রোজনামচা-১৪: ২৮/০৯/২৬
সকালে উঠে আজ মনে হলো দিনটা অন্য রকম করে কাটাই, একদম আন-প্ল্যানড ওয়েতে, প্রাতঃকর্ম সেরে, চা না খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম জিন্স আর টি-শার্ট পরে। আগে থেকেই ভেবে নিলাম প্রথম যে বাসটা পাবো সেই বাসে উঠে বসবো, তারপর কোথায় নামবো, না আগে থেকে তাও ঠিক করিনি, যেখানে মনে হবে সেখানেই টুক করে নেমে পড়বো। যেমন ভাবা তেমন কাজ।
বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখি একটা ঝরঝরে ২১৯/১ যেন আমার জন্যই দাঁড়িয়ে আছে, মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু ভাবলাম আমার তো কোনো চাপ নেই, উঠে বসলাম একটা জানলার ধারে, পেছন দিক করে, সকালসকাল ভিড় একদম নেই, তায় কন্ডাক্টর বলেনি, “পিছনের দিকে এগিয়ে যান”, ড্রাইভারে সামনে থেকে ধূপের গন্ধ আসছে, প্রথম ট্রিপ সেই জন্য পুজো হয়েছে, একাধিক ঠাকুর সবার গলায় মালা, একটা “কাবার” ছবিও রয়েছে, মালিক বা ড্রাইভার কেউ হয়তো মোহামেডান হবে, আর কন্ডাক্টর সবে তার প্রথম বিড়িটা জ্বালিয়েছে, ড্রাইভার কন্ডাক্টর কারো রক্তই যথার্থ গরম হয়নি, তাই বাস চলছে ঢিমেতালে।
গাড়ি ধীরে ধীরে চলছে, রাস্তা ফাঁকা, মোটামুটি ৪৫ মিনিটে হাওড়া স্টেশন, নেমে পড়লাম, সাবওয়ে দিয়ে ঢুকছি ভাবলাম টিকিট কাটবো কী কাটবো না, ভাবলাম না থাক, দরকার হলে পুরনো আই-কার্ড তো আছেই আর না হলে ফাইন দিয়ে দেবো, আর মনে মনে ঠিক করলাম ছ’ নম্বরে যে ট্রেন থাকবে সেটাতেই উঠে বসবো, তার গন্তব্য যেখানেই হোক। ছ’নম্বর প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখি কাটোয়া লোকাল দাঁড়িয়ে আছে, আটটায় ছাড়বে, উঠে বসলাম মাঝামাঝি জায়গায়, জানালার ধারে বাঁ দিক করে, কারণ ডান দিকে এখন সূর্য, গায়ে রোদ লাগবে। ভাবছি কত অব্দি যাব, কোথায় নামবো, কাটোয়া, পূর্বস্থলী, নবদ্বীপ, কালনা? এই ভাবতে ভাবতে বাঁশবেড়িয়া মনে হলো ঠিক জায়গা, হংসেশ্বরী মন্দির দেখব, তারপর ইমামবাড়া, ব্যান্ডেল চার্চ দেখে বিকেল নাগাদ ফিরবো, নৈহাটি হয়ে।
ট্রেন ছাড়ার আগেই দু কাপ চা খেয়ে নিলাম, অতি নিম্নমানের পেপার কাপে চা, পেপারের গন্ধ একদম মুখটা খারাপ হয়ে গেলো, আজকাল হাওড়া স্টেশনের ভাঁড়ের চা পাওয়া যায় না, ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, আস্তে আস্তে ১৯৩৩ সালের তৈরি চাঁদমারী ব্রিজ/বাঙালবাবু ব্রিজ, পার হয়ে ট্রেন গতি বাড়াচ্ছে, বেশ খিদে খিদে পাচ্ছে, কিন্তু এত সকাল সকাল তেমন কিছু খাওয়ার মতো নেই।
ওয়েট করতে করতে শেষমেশ চন্দননগরে পেলাম ঝালমুড়ি, তারপরে একটা দারুণ ব্ল্যাক কফি খেয়ে, জানলার গরাদে মাথা রেখে, ফুরফুর করে হাওয়া খেতে খেতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, ঘুম ভাঙলো, তখন দেখি জিরাট, ধড়মড় করে উঠে জিরাটে নেমে পড়লাম, দেখা যাক কি করা যায়, শুনেছি এখানে অনেক নার্সারি আছে, খোঁজ চললো নার্সারির, পৌঁছে গেলাম পুষ্পরানি নার্সারিতে, অনেকদিনের মনে বাসনা ছিলো এডেনিয়াম কিনবো, এদের ক্যাটালগ আমার কাছে ছিলই আমার মোবাইলে, এদের নার্সারিতে নানারকমের ক্যাকটাস, সাকুলান্ট আর প্রচুর এডেনিয়াম, এরা ব্যাংকক থেকে সাপলিং নিয়ে আসে তারপর নিজেরা গ্রাফটিং করে।
অনেক ঘুরে ঘুরে নার্সারি দেখলাম, কিছু গাছও কিনলাম, এখানে স্টেশন এর পাশে প্রচুর নার্সারি, আজকাল সবাই কিছু না কিছু গাছ লাগায়, কিছুটা ভালোবেসে আবার অনেকটা স্ট্যাটাস সিম্বল হিসাবে। অতোগুলো গাছতো কিনলাম, এবার তাদেরকে সুস্থ ভাবে বাড়ি পৌঁছনো এক ঝক্কি! টোটো করে গুপ্তিপাড়া সেখান থেকে ঘাট পেরিয়ে শান্তিপুর, সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সেই বিকেল চারটে, আজকে আমার দিনটা কেমন গেল? বেশ ভালোই মনে হয়, কিছু অন্যরকম, একটা দিন তো অন্যরকম করে কাটানো গেল সংসারের সব টানাপোড়েন বাদ দিয়ে।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।