২০২৩-এর শেষে মগবাজার মোড়ে দাঁড়াইয়্যা বিড়ি ফুঁকতেছিলাম। ওই টাইমলাইনে দুর্ঘটনা ঘটলে ঘটতেই থাকত। দুর্ঘটনাগুলো সমজাতীয়। আগুন লাগলে লাগতই, ডাকাতি হলে হতই। তখন রিকশার চাকায় নারীদের ওড়না পেঁচিয়ে ম্যাসাকার হওয়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। মহামারীর মতো এটি ছড়িয়েছিল সর্বত্র। সংবাদপত্রে লাল কালির শিরোনামে লেখা হতো, “রিকশার চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে নারীর মৃত্যু”। মৃত্যুর সংখ্যা হুঁ-হুঁ করে বাড়তেই মানুষ বিষয়টা আমলে নেয়া শুরু করল। সবাই রাতারাতি সচেতন। রাস্তায় রিকশা দেখামাত্রই সবার নজর চাকায়। অতীতে কোনো ইভটিজার নারীযাত্রীর দিকে কুদৃষ্টি ছুড়ে দিলেও তখন রিকশা দেখলেই তৎপর চোখে চাকায় কোনো ওড়না/কাপড়ের বর্ধিতাংশ জুড়ে আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করত। তো বিড়ি হাতে মগবাজার মোড়ে দাঁড়িয়ে উদাস চোখে ল্যাম্পপোস্টের সোডিয়াম আলো দেখছিলাম। মাগরিবের ওয়াক্ত শেষে শীতল বাতাস; খারাপ না। ভালো সময় বেশিক্ষণ কি স্থায়ী হয়? আচমকা এক রিকশা পায়ের ওপর দিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলের খোঁজখবর নিয়ে গেল। নিজেকে সামলে একরাশ বিরক্তিসহ আরেকটা বিড়ি পুড়াব ঠিক তখনই এক রিকশার আবির্ভাব। রিকশার উপস্থিতি নজরে আসা স্বাভাবিক কিন্তু কারও বোরখার বর্ধিতাংশ চাকার ভেতর হুটোপুটি খাওয়া নিতান্তই অস্বাভাবিক। সচেতন আমি হাত উঁচিয়ে বললাম, ‘এই যে আপা বোরখাটা ওঠান।’ আমার হাতের ভঙ্গি তিনি দেখেছেন। বোধহয় আমার কথার ধরন ভুল ছিল। তখন অবস্থাটা অনেকটা এমন ছিল―আর দু প্যাডেল মারলেই হয়তো বোরখার সাথে চাকার একচোট হয়ে যেত। তাৎক্ষণিক ওভাবে বলা ছাড়া উপায়ই বা কী? আমার অন্তত জানা নেই। তো ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, ‘কিরে ‘শুয়ো** বাচ্চা’ মহিলা দেখলে হুশ থাকে না? তোর মায়ের বয়সী আমি।’ আশপাশে কিছু লোক ভুত দেখার মতো চমকে ওঠল। সবার তীক্ষ্ন দৃষ্টি আমার দিকে। তারা বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করছে। হয়তো দুইয়ে দুইয়ে চার মিললেই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমি বললাম, ‘মাফ করবেন, আসন্ন দুর্ঘটনা থেকে যেন বেঁচে যান তাই আমি আপনাকে সচেতন করলাম।’ তিনি বললেন, ‘বেডি দেখলে দরদ মারান লাগে ****...।’ আমি আর কথা বাড়ালাম না। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে মুখ থেকে বেরিয়ে এল ‘সরি’। হয়তো ভদ্রমহিলা শোনেননি; শুনেছে প্রকৃতি। আশপাশের দায়িত্ববান ভাইগুলোর উপস্থিতিও কমতে শুরু করল। তাদের দুয়েকটা গালাগালও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। তারা হয়তো ভেবেছিল―এই সচেতন ব্যক্তিকে পিটিয়ে ঘরে ফিরব, আজ আর বউ পেটাব না। আমার খুব আফসোস হচ্ছিল। যদি আমার জন্য কোনো ঘরের রানী একবেলা কম মার খেত―কতই না ভালো হত। আমার দোষ কী ছিল, ‘এই যে আপা বোরখাটা ওঠান’ বলা? অবশ্য আমার কোচিংয়ের এক শিক্ষক একবার বলেছিলেন, ‘‘শুনো নাজাত তুমি তোমার কথার জন্য রাস্তায় ‘গণধোলাই’ খাবা।’’ বোধহয় স্যারের দোয়া জোরালো ছিল না। দুর্বল দোয়া অবচেতন মনে সাময়িক অশান্তি সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে কলিকাতা হারবালের মতোই এর কাযর্কারিতা। কালেভদ্রে কাজে দেয় আরকি। তখন মানসিক ক্লান্তি পুঁন্জি করে বিড়বিড়িয়ে বলছিলাম, “Villains are not born—they are made.” ― Renee Bernard, Lady Falls
—নাজাত