"সাহেব, ধুন্দুপন্ত যখন শিশু ছিলেন, তখন তাঁকে বলা হয়েছিল — তুমি পেশোয়ার পুত্র। সেই পরিচয় নিয়েই তিনি বড় হয়েছেন। ঘোড়া চালাতে শিখেছেন, তলোয়ার ধরতে শিখেছেন, পেশোয়ার যোগ্য হওয়ার জন্য সারাটা জীবন প্রস্তুত হয়েছেন। আর তারপর একদিন কোম্পানি বলল — না। তুমি পেশোয়ার পুত্র নও। তুমি কেউ নও।"
তিনি একটু থামলেন।
"একটা দত্তক সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট কী জানেন? সে যদি কখনো শোনে যে তার পরিবার তাকে আসলে স্বীকার করেনি — সেই মুহূর্তে সে পৃথিবীর সবচেয়ে একা মানুষ হয়ে যায়। নানা ধুন্দুপন্তের ক্ষেত্রে সেই কথাটা বলল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। সরকারি নথিতে, আইনি ভাষায়।"
ফোর্সাইথ থামলেন। ফোর্বস কলম নামিয়ে রাখলেন।
"তাই," শাস্ত্রী শেষ করলেন, "ধুন্দুপন্ত কোথায় আছেন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে, আগে বুঝতে হবে তিনি কেন যুদ্ধে নেমেছিলেন। আর সেটা বুঝতে হলে, আপনাকে ফিরে যেতে হবে সেই মুহূর্তে — যখন একটি তিন বছরের শিশুকে একটি নতুন জীবন দেওয়া হয়েছিল। এবং তারপর সেই জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।"
বিঠুরের সেই সকাল ১৮৩৮ সাল।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি।
গঙ্গার ধারে কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে। পাখির ডাক শুরু হয়েছে মাত্র। প্রাসাদের ভেতরে এখনও ঘুমের নীরবতা।
কিন্তু আস্তাবলে আলো জ্বলছে।
সেখানে দুটো ঘোড়া তৈরি হচ্ছে।
একটি সাদা। নাম হিমালয়া — পেশোয়ার দেওয়া। ছোট, তেজি, গলায় রুপোর ঘণ্টা।
একটি কালো। নাম বজ্র। লম্বা, শক্তিশালী, চোখে আগুন।
সাওয়ারি দুজন।
সাদা ঘোড়ায় একটি মেয়ে। বয়স সাত। ছোট্ট মুখে দৃঢ়তা। পরনে হালকা নীল পোশাক, কোমরে ছোট্ট তরবারি, মাথায় শিরস্ত্রাণ — সব কিছু তার আকারে বানানো।
কালো ঘোড়ায় একটি ছেলে। বয়স আঠারো। লম্বা, সুঠাম, চোখে একটা অদ্ভুত দীপ্তি। কোমরে তরবারি, মাথায় শিরস্ত্রাণে সকালের আলো ঝিলিক দিচ্ছে। পেশোয়ার দত্তকপুত্র।
দুজনে মুখোমুখি তাকাল।
"প্রস্তুত?"
দুজনেই হাসল। সেই হাসিতে ভয়ের লেশমাত্র নেই।
"সবসময়।"
দুটো ঘোড়া একসঙ্গে ছুটল।
বিঠুরের রাজপথ সরু। দু'ধারে পুরনো বাড়ি। ভোরের আলোয় জানালাগুলো খুলতে শুরু করেছে।
দেখা গেল দুটো ঘোড়া।
সাদা আর কালো।
ক্ষিপ্র, তেজি, ঝড়ের মতো গতি।
জানালা থেকে মানুষজন উঁকি দিল।
একজন বৃদ্ধা বললেন, "ওই দেখো — পেশোয়ার ছেলে।"
পাশে তাঁর নাতনি বলল, "আর ওই ছোট্ট মেয়েটা কে?"
