মাতৃত্বের এই পুরো জার্নিটা আমার জন্য কেবল রোমাঞ্চকর কোনো গল্প ছিল না, এটি ছিল এক চরম লড়াই, পরীক্ষা এবং উপলব্ধির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। তৃতীয় সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক মাঝপথে যখন আমি জানতে পারলাম আমি মা হতে চলেছি, তখন থেকেই শুরু হয়েছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পরীক্ষার এই সময় কনসিভ করার খবর পাওয়ার আনন্দের মাঝেই শুরু হয় শারীরিক অসুস্থতা। চতুর্থ পরীক্ষার দিন সকালে শোয়া থেকে ওঠার মতো অবস্থাও ছিল না, কিন্তু কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই সেই পরীক্ষা আমি দিয়েছিলাম।
চতুর্থ সেমিস্টারে উঠলে অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়। পঞ্চম তলায় উঠে ক্লাস করা, একদিন ক্লাস করে আরেকদিন ব্রেক নেওয়া, আবার কখনো টানা তিন দিন ক্লাস করা, মিড, প্রেজেন্টেশন ও অ্যাসাইনমেন্ট সামলানো—সব মিলিয়ে সময়গুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন। এর মধ্যে যখন চতুর্থ সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হলো, তখন আমি গর্ভাবস্থার অষ্টম মাসে। কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসা-যাওয়া এবং বাসায় থেকে যাতায়াত করা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মিসক্যারেজের ভয়ে আমি হলে গিয়ে পনেরো দিন থেকে পরীক্ষা দিই। এই অসুস্থ শরীর আর গর্ভে সন্তানকে নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া যে কতটা দূরূহ ছিল, তা কেবল আমার শরীর আর মনই জানে। হলে থাকাকালীন আমার হিমোগ্লোবিন ড্রপ করে ৮.০৪-এ নেমে আসে। ডাক্তার দুই ব্যাগ রক্ত নেওয়ার পরামর্শ দিলেও নিতে ইচ্ছা না করায় আমি স্যালাইন ও ইনজেকশন নিয়ে কোনোমতে হিমোগ্লোবিন ১০.৪-এ উন্নীত করি।
আমার হাজবেন্ড শুরু থেকেই চেয়েছিল, সবার আগে সে তার সন্তানকে কোলে নিবে। তাই সে তার চাকরি থেকে ১০ দিন আগে থেকেই ছুটি নিয়েছিল। অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত ১৯ জুন। ভোরবেলা থেকেই শুরু হলো প্রসব বেদনা। ডাক্তার নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করলে রাতে বা ফজরের দিকে বাবু দুনিয়াতে আসবে বলে জানান। সারাদিন অপেক্ষা করেও যখন কোনো অগ্রগতি হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল এই ব্যথা সহ্য করা আর সম্ভব নয়। ঠিক সেই মুহূর্তে এল এক মর্মান্তিক খবর—আমার স্বামীর চাচা মারাত্মকভাবে ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছেন এবং তাঁর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে এবং সাথে বিজ্ঞ কেউ না থাকায় আমার স্বামী তাঁকে নিয়ে দ্রুত ঢাকা চলে যান। আমার মা-বাবা আমাকে অন্য হসপিটালে ট্রান্সফার করেন এবং ডাক্তার সি-সেকশনের সিদ্ধান্ত নেন।
