মুখটা অমন শুয়োরের পোঁদের মত করে আছো কেন?” এটা ছিল আমার থেকে দু ক্লাস সিনিয়র, সৈনিক স্কুলের এক দাদার স্ট্যান্ডার্ড ডায়ালগ, আসলে ওর মুখটা এমন যে ওকে দেখলেই, আমাদের মুখটা ঐরকম হয়ে যেত আরকি। ঈষৎ মুখটা বাঁকা করে, একটা চোখ আধবোজা আমাদের সাথে কথা বলতো, আর তার সব আজব সব রিকোয়েস্ট যেগুলো আমাদেরকে ফলো করতে হতো।
সেই দাদার মুখটা ছিল অনেকটা ঠিক ললিতা পাওয়ার, হিন্দি সিনেমার লেডি ভিলেন উনার মতো। একটা চোখ আধবোজা, দেখলেই কেমন একটা মনের মধ্যে অশান্তি তৈরি হয়ে যায়, সেই রকম আর কি। আর তার নানা রকম বাহানা। সেগুলো পালন করতেই হতো জুনিয়র হিসেবে সৈনিক স্কুলের এটাই সিস্টেম ছিল।

সেই সময় স্কুলে জুনিয়রদের, সিনিয়রদের রুমে নানা রকম ডিউটি পড়তো। তার জন্য রীতিমতো ডিউটির রোস্টার ও বানানো থাকতো। কে কবে কোন কোন দাদার ঘর গিয়ে পরিষ্কার করবে, জুতো বেল্ট পালিশ করে দেবে। এগুলো তো ছিল নরমাল। তাছাড়াও অন্তর্বাস পরিষ্কার, মাঝে রাতে হাফ কিলোমিটার দূরে টিউবওয়েল থেকে জল আনা আরও নানা কিছু। গা হাথ পা টিপে দেওয়া তাও ছিলো।অনেকেই জামাকাপড় ঘষে ছিঁড়ে দিতো, তারপর মারও খেতো।

পুরুলিয়াতে বরাবরই জলের সংকট, আমাদের স্কুলে ওভারহেড ট্যাঙ্ক থাকলেও দিনে দুবার জল দেওয়া হত সকালে প্রাতঃকর্ম সারার জন্য আর সন্ধ্যায় স্নানের জন্য। খাবার জল কোনও ভাবে ধরে রাখতে হতো, কিন্তু জলে টান পড়লেই সিনিয়ররা আমাদের পাঠাতো ধোপা কোয়ার্টার বা দূরের টিউবওয়েল থেকে জল আনতে, ১২/১৩ বছর বয়সে মাঝরাতে এসব করা বেশ কষ্টকর ছিলো, ভূতের ভয়, ডাকাতের ভয় , সাপের ভয় (স্কুলে দু বার ডাকাত পড়েছিল)। রাগ প্রকাশ করতে অনেকই জলে থুতু দিয়ে দিতো, কেউ বা এক ছটাক হিসি করে দিতো। আমি কোনোদিন পারিনি, কারণ আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতাম, আমি যা করবো বেস্ট করবো, কারণ আমি করছি ওটা আমার কাজ, সে যার জন্যই হোক, কাউকে থুতু মেশানো জল দেবো ভাবতেও পারিনা, হিসি তো দুব অস্ত।

আমি আমার পরিজনদের এটাই বারবার অনুরোধ করি যখন যে কাজটা করবে গিভ ইওর বেস্ট, কারণ কাজটা তোমার আউটপুট, কার জন্য করছো সেটা বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়! কিন্তু বললে কি হয়, ‘কাকস্য পরিবেদনা’! কাজ সুন্দর করে সম্পন্ন করার যে অনুভুতি সেটা আমি খুব উপভোগ করি, তার জন্য একটা কুঁড়েমি কাজ করে, পুরোপুরি মোটিভেশন না আসা পর্যন্ত কাজ শুরু করতে পারি না, এটা লক্ষ্য করেছি যাদের হাতের কাজ ভালো তারা একটু “ঘেঁতো হয়”।