"মোরোপন্তের মেয়ে। মনু। পেশোয়ার দরবারে থাকে। কী সাহস দেখো — এত ছোট বয়সে ঘোড়া চালাচ্ছে।"
পথচারীরা সরে গেল।
কেউ কেউ থামল।
দুটো ঘোড়া পাশাপাশি ছুটছে। যেন একই নিঃশ্বাসে চলছে।
যুবকের এক হাতে লাগাম, আরেক হাতে শূন্যে তুলেছেন — যেন অদৃশ্য তলোয়ার চালাচ্ছেন।
মেয়ের দুই হাতেই লাগাম, কিন্তু শরীর একদম সোজা। ঘোড়ার সঙ্গে একাত্ম।
নগরসীমান্তে এসে দুটো ঘোড়া থামল।
"মনু, চলো এবার ফিরি।" যুবক বললেন।
মেয়েটা একটু হাসল। চোখে দুষ্টুমি।
"চলনা ভাই, আর একটু ঘুরে আসি।"
"না, দেরি হয়ে যাবে।
সেএকটু মুখ ভার করল। তারপর আবার হাসল।
"ঠিক আছে।"
ফেরার পথে ঘোড়া ছুটল আরো জোরে।
প্রাসাদের দরজায় থামল যখন — সেখানে জড়ো হয়েছিল প্রাসাদের কর্মচারী, দাসী, দারোয়ান।
সবার মুখে একটাই শব্দ।
"অপূর্ব।"
ক্যালকাটার ঘরে-এই গল্প শুনলেন ফোর্বস।
শুনলেন রামদাস বৈরাগীর কাছে।
সেই বৃদ্ধ — যিনি এই যুবকের সঙ্গে তরাই পর্যন্ত গিয়েছিলেন — তিনি বলছিলেন।
"আমি নিজে দেখেছিলাম।" বৈরাগী বললেন। "১৮৩৮ সালে। আমার বয়স তখন কুড়ির কাছাকাছি। প্রাসাদের কাজ করতাম।"
"মনুই তখন কেমন ছিলেন?" ফোর্বস জিজ্ঞেস করলেন।
বৈরাগী একটু হাসলেন। স্মৃতির হাসি।
"অসাধারণ মেয়ে।" তিনি বললেন। "সাত বছর বয়সে যেভাবে ঘোড়া চালাত — বড় বড় ঘোড়সওয়ার লজ্জা পেত। কিন্তু শুধু ঘোড়া নয় — তলোয়ার চালাত, বন্দুক ছুড়ত। পেশোয়ার দরবারে সে ছিল সবার আদরের।"
"এবং ছেলেটা মানে যুবকটা?"
"তিনি ছিলেন তার বড় ভাইয়ের মতো।" বৈরাগী বললেন। "মনু তাঁকে ভাই বলেই ডাকত। এবং তিনিও তাকে ছোট বোনের মতো দেখতেন।"
ফোর্বস বললেন, "এই দুজনের মধ্যে কী মিল ছিল?"
বৈরাগী একটু চিন্তা করলেন।
"দুজনেরই পরিচয়ের লড়াই ছিল।" তিনি বললেন। "একজন দত্তকপুত্র — তাঁর পরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ। মনু ছিলেন একটি মেয়ে — সেই যুগে মেয়েদের এই ধরনের শিক্ষা অস্বাভাবিক ছিল। দুজনেই প্রমাণ করতে চেয়েছিল — আমি আছি। আমার পরিচয় আছে।"
শাস্ত্রীও এই গল্প জানতেন।
"মনু পেশোয়ার দরবারে কীভাবে এলেন?" ফোর্বস জিজ্ঞেস করলেন।
"তার বাবা মোরোপন্ত তাম্বে পেশোয়ার দরবারে কাজ করতেন।" শাস্ত্রী বললেন। "মনুর মা ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলেন। তাই মোরোপন্ত মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বিঠুরে থাকতেন।"
"এবং পেশোয়া তাকে স্নেহ করতেন।"
"অত্যন্ত।" শাস্ত্রী বললেন। "বৃদ্ধ বাজিরাও মনুবাইকে নিজের নাতনির মতো দেখতেন। তার পড়াশোনা, শরীরচর্চা — সব কিছুর ব্যবস্থা করেছিলেন।"
"তাহলে তারা দুজনেই একই পরিবেশে বড় হয়েছিলেন।"
"হ্যাঁ।" শাস্ত্রী বললেন। "এবং এটা কোনো কাকতাল নয় যে দুজনেই ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহ করেছিলেন। দুজনেরই একই শিক্ষা ছিল — পেশোয়ার দরবারের শিক্ষা। যে শিক্ষায় ছিল স্বাধীনতার গল্প, মারাঠা গর্বের গল্প, এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প।"
ফোর্বস বললেন, "এবং সেই শিক্ষাই তাদের পথ নির্ধারণ করেছিল।"
"হ্যাঁ।" শাস্ত্রী বললেন। "বিঠুরের সেই ঘোড়দৌড় থেকে শুরু হয়েছিল দুটো নিয়তি। একটি নিয়তি গেছে ঝাঁসির যুদ্ধের মাঠে। আরেকটি নিয়তি গেছে তরাইয়ের জঙ্গলে।"
"দুটো নিয়তি। একটি শেষ।"
"দুটোই শেষ।" শাস্ত্রী বললেন। "শুধু একটা শেষ হয়েছে তলোয়ার হাতে, আরেকটা জ্বরে। কিন্তু দুটো শেষেরই মূলে একটাই কারণ — ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যায়।"
