রাত তখন এগারটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। গোয়েন্দা অর্ণব সেনের ছোট্ট অফিসঘরে   হলুদ আলো যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পুরনো কেসের ফাইলগুলো টেবিলে ছড়ানো — প্রতিটি পাতায় কারো না কারো অমীমাংসিত জীবনের গল্প। ঠান্ডা চায়ের কাপ পাশেই পড়ে আছে, অনেকক্ষণ আগে থেকে। বাইরে রাতের শহর নিঃশব্দ, শুধু মাঝে মাঝে দূর থেকে রাতের ট্রেনের শব্দ ভেসে আসছে — যেন কেউ দূরে পালাচ্ছে।
অর্ণব ফাইলের পাতা উলটাচ্ছিলেন। বছর পচিশের অভিজ্ঞতায় তিনি শিখেছেন — রাতের নিঃশব্দতা বেশিক্ষণ থাকে না। কোথাও না কোথাও কেউ ঝামেলা পাকায়।
ফোনটা বাজল ঠিক তখনই। তিনি চোখ তুললেন না, শুধু রিসিভার তুললেন।
“স্যার, নিলয় মেরিটাইম ইনস্টিটিউটে একজন ছাত্র মারা গেছে। মাঠে বাস্কেটবলের লোহার ফ্রেম ধসে পড়েছে। ছেলেটা একা পুল-আপ করছিল।” ওপাশ থেকে কনস্টেবল রাহুলের গলা — অভিজ্ঞ পুলিশের গলায় সেই চেনা কাঁপুনি, যেটা তখনই আসে যখন ঘটনাটা শুধু ঘটনা মনে হয় না।
“পুলিশ কী বলছে?”
“দুর্ঘটনা।”
অর্ণব এবার চোখ তুললেন। “আর তুমি বলছ?”
একটু থামা। সেই থামার মধ্যে অনেক কথা। তারপর রাহুল বলল, “আমি বলছি... ছেলেটার রুমমেট আমার চেনা। সে জানিয়েছে, মৃত্যুর আগের রাতে আকাশ খুব উত্তেজিত ছিল। বলছিল সে কোনো একটা বড় ব্যাপার জেনেছে। প্রশাসনকে জানাবে বলেছিল।”
অর্ণব ঠান্ডা চায়ের কাপটা সরিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। “কাল ভোরে যাব। তুমি ঘটনাস্থল সিল করে রাখো — একটা ঘাস পর্যন্ত নড়বে না।”
ফোন রেখে তিনি জানালার কাছে গেলেন। রাতের শহরের দিকে তাকালেন — দুর্ঘটনা আর পরিকল্পনার মাঝে ফারাকটা কোথায়? মাঝে শুধু একটা আলগা বোল্টে।
পরদিন ভোর সাড়ে ছটায় অর্ণব যখন ক্যাম্পাসে পৌঁছালেন, শিশির তখনও মাঠের ঘাসে জমে আছে। কুয়াশার মধ্যে মাঠের কোণে পড়ে আছে বিশাল লোহার ফ্রেম — ধুলো আর মরচেয় ঢাকা, যেন বছরের পর বছর কেউ চোখ দেয়নি। মাটিতে ছড়িয়ে কংক্রিটের টুকরো, ভাঙা বোল্ট আর কিছুটা দূরে পুলিশের হলুদ টেপ — একটা অকালমৃত্যুর ঘেরাটোপ।
অর্ণব হাঁটু গেড়ে বসলেন। তাঁর মতো মানুষের কাছে ঘটনাস্থল একটা বই — প্রতিটি আঁচড়, প্রতিটি দাগ একটি বাক্য। তিনি পড়তে শুরু করলেন।
ফ্রেমের গোড়ার বোল্টগুলো পরীক্ষা করলেন একে একে। সবকটায় পুরু মরচে — বছরের অবহেলার সাক্ষী। কিন্তু মূল লোড-বেয়ারিং বোল্টটা আলাদা। তার থ্রেডে কোনো মরচে নেই। চকচকে, সদ্য ঘোরানো।
[● সূত্র ১]  মূল ভার-বহনকারী বোল্টটি সম্প্রতি ঘোরানো হয়েছে — থ্রেডের অবস্থা তা স্পষ্ট বলছে। সাধারণ ক্ষয়ে এমন হয় না। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এটি আলগা করেছে।
পাশে এসে দাঁড়ালেন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক — ক্যাম্পাসের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার রহিম সাহেব। মুখে উদ্বেগের ছাপ, হাত একটু অস্থির।
“আমি তিন বছর আগে নিজে এই ফ্রেম পরীক্ষা করেছিলাম, স্যার। সব কিছু মজবুত ছিল। লোড টেস্টও করেছিলাম। এমনটা হওয়ার কথা না।”
“তিন বছরে আর রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি?”
