চেন্নাইয়ের মাধবরামের সরু গলিতে সন্ধ্যার আলো নিভে আসছিল — ঠিক যেভাবে একটা মোমবাতি নেভে, আস্তে আস্তে, নিজের মধ্যে গুটিয়ে।
রাস্তার পাশে অটোরিকশার ভিড়, মাছের দোকান থেকে ভেসে আসা ঝাঁঝালো গন্ধ, কোথাও কোনো বাড়ি থেকে রান্নার সুবাস — এই সব মিলিয়ে মাধবরামের সন্ধ্যা প্রতিদিনের মতোই ছিল। কিন্তু সাব-ইন্সপেক্টর কার্তিক সুব্রামণিয়ামের চোখে সেদিন কিছু একটা আলাদা ছিল। বছর পনেরো পুলিশে কাজ করার পর মানুষ টের পায় — কিছু কিছু সন্ধ্যা শুধু সন্ধ্যা থাকে না। কিছু কিছু সন্ধ্যায় একটা গল্পের শুরু হয়।
তিনি তার পুরনো স্কুটারটা একটা দোসার দোকানের পাশে থামালেন। ইঞ্জিন বন্ধ করলেন। কিন্তু নামলেন না।
সামনের দোকানটার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
সাদা রঙের বোর্ডে লেখা — "নিউট্রি-পাওয়ার প্রোটিন সেন্টার"। বোর্ডে আঁকা একজন পেশিবহুল মানুষের ছবি, হাতে ডাম্বেল। জানালায় হরেক রকম প্রোটিন পাউডারের টিন সাজানো — বিদেশি ব্র্যান্ড, চকচকে মোড়ক, রঙিন লেবেল। দোকানটা দেখতে একেবারে স্বাভাবিক।
অথচ কার্তিকের চোখ দুটো কুচকে গেলো।
তিন দিন আগে একটা অদ্ভুত ফোন এসেছিল কন্ট্রোল রুমে। সন্ধ্যার পর, ঠিক এই সময়টায়। মহিলা কণ্ঠ, কাঁপা কাঁপা — যেন ফোন করতে করতেই মনে হচ্ছে ভুল করছেন, কিন্তু থামতেও পারছেন না। বলেছিলেন — "স্যার, আমার পাড়ায় একটা দোকানে অদ্ভুত কিছু বিক্রি হচ্ছে। বোতলে বোতলে... সাদা তরল। দাম শুনলে চমকে যাবেন।"
এটুকু বলেই ফোন কেটে গিয়েছিল। নম্বর ট্রেস করতে গিয়ে দেখা গেল — প্রিপেইড সিম, নিবন্ধন ভুয়া।
কার্তিক বিষয়টা জানিয়েছিলেন খাদ্য সুরক্ষা বিভাগের ডেপুটি কমিশনার মীনাক্ষি আয়ারকে। মীনাক্ষি শুনে মাত্র একটাই কথা বলেছিলেন — "কাল সন্ধ্যায় চলো।"
আর আজ সেই সন্ধ্যা।

মীনাক্ষি আয়ার বয়সে কার্তিকের চেয়ে বছর দশেকের বড়। ছোট্ট গড়ন, মাথায় সাদা-কালো চুলের মিশেল, পায়ে সরল চটি। দেখলে মনে হয় পাড়ার সাধারণ কোনো মাঝবয়সী মহিলা বাজার করতে বেরিয়েছেন। কিন্তু চোখ দুটো দেখলে সেই ধারণা মুহূর্তে ভেঙে যায় — সেই চোখে যেন এক্স-রে মেশিন বসানো। বছর পঁচিশের চাকরিজীবনে তিনি কত রকম প্রতারণা দেখেছেন — মিষ্টিতে ভেজাল, তেলে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল। কিন্তু মানুষের বিবেকে যে ভেজাল মেশে, সেটা দেখতে দেখতে তাঁর চোখ এখন আর সহজে ফাঁকি দেওয়া যায় না।
তিনি দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে একটা নোটবুক খুললেন। প্রতিটা অভিযানের আগে তিনি এভাবেই দাঁড়ান — একটু দূরত্ব রেখে, একটু ভেবে নেন।
"লাইসেন্স নম্বর মিলিয়ে নিয়েছ?"
"হ্যাঁ ম্যাডাম।" কার্তিক ফোনের স্ক্রিনে কিছু দেখলেন। "প্রোটিন পাউডার আর সাপ্লিমেন্টের লাইসেন্স আছে। নবায়ন করা, মেয়াদ ঠিকঠাক। কিন্তু..."