ফোর্বস তাঁর ডায়েরিতে লিখলেন।
"বিঠুরের সেই সকালের কথা ভাবছি। একটি সাদা ঘোড়া, একটি কালো ঘোড়া। একটি সাত বছরের মেয়ে, একটি আঠারো বছরের ছেলে।"
"দুটো ঘোড়া যেন দুটো নিয়তির প্রতীক। সাদা ঘোড়া — যুদ্ধের মাঠে মরবে। কালো ঘোড়া — জঙ্গলে হারিয়ে যাবে।"
"কিন্তু সেই সকালে তারা জানত না। তারা শুধু ছুটছিল। পাশাপাশি। মুক্ত। বিঠুরের রাজপথে।"
"এবং সেই মুক্তির মুহূর্তটাই সত্যি। বাকি সব — বিদ্রোহ, যুদ্ধ, মৃত্যু — সব এই মুহূর্তের পরিণতি। যে পরিণতি তারা বেছে নেয়নি। যে পরিণতি তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।"
ফোর্বস কলম রাখলেন।
জানালার দিকে তাকালেন।
হুগলির জলে সন্ধ্যার আলো।
কোথাও যেন একটা ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
সেই শব্দে হঠাৎ মনে হলো — বিঠুরের সেই রাজপথে এখনও ছুটছে দুটো ঘোড়া।
একটি সাদা। একটি কালো।
পাশাপাশি।
চিরকালের জন্য।
শাস্ত্রী উঠে দাঁড়ালেন।
কক্ষের কোণে একটা পুরনো আলমারি ছিল। তার ভেতর থেকে তিনি একটা মোটা বাঁধানো খাতা বের করলেন। খাতার মলাট হলুদ হয়ে গেছে, কিনারা ভেঙে পড়ছে। কিন্তু ভেতরের লেখা স্পষ্ট — নাগরী হরফে, সংস্কৃত ও মারাঠি মিশিয়ে।
"এটা কী?" ফোর্বস জিজ্ঞেস করলেন।
"বিঠুরের দরবারের দলিল।" শাস্ত্রী বললেন। "১৮২৭ সালের দত্তকগ্রহণের আনুষ্ঠানিক নথি। আমি চল্লিশ বছর আগে এটা নিজে তৈরি করেছিলাম — কোম্পানির অনুবাদক হিসেবে।"
ফোর্সাইথ সামনে ঝুঁকলেন।
"এটা আপনার কাছে কীভাবে?"
"কারণ কোম্পানি এই দলিলটাকে কখনো গুরুত্ব দেয়নি।" শাস্ত্রী শান্তভাবে বললেন। "যা গুরুত্বহীন, তা ফাইলে থাকে না। আমার কাছেই পড়ে রইল।"
তিনি খাতাটা খুললেন। একটা নির্দিষ্ট পাতায় আঙুল রাখলেন।
"১৮২৭ সালের বারোই মাঘ। পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও বিধিমতো দত্তকগ্রহণের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন। ধুন্দুপন্তকে তাঁর কোলে নেওয়া হলো। মন্ত্র পড়া হলো। গঙ্গাজল ছিটানো হলো। সাক্ষী ছিলেন পুরোহিত, দরবারের প্রধান কর্মকর্তারা এবং—"
শাস্ত্রী একটু থামলেন।
"এবং কোম্পানির একজন প্রতিনিধি।"
ফোর্বস চোখ তুললেন।
"কোম্পানির প্রতিনিধি সেখানে ছিলেন?"
"ছিলেন।" শাস্ত্রী বললেন। "তখনকার কানপুরের রেসিডেন্ট অফিসার। তিনি এই অনুষ্ঠান দেখেছিলেন। স্বাক্ষর করেছিলেন।"
তিনি পাতাটা ফোর্বসের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন।
পাতার নিচে স্পষ্ট — একটি ইংরেজ স্বাক্ষর। তারিখ সহ।
"এই স্বাক্ষরের অর্থ কী?" ফোর্বস জিজ্ঞেস করলেন, যদিও তিনি বুঝতে পারছিলেন।
"এই স্বাক্ষরের অর্থ হলো," শাস্ত্রী ধীরে বললেন, "কোম্পানি সেই মুহূর্তে এই দত্তকগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছিল। এবং আপত্তি করেনি।"
ঘরে নীরবতা।
"তাহলে ১৮৫১ সালে যখন পেনশন বন্ধ করা হলো—" ফোর্বস বলতে শুরু করলেন।
"তখন কোম্পানি নিজের দেখা একটা অনুষ্ঠানকে অস্বীকার করল।" শাস্ত্রী বললেন। "এটা শুধু আইনি প্রশ্ন নয়। এটা বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্ন।"
ফোর্সাইথ অস্বস্তিতে নড়লেন।
শাস্ত্রী খাতা বন্ধ করলেন। তারপর বললেন, "এখন আসুন শিশুটির কথায়। ধুন্দুপন্ত। তিন বছরের শিশু।"
তিনি চেয়ারে বসলেন।
"সেই শিশু যখন বিঠুরে এলো, তখন সে কিছুই বুঝত না। সে জানত না পেশোয়া কী, সাম্রাজ্য কী, রাজনীতি কী। সে শুধু জানত — এই বৃদ্ধ মানুষটি তাকে কোলে নিয়েছেন। এই রাজপ্রাসাদে এখন সে থাকবে।"
"এবং ধীরে ধীরে সে বড় হলো।" (চলবে)
মন্তব্য (2)