রহিম সাহেব একটু ইতস্তত করলেন। চোখ সরে গেল মাটির দিকে। “বরাদ্দ আসে। প্রতি বছর। কিন্তু কাজটা... আসলে হয়েছে কিনা, আমি নিশ্চিত না।” শেষ কথাটা গলায় আটকে গেল যেন।
অর্ণব উঠে দাঁড়ালেন। ফ্রেমের গোড়ার মাটিতে চোখ পড়ল — একটা সূক্ষ্ম লাল-বাদামি দাগ। ক্যাম্পাসের মাটি কালো দোআঁশ — এই লাল রং এখানকার নয়।
[● সূত্র ২]  ফ্রেমের গোড়ায় বাইরের মাটির দাগ। কেউ এখানে এসেছিল — রাতের অন্ধকারে, নিরিবিলিতে। সে এই মাঠের মানুষ নয়।
অর্ণব পকেট থেকে একটি ছোট ব্যাগে মাটির নমুনা সংগ্রহ করলেন। রহিম সাহেবের দিকে তাকালেন। “ক্যাম্পাসের পিছনের রাস্তা দিয়ে এই মাঠে আসা যায়?”
“হ্যাঁ। রাতে সেপথটা নির্জন থাকে। আলোও নেই।”
অর্ণব একটু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই — শুধু নিশ্চিত হওয়ার শান্তি।
হোস্টেলের ছোট ঘরে ঢুকতেই অর্ণব টের পেলেন — কেউ আগেই এসেছে। আকাশের টেবিলের ড্রয়ার সামান্য খোলা, বইগুলো অস্বাভাবিকভাবে সরানো। যে মানুষ ছিমছাম গুছিয়ে থাকত, তার
ঘর হুটহাট এভাবে এলোমেলো হয় না। রুমমেট সৌরভ কোণে চুপচাপ বসে — চোখ দুটো লাল, ঘুম নেই।
“সে কাল রাতে কী বলেছিল?” অর্ণব সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন। কোনো ভূমিকা নেই, কোনো সান্ত্বনা নেই — এখন সময় নেই সেসবের।
সৌরভ একটু সামলে নিল। “আকাশ স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সেফটি রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিল। গত দুই মাস ধরে ক্যাম্পাসের সব সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণের হিসাব জোগাড় করছিল — RTI করেছিল, পুরনো বিল ঘেঁটেছিল। বলছিল বড় অনিয়ম ধরেছে। মঙ্গলবার প্রশাসনকে জানাবে বলেছিল।”
“রিপোর্টটা কোথায়?”
সৌরভ ড্রয়ার দেখাল। “ওখানে রাখত। এখন নেই।”
অর্ণব টেবিলের পাশে ল্যাপটপ খুললেন — পাসওয়ার্ড চাইছে। কিন্তু টেবিলের কাচের নিচে একটা ছোট্ট কাগজের টুকরো। আকাশের হাতের লেখায় কিছু সংখ্যা। পাসওয়ার্ড নয় — ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর। তার পাশে লেখা: ‘মেরামত বরাদ্দ —?’
[● সূত্র ৩]  তিন বছরে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বরাদ্দ ১৮ লক্ষ টাকা। কাজের প্রমাণ শূন্য। আকাশ একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট নম্বর চিহ্নিত করেছিল — টাকা সেখানে গেছে।
“সে কি ক্লাউডে কোনো ব্যাকআপ রাখত?” অর্ণব জিজ্ঞেস করলেন।
সৌরভ মাথা নাড়ল। “সব কিছু গুগল ড্রাইভে রাখত। বলত, ‘কাগজ পুড়িয়ে দেওয়া যায়, ক্লাউড মোছা কঠিন।’”
অর্ণব মনে মনে বললেন — চালাক ছেলে।
হারুন মল্লিকের অফিস ক্যাম্পাসের পিছনের গেটের কাছে একটা ছোট শেডে — ভাঙাচোরা টেবিল, দেয়ালে পুরনো ক্যালেন্ডার, ছাদে জং ধরা টিন। অর্ণব যখন পৌঁছালেন, হারুন চা খাচ্ছিল —
ভাবলেশহীন মুখে, যেন কিছুই হয়নি।
“শুনলাম ছেলেটা মারা গেছে। দুঃখজনক।” সহানুভূতির সুর কণ্ঠে, কিন্তু চোখে অন্য কিছু।
অর্ণব বসলেন। “তিন বছরে ক্যাম্পাসের কোন কোন সরঞ্জাম মেরামত করেছেন?”