"কিন্তু কী?"
কার্তিক একটু ইতস্তত করলেন — ঠিক যেভাবে একজন মানুষ কোনো কথা বলার আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে চায় যে সে বোকার মতো কথা বলছে না। "দোকানে ফ্রিজ কেন? প্রোটিন পাউডার তো ঠান্ডায় রাখতে হয় না।"
মীনাক্ষির ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটল — সেই হাসি যেটা তখনই ফোটে, যখন কেউ ঠিক জায়গায় আঙুল দেয়।
"ঠিক জায়গায় নজর দিয়েছ।"
দোকানের মালিক রমেশ গোপাল — চল্লিশোর্ধ্ব, গোঁফওয়ালা, মাথার সামনের দিক থেকে টাক পড়া শুরু হয়েছে, পরনে সাদা শার্ট — ওদের দেখে প্রথমে বুঝতে পারলেন না। তারপর কার্তিকের উর্দি দেখে একটু অস্বস্তিতে পড়লেন। সেই অস্বস্তি লুকাতে মুখে একটা পেশাদার হাসি টেনে এগিয়ে এলেন।
"আসুন আসুন, কী দরকার আপনাদের? হোয়ে প্রোটিন নেবেন? ক্রিয়েটিন? আজকে নতুন শিপমেন্ট এসেছে..."
মীনাক্ষি ব্যাজটা বের করলেন। শান্তভাবে, তাড়াহুড়ো ছাড়া। "খাদ্য সুরক্ষা বিভাগ। রুটিন পরিদর্শন।"
রমেশের মুখের হাসিটা এক সেকেন্ডের জন্য কাঁপল — ঠিক যেভাবে বাতাসে একটা মোমের শিখা কাঁপে। তারপর সামলে নিলেন। কিন্তু মীনাক্ষির চোখ সেই এক সেকেন্ড দেখে ফেলেছিল।

দোকানের ভেতরটা ছোট — কিন্তু সাজানো গোছানো। একদিকে তাকে তাকে প্রোটিন পাউডারের টিন, হাইপ্রোটিন বার, মাল্টিভিটামিনের বোতল। দেওয়ালে পেশিবহুল মানুষদের ছবি। একটা ছোট কাঠের টেবিলে ক্যাশ বাক্স ।
আর সেই ফ্রিজ।
দোকানের পেছনের কোণে, একটা পর্দার আড়ালে — বড় সাদা রঙের ফ্রিজ। দরজায় তালা লাগানো। সাধারণ দোকানে যে ধরনের ফ্রিজ থাকে, এটা তার চেয়ে আলাদা — এটা মেডিক্যাল গ্রেডের ফ্রিজ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ছোট্ট ডিজিটাল ডিসপ্লে লাগানো।
কার্তিক ফ্রিজটা দেখলেন। তারপর রমেশকে দেখলেন। রমেশ সেই মুহূর্তে অন্য দিকে তাকিয়ে আছেন, মীনাক্ষির সঙ্গে কথা বলছেন — লাইসেন্সের কাগজ বের করছেন, বড় বড় কথা বলছেন। কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে বারবার ফ্রিজের দিকে তাকাচ্ছেন।
একজন মানুষ যেদিকে তাকাতে চায় না, সেদিকেই সত্য লুকিয়ে থাকে।
মীনাক্ষি হাঁটলেন সোজা ফ্রিজের দিকে।
"এটা খুলুন।"
"ওটা... ওটা আমার ব্যক্তিগত।" রমেশের গলায় একটু জড়তা এলো।
"ব্যক্তিগত জিনিস বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রাখার নিয়ম নেই।" মীনাক্ষির গলায় কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো হুমকি নেই। শুধু নিয়মের কথা। সেই শান্ত গলাই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় চাপ হয়ে ওঠে। "খুলুন।"
রমেশ আর কথা বলতে পারলেন না। পকেট থেকে চাবি বের করলেন। হাতটা সামান্য কাঁপছিল।
ফ্রিজের দরজা খুলতেই একটা ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা বেরিয়ে এলো — সেই মেডিক্যাল ফ্রিজের চেনা গন্ধ, জীবাণুমুক্ত, নিরুত্তাপ। আর ভেতরে সারি সারি সাজানো ছোট ছোট স্বচ্ছ বোতল। প্রতিটায় সাদা তরল। প্রতিটা বোতলে হাতে লেখা লেবেল — কোনো ব্র্যান্ড নেই, কোনো উপাদানের তালিকা নেই, মেয়াদের তারিখ নেই। শুধু একটা তারিখ — সংগ্রহের তারিখ।
কার্তিক একটা বোতল তুলে ধরলেন আলোর দিকে।
সাদা তরল। পঞ্চাশ মিলিলিটার।
"এটা কী?"
