সে সাদাসিধা, সরলমনা । এক সময়ে সে, শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহন করে দেবীপুর মন্দিরে স্থায়ীভাবে চলে গেছিল । ধর্মীয় ভাবাবেগের কাছে আমরা পরাজিত হয়ে যোগাযোগটা কমেই গেছিল কিন্তু আমার বিয়ের কথা শোনে সে আর দূরে থাকতে পারে নি, বিয়ের পরের দিন এসে হাজির এবং অভিমানের ভেজা চোখের কাছে হার মেনে আমি তাকে আমার ফিরা-যাত্রা অনুষ্ঠানে সঙ্গে নিয়ে গেলাম । সে একবারের জন্য মানা যেমন করেনি তেমনি আমার শশুর বাড়িতে গিয়ে সে জানালো যে, এমনিতে নিরিমিশাষী হলেও বন্ধুর বিয়েতে সেই আদর্শকে সে জলাঞ্জলি দেবে । আমি অনেক বুজানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না ।
****শেষ করার আগে আরেকটা কথা মনে পরল –সে ছিল নায়িকা দিব্যা ভারতীর ভীষণ ভীষণ ভক্ত (ফ্যান) । সে সময়ে সম্ভবতঃ কলেজ ফাইনালের বছর, আমি রেডিওতে ইংরেজী খবর শোনে তাকে বললাম, “খোকন, দিব্যা ভারতী নাকি মারা গেছে !” সে “ও, আচ্ছা “-বলে আবার অংকে মনযোগ দিল, ঠিক দু মিনিট পরে সে স্তম্ভিত হয়ে বলেছিল ,কি বললি ! দিব্যা……ভারতী……নেই ।“ সেই কথাটা আজও যেন আমার কানে গুঞ্জরিত হচ্ছে ।
এই সব স্মৃতি কথার নায়কের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হলেও সে কাউকে কিছু বলতো না বা ডিষ্টার্ব করতো না, শুধুই একটা বাতিক ছিল, বিড়ি খাওয়া এমনকি প্রায়ই রাস্তায় বিড়ির শেষাংশ যা অন্যরা ফেলে দিত সেটুকু সে কুড়িয়ে খেত, এই ছিল তার বাতিক । যদিও তার স্ত্রী তাকে সব সময় বেশী বেশী করে বিড়ি কিনে দিয়ে রাখতো তবুও । মাস খানেক আগে একদিন কোন একটা বিশেষ কারনে আমার বাড়ির সি সি ক্যামেরার আগের রাতের ফুটেজ প্লেব্যাক করে দেখছিলাম, হঠাত দেখি রাত দেড়টায় সে রাস্তায় বিড়ির শেষাংশ তুলে নিয়ে দেশলাই দিয়ে জ্বালিয়ে খাচ্ছে । পরের দিন সামনে পেয়ে ভীষণ গালিগালাজ করলাম, সে একটা কথাও বললো না, আমি বিমলের দোকান থেকে এক পেকেট বিড়ি কিনে দিলাম এবং বললাম ,”যদি তু্র বিড়ি না থাকে আমার কথা বলে যে কোন সময় দোকান থেকে আমার কথা বলে বিড়ি নিয়ে যাবি কিন্তু রাস্তা থেকে আর কুড়োবি না “ সে কোন প্রত্যুত্তর করে নি, বিড়ি নিয়ে চলে গেল, যদিও বিড়ি কুড়ানো ছাড়েনি তবে আমার নামে আর কোনদিন বিড়িও নেয়নি ।
আমার সেই বন্ধুটা আজকে আর নেই, কিছুক্ষন আগেই তার শেষকৃত্য করে আসলাম । হঠাত করেই সম্ভবতঃ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেল সবাইকে কাঁদিয়ে । যাবার সময় স্ত্রী সহ এক ছেলে ও এক মেয়েকে রেখে গেছে । আর বেশী কিছু বলার ভাষাও খোঁজে পাচ্ছি না, আপনাদেরকেও ভারাক্রান্ত করবো না । শেষ কথা, যেখানেই থাকিস ভালো থাকি, পরলোক বলে কিছু থাকলে সেখানে তুর এই সরল সিদা ভালো মনটাকে নিয়ে নিস্পাপ ভালোবাসায় ভালো থাকিস সবার হৃদয়ে ।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।