হারুন একটা মোটা খাতা বের করল। পাতা উলটে তালিকা দেখাল। অর্ণব মনোযোগ দিয়ে দেখলেন — বাস্কেটবল ফ্রেমের নাম সেখানে আছে, তারিখ আছে, রহিম সাহেবের স্বাক্ষরও আছে।
কিন্তু স্বাক্ষরটা একটু বেখাপ্পা। ডানদিকের হেলানিটাও মিলছে না। অর্ণব পকেট থেকে আরেকটা কাগজ বের করলেন — রহিম সাহেবের আসল স্বাক্ষর, ঘটনাস্থলে তিনি যে রিপোর্টে সই করেছিলেন।
“এটা কার হাতের লেখা, হারুন সাহেব?”
হারুনের চায়ের কাপ হাত থেকে পড়ে গেল। ভাঙা কাপের শব্দে ঘরে একটা নীরবতা নামল — যে নীরবতা স্বীকারোক্তির আগে আসে।
তারপর গল্পটা বেরিয়ে এল একটু একটু করে, যেভাবে পচা কাঠ ভাঙে। রক্ষণাবেক্ষণের কাজ কখনো হয়নি। ভুয়া বিল তৈরি হয়েছে, রহিম সাহেবের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে, টাকা গেছে হারুনের নিজের অ্যাকাউন্টে। তিন বছরে আঠারো লক্ষ। আর ক্যাম্পাসের সরঞ্জামগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার অপেক্ষায় ছিল।
আকাশ সেই হিসাব ধরে ফেলেছিল। হারুন জানত আকাশের প্রতিদিনের রুটিন — ভোর পাঁচটায় একাই ওই ফ্রেমে পুল-আপ। বাকিটা শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল।
[● সূত্র ৪]  হারুনের জুতায় লাল মাটির দাগ — ক্যাম্পাসের পিছনের রাস্তার মাটির রঙের সাথে হুবহু মিলে যায়, যেটি মাঠের পাশ দিয়ে গেছে। সেপথে রাতে ফ্রেমের কাছে পৌঁছানো যায় নিরিবিলিতে।
থানায় হারুনকে নিয়ে আসার পরে ওসি সাহেব অর্ণবকে জিজ্ঞেস করলেন, “শুধু মাটির দাগ আর আলগা বোল্টে মামলা দাঁড়াবে? উকিল ছেড়ে দেবে।”
অর্ণব একটু হাসলেন। “মামলা দাঁড়াবে আকাশের ল্যাপটপের ড্রাইভের ডেটাতে। সে সব কিছু ক্লাউডে ব্যাকআপ রেখেছিল — হিসাবের ছবি, RTI-এর জবাব, ব্যাংক স্টেটমেন্টের কপি। হারুন ঘরের ফাইল নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ক্লাউড মোছার কথা ভাবেনি। “
পরের সপ্তাহে তদন্ত কমিটি গঠন হলো। ক্যাম্পাসের প্রতিটি সরঞ্জাম পুনরায় পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হলো। ফলাফল যা বেরোল, তা শুধু একটি ফ্রেমের গল্প নয়। জিমের একাধিক যন্ত্রপাতি, ছাদের রেলিং, এমনকি বিজ্ঞান ভবনের বৈদ্যুতিক প্যানেলও বছরের পর বছর পরীক্ষা হয়নি। সব জায়গায় একই ছবি — বছরের পর বছর অবহেলা, কাগজে কাজ, বাস্তবে শূন্য।
আকাশের অসমাপ্ত রিপোর্ট শেষ করল তার বন্ধুরা — এবার প্রকাশ্যে, নাম দিয়ে, প্রমাণ দিয়ে। রিপোর্টটা পৌঁছে গেল মিডিয়ায়, তারপর শিক্ষামন্ত্রণালয়ে।
অর্ণব ফেরার আগে আরেকবার মাঠে দাঁড়ালেন। ভাঙা ফ্রেম সরানো হয়েছে, শুধু মাটিতে গর্তের দাগ রয়ে গেছে — যেন ক্ষত। বিকেলের আলোতে মাঠটা ফাঁকা, নিঃশব্দ।
রাহুল এসে পাশে দাঁড়াল। “স্যার, আকাশের বাবা-মা এসেছেন। দেখা করবেন?”
অর্ণব একটু চুপ করে রইলেন। এই মুহূর্তগুলো সবচেয়ে কঠিন — যখন সত্য বের করা হয়ে গেছে, কিন্তু যে হারিয়ে গেছে সে তো ফিরবে না। তিনি বললেন, “ঠিক আছে।”