রমেশ চুপ। তাঁর চোখ মেঝের দিকে।
মীনাক্ষি বোতলটা নিলেন। ঘুরিয়ে দেখলেন। লেবেলে লেখা তারিখটা পড়লেন। তারপর অত্যন্ত শান্তভাবে বললেন — এমন শান্তভাবে যেটা শুনলে মনে হয় সবচেয়ে স্বাভাবিক কথা বলছেন —
"আপনি মাতৃদুগ্ধ বিক্রি করছেন।"
রমেশ গোপাল সেই মুহূর্তে যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়লেন। মানুষ যখন দীর্ঘদিন ধরে একটা রহস্য বহন করে, তখন ধরা পড়ার মুহূর্তটা একই সঙ্গে ভয়ের এবং মুক্তির হয়। রমেশের চোখে সেই মিশ্র অনুভূতি দেখা যাচ্ছিল।

"স্যার... ম্যাডাম... আমি সেবার জন্য করছিলাম। যেসব মায়েরা বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারেন না, তাদের জন্য..."
"পঞ্চাশ মিলিলিটারে পাঁচশো টাকা।" কার্তিকের গলায় উষ্ণতা নেই, রাগও নেই — শুধু ঠান্ডা তথ্য। "এটা সেবা?"
রমেশ মাথা নিচু করলেন।
মীনাক্ষি নোটবুক বের করলেন। "দাতাদের তালিকা আছে? যারা দুধ দিতে আসেন?"
রমেশ ভেতরের ঘর থেকে একটা পুরনো সাধারণ খাতা বের করলেন। মীনাক্ষি পাতা উল্টালেন। প্রায় পনেরো-ষোলোজন মহিলার নাম আর ফোন নম্বর। তাঁদের কেউ কেউ মাধবরামের বাইরের এলাকা থেকে আসছেন — তিন, চার, এমনকি দশ কিলোমিটার দূর থেকে।
"এই মহিলারা জানেন তাদের দুধ বিক্রি হচ্ছে?"
রমেশ চুপ করে রইলেন। সেই চুপ থাকা সবচেয়ে বড় উত্তর।
কার্তিকের মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। এতদূর থেকে মহিলারা আসছেন — কেউ কি তাদের ডাকছে? কেউ কি পথ দেখাচ্ছে?
"ম্যাডাম, একটু দেখুন — কোনো মহিলা কি নিজের ইচ্ছায় আসছেন, নাকি কেউ পাঠাচ্ছে?"
মীনাক্ষি খাতার দিকে আবার ঝুঁকলেন। ঠিকানাগুলো দেখলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন — "বেশিরভাগ একটাই এলাকার। কিন্তু কেউ একজন মধ্যবর্তী হিসেবে কাজ করছে।"
"কে সেই মানুষ?"
রমেশ এবারও চুপ। কিন্তু তাঁর চোখ একবার খাতার পেছনের পাতার দিকে গেল। মাত্র একটু। কিন্তু সেটুকু যথেষ্ট ছিল।
কার্তিক খাতার পেছনের পাতা খুললেন।
সেখানে আলাদা একটা কলামে লেখা — হিসাবের হিসাব। নাম নয়, শুধু আদ্যক্ষর — "ডি.এস."
পরদিন ভোরে মীনাক্ষি আর কার্তিক খাতায় থাকা একটি নম্বরে ফোন করলেন। নম্বরটা তালিকার শেষের দিকে — একটু আলাদা কালিতে লেখা, যেন পরে যোগ করা হয়েছে।
ফোন তুললেন একজন তরুণী।
কার্তিক পুলিশের পরিচয় না দিয়ে বললেন — "আপনি কি মাধবরামের ওই দোকানে যেতেন?"
