পাহাড়ের পাদদেশের ছোট্ট গ্রাম ছনখোলার মানুষের কাছে ঘড়ির কাঁটার চেয়ে ট্রেনের হুইল বেশি বিশ্বস্ত ছিল। প্রতিদিন ঠিক দুপুর দুটো বেজে দশ মিনিটে পাহাড়ি পথ চিরে ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যেত ‘পাহাড়িকা এক্সপ্রেস’। গ্রামের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে খেতখেটে কৃষকরা ঘড়ি মেলাতেন ওই ট্রেনের শব্দ শুনে। এই গ্রামেরই এক কোণে বাস করতেন অপ্রতিষ্ঠিত ঘড়ি বিক্রেতা রহমান চাচা। তাঁর দোকানে সারি সারি টিকটিক করা ঘড়ি ঝুলত, কিন্তু তাঁর নিজের জীবনের কোনো ঘড়িই ঠিক সময়ে চলত না।
রহমান চাচার একমাত্র সম্বল ছিল তাঁর নাতি মিতুল। শহরের বড় ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখত মিতুল। কিন্তু অভাবের সংসারে প্রতিদিনের তিন বেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে দায়, সেখানে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। মিতুল মনমরা হয়ে বাবার পুরোনো একটা ঘড়ি ঠিক করার চেষ্টা করত, আর রহমান চাচা তাকে বলতেন, "সময়কে কখনো জোর করে ধরে রাখতে নেই বাবা, নিজের গতিতে চলতে দিতে হয়। সময় নিজেই পথ করে নেয়।"
একদিন সত্যি সত্যিই এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। দুপুর দুটো বেজে দশ মিনিটের সেই চিরচেনা ট্রেনটি হঠাৎ গ্রামের স্টেশনের একটু আগে এসে আচমকা থেমে গেল। ইঞ্জিনের গোলযোগ নয়, লাইনের ওপর ভারী পাহাড় ধসে পড়ে পথ রোধ করেছিল। ট্রেন আটকে যাওয়ায় শত শত যাত্রী নেমে এলেন স্টেশনে। তাদের মধ্যে ছিলেন শহরের এক নামী চিকিৎসা বিজ্ঞানী, যিনি ওই পথেই যাচ্ছিলেন। স্টেশনের চায়ের দোকানে মিতুলের আঁকা কিছু নিখুঁত অ্যানাটমি স্কেচ তার চোখে পড়ে। ছেলেটির তুলির টান আর বিজ্ঞানের প্রতি নিখুঁত অনুরাগ দেখে তিনি শুধু মুগ্ধই হলেন না, মিতুলের পড়াশোনার সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
কয়েক বছর পর মিতুল যখন স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে প্রথমবার সেই পাহাড়ি গ্রামে ফিরে এল, তখন তার চোখে জল। সে বুঝতে পারল, সেদিন পাহাড় ধসে ট্রেন আটকে যাওয়াটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল সময়ের এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, যা তার থমকে থাকা জীবনকে নতুন গতি দিয়েছিল। রহমান চাচা সেদিন মুচকি হেসে তাঁর পুরোনো ঘড়ির দোকান থেকে একটা ঘড়ি মিতুলের হাতে পরে দিলেন এবং ফিসফিস করে বললেন, "দেখেছিস, সময় ঠিক ঠিক সময়েই নিজের কাজ করে দেয়।"
সময়ের ইশারা

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।