ওটিতে নেওয়ার পর অ্যানেস্থেসিয়ার ডাক্তার প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে আসেন। সে সময় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম, অথচ পাশে আমার স্বামী ছিলেন না। বাইরে শুধু আমার মা আর ছোট বোনেরা ছিলেন, বাবা ছিলেন মসজিদে নামাজে। সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, রক্তের সম্পর্ক ছাড়া বাকি সবকিছু কতটা তুচ্ছ। রাত ৭:৩৯ মিনিটে আমার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখে। চাচার সংকটাপন্ন অবস্থার কারণে স্বামী তখনও বাবুকে দেখতে পারেননি, অবশেষে রাত ৩:২৯ মিনিটে ভিডিও কলে তিনি প্রথম সন্তানকে দেখেন। আল্লাহর কী পরিকল্পনা! সে চেয়েছিল তার সন্তানকে সবার আগে কোলে নিবে অথচ তাকে দেখতে হলো ভিডিও কলে।
সি-সেকশনের দ্বিতীয় দিন সকালে নার্স যখন বললেন উঠে দাঁড়াতে হবে, তখন মনে হয়েছিল এ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক কাজ। টেনেহিঁচড়ে তোলার সময় মনে হচ্ছিল পেটে বারবার ছুরি চালানো হচ্ছে। চাচি-শাশুড়ি ও বাবা ধরে আমাকে হাঁটিয়েছিলেন, সারা শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছিল। দ্বিতীয় দিন রাতে ইউরিন ক্যাথেটার খুলে দেওয়ার পর একা একা ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা ভেবে বুক কেঁপে উঠত। রাতে হাসপাতালে থাকার মতো কেউ না থাকায় মা এসে আমার পাশে থাকেন। শ্বশুরবাড়ির কেউ পাশে না থেকে কেবল দূরে বসে খোঁজ নিচ্ছিল, যা আমাকে ভীষণভাবে পীড়া দিয়েছিল।
তবে আমার কষ্ট লাঘব করতে আমার স্বামী চরম বিধ্বস্ত অবস্থায় ট্রেন ভ্রমণ করে ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে রাত ৩টায় ছুটে আসেন। বিছানা থেকে তোলার সময় যন্ত্রণায় রাগে আমি তাকে খামচাতাম, কামড় দিতাম—সে সবকিছু হাসিমুখে সহ্য করে পরম যত্নে আমাকে সেবা করেছে। চতুর্থ দিন বাড়ি ফেরার পথে গাড়ির জার্নির ব্যথায় যখন আর পেরে উঠছিলাম না, তখন বাসার কাছাকাছি এসে গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা পথ হেঁটে এবং বাকি পথ তিনি আমাকে কোলে করে বাসায় নিয়ে আসেন।
মাতৃত্বের এই কঠিন লড়াইয়ের পেছনে জড়িয়ে আছে আরও অনেক না বলা গল্প, যা এই জার্নিটাকে আরও বেশি অর্থবহ করে তুলেছে। আমার হাজবেন্ড শুধু আমার পাশেই থাকেননি, তিনি ছিলেন একাধারে একজন দায়িত্বশীল মানুষ ও সমাজকর্মী—যিনি সবসময় মানুষের বিপদে রক্ত দেওয়া বা নানা মানবিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। অথচ নিজের জীবনে যখন এমন একটা ঝড় বয়ে গেল, তখন তাঁর সমস্ত মনোযোগ ও প্রার্থনা ছিল একটাই—তাঁর স্ত্রী যেন সুস্থ থাকে এবং তাঁর সন্তান যেন সুন্দরভাবে এই পৃথিবীতে মুখ দেখতে পারে।
অন্যদিকে, আমার মা-বাবা দিন-রাত কেবল একটাই প্রার্থনা করতেন, আমি আর আমার সন্তান যেন সুস্থ শরীরে নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারি। আমাদের এই পুরো যাত্রাপথটা মূলত ছিল সেই মা-বাবার অকৃত্রিম দোয়া আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসারই এক অনন্য ফসল। এই ভয়ংকর ও কঠিন দিনগুলোতে আমার মা, বাবা আর আমার স্বামী—এই তিনজন মানুষ আমার পাশে না দাঁড়ালে আজ আমি এই পথ পার হতে পারতাম না। আমার স্বামীর হাতের জাদুকরী সেবা, মানবিক মন আর আমার মা-বাবার পরম ছায়া এবং তাদের সবার আকাশসমান ভালোবাসা ও দোয়ার কথা আমি কোনোদিনই ভুলব না।
নাইন মান্থস অব ম্যাজিক: একজন মায়ের মনের কথা

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।