ওপাশে নীরবতা। দীর্ঘ পাঁচ সেকেন্ড। তারপর একটা কণ্ঠস্বর যেন ভেতর থেকে উঠে এলো — ভাঙা, ক্লান্ত।
"হ্যাঁ। এটা একটা মিল্ক ব্যাঙ্ক। অসুস্থ শিশুদের জন্য। হাসপাতাল থেকে অনুরোধ করেছে। আমার বাচ্চার বয়স সাত মাস, বুকের দুধ বেশি হয়, তাই ভেবেছিলাম দিলে কারো উপকার হবে।"
কার্তিক ফোন রাখার পর মীনাক্ষির দিকে তাকালেন। কথা বলার দরকার নেই — দুজনে দুজনকে বুঝলেন।
মিল্ক ব্যাঙ্কের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংগ্রহ। তারপর খোলা বাজারে বিক্রি। মাঝখানে কেউ একজন মধ্যস্থতাকারী। আর শেষ মাথায়? সেটাই এখন খুঁজে বের করতে হবে।

রমেশের দোকানের হিসাবের খাতা ঘেঁটে কার্তিক একটা প্যাটার্ন খুঁজে পেলেন। প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্টক কমে যাচ্ছে। নগদ টাকার হিসাবে বেশিরভাগ লেনদেন, কিন্তু একটা নম্বরে বারবার ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার গেছে। পরিমাণ বড় নয়, কিন্তু নিয়মিত।
সেই নম্বরের অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের নাম — ডি. শঙ্কর।
ঠিকানা — আন্না নগর, চেন্নাই। একটি প্রাইভেট ক্লিনিক।
কার্তিক চোখ কুঁচকে বললেন — "ক্লিনিক কিনছে কেন? ছোট হলেও ক্লিনিকের তো নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা থাকে।"
"না, সবসময় থাকে না।" মীনাক্ষি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললেন। বাইরে সন্ধ্যা নামছে, শহর জ্বলে উঠছে লক্ষ আলোয়। "অনেক ছোট বেসরকারি ক্লিনিক অনুমোদিত মিল্ক ব্যাঙ্কের লাইসেন্স ছাড়াই চলে। সদ্যোজাত শিশু যখন মায়ের দুধ পাচ্ছে না — মা অসুস্থ, বা মারা গেছেন, বা দুধ আসছে না — তখন পরিবার যেকোনো উপায়ে সংগ্রহ করতে চায়। আর ডাক্তাররা কখনো কখনো সেই সুযোগ নেন।"
"মানে ক্লিনিক কম দামে কিনে বেশি দামে বিল করছে রোগীর পরিবারের কাছে।"
"এবং রোগীর পরিবার প্রশ্ন করে না। সন্তানের জীবন বাঁচাতে হবে — তখন কেউ দাম জিজ্ঞেস করে না।"
কার্তিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন — "এটা শুধু ব্যবসা নয়, ম্যাডাম। এটা আস্থার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।"
মীনাক্ষি তাঁর দিকে তাকালেন। "হ্যাঁ। এবং সবচেয়ে জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা সেটাই — যেটা সেবার মুখোশ পরে আসে।"
পরের দিন সকাল দশটায় মীনাক্ষি আর কার্তিক গেলেন আন্না নগরের সেই ক্লিনিকে।
ড. দিনেশ শঙ্কর — পঞ্চাশ বছর বয়স, ফর্সা রং, পাকা চুল, গলায় স্টেথোস্কোপ। দেওয়ালে ফ্রেম করা ডিগ্রির সার্টিফিকেট। চেম্বারে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, হালকা আলো, সবকিছু মসৃণ এবং পেশাদার। এই মানুষকে দেখে কেউ বলবে না যে এঁর সঙ্গে কোনো অনিয়ম হতে পারে।
সেটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
প্রতারকেরা সবসময় মলিন পোশাক পরে আসে না।
"হ্যাঁ, আমরা কিছু বোতল কিনেছিলাম।" ড. শঙ্কর বললেন সহজভাবে, যেন একেবারেই স্বাভাবিক কথা। "জরুরি প্রয়োজনে। সদ্যোজাত শিশুর জন্য। মায়ের সিজার হয়েছিল, দুধ আসতে দেরি হচ্ছিল।"
"অনুমোদিত মিল্ক ব্যাঙ্ক থেকে না কিনে রাস্তার দোকান থেকে কেন?" কার্তিক জিজ্ঞেস করলেন। গলায় কোনো আক্রমণ নেই — শুধু কৌতূহল, সরল প্রশ্ন।
ডাক্তার একটু থামলেন। মাত্র এক সেকেন্ড। কিন্তু সেই থামা যথেষ্ট।
"দ্রুত পাওয়া যাচ্ছিল। অনুমোদিত মিল্ক ব্যাঙ্কে অনেক কাগজপত্র লাগে, সময় লাগে..."
"আর দাম?" মীনাক্ষি জিজ্ঞেস করলেন। "রোগীর পরিবারের কাছ থেকে কত নিচ্ছিলেন?"
ডাক্তার চুপ করে গেলেন।
মীনাক্ষি কলম বের করলেন। নোটবুকে কিছু লিখলেন। তারপর মাথা না তুলে বললেন — "ল্যাবরেটরিতে নমুনা পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট আসতে দিন পনেরো। যদি দেখা যায় দুধের মান নিয়ন্ত্রণ ছিল না, ব্যাকটেরিয়া দূষণ আছে — এবং সেই দুধ অসুস্থ নবজাতককে দেওয়া হয়েছে — তাহলে এটা শুধু লাইসেন্স লঙ্ঘন নয়।" একটু থামলেন। "অবহেলায় শিশুস্বাস্থ্য বিপদে ফেলার অভিযোগ উঠতে পারে।"
ডাক্তারের মুখ ধীরে ধীরে সাদা হয়ে গেল।
পনেরো দিন পরে ল্যাবরেটরির রিপোর্ট এলো।
মীনাক্ষি রিপোর্টটা পড়লেন চুপচাপ। তারপর কার্তিকের দিকে ঠেলে দিলেন।
দুধের নমুনায় একাধিক ধরনের ব্যাকটেরিয়া দূষণ ধরা পড়েছে। সংগ্রহের পাত্র জীবাণুমুক্ত ছিল না। সংরক্ষণের তাপমাত্রা ঠিক ছিল না। যে বোতলগুলো পাওয়া গেছে, তার কোনোটাতেই স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়া মানা হয়নি।
একটি সুস্থ মানুষের শরীরের জন্যও এই দুধ ক্ষতিকর হতে পারত। আর যে নবজাতকের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি — তার জন্য এই দুধ কতটা বিপজ্জনক হতে পারত, সেটা ভাবতেই কার্তিকের বুকের ভেতরটা একটু ভারী হয়ে গেল।
রমেশের দোকান সিল হলো। ড. শঙ্করের ক্লিনিকের লাইসেন্স স্থগিত করা হলো। পুলিশের আলাদা দল আরও তদন্ত শুরু করল। মহিলাদের সাথে — সেই মধ্যস্থতাকারীকে খুঁজে বের করতে হবে।

আর যে মহিলারা মিল্ক ব্যাঙ্কের কথা শুনে এসেছিলেন — তারা জানলেন সত্যিটা। ফোনে জানানো হলো তাদের। নিজেদের মমতা, নিজেদের উদারতার রুপ দিয়ে — সেটাকেই পণ্য বানিয়ে বিক্রি করা হয়েছিল।

সন্ধ্যায় অফিস থেকে বেরিয়ে কার্তিক আর মীনাক্ষি হাঁটছিলেন পাশাপাশি। মাধবরামের সেই গলির পাশ দিয়ে।
দোকানটার দরজায় সরকারি সিল লাগানো। বোর্ডটা এখনো ঝুলছে — "নিউট্রি-পাওয়ার প্রোটিন সেন্টার"। পেশিবহুল মানুষের ছবি। হাসছে।
কার্তিক থামলেন একটু।
"ম্যাডাম, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
"করো।"
"আপনি প্রথমে কীভাবে নিশ্চিত হলেন? ফ্রিজ দেখে, নাকি অন্য কিছু?"
মীনাক্ষি একটু থামলেন। গলির ওপারে একটা বাচ্চা সাইকেল চালাচ্ছে, তার মা দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছেন। সেদিকে তাকিয়ে বললেন —
"ফ্রিজ দেখে সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু নিশ্চিত হলাম যখন রমেশ বলল — 'সেবার জন্য করছি।' সেটা বলল প্রথম মিনিটেই, কেউ জিজ্ঞেস করার আগেই।"
"মানে?"
মীনাক্ষি তাঁর দিকে তাকালেন। "যে মানুষ সত্যিকারের সেবা করে, সে সেটা বলে না — করে। 'সেবা' কথাটা বলে সে, যার সেবার মুখোশের পেছনে অন্য কিছু আছে। অপরাধীরা ধরা পড়লে সবসময় সবচেয়ে মহৎ কারণটা আগে বলে।"
কার্তিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন — "এই শহরে কত কিছু বিক্রি হয়, তাই না? প্রোটিন পাউডার, বিশ্বাস, আশা — এমনকি মায়ের মমতাও।"
মীনাক্ষি হাঁটতে শুরু করলেন আবার। পেছন ফিরলেন না। বললেন —
"আমাদের কাজ শুধু অপরাধী ধরা নয়, কার্তিক। কখনো কখনো কাজটা হলো — মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া যে বিবেক বিক্রি করবেন না। যদিও খরিদদার সবসময় থাকে।"