সূর্য তখনও মাথার উপর। গরমে রাস্তার পিচ গলছে। তবু রামপ্রসাদ দাঁড়িয়ে আছেন শহরের মোড়ে — হাতে রঙিন বেলুনের থোকা, মুখে শান্ত হাসি।
একদিন এক ছেলে এসে জিজ্ঞেস করল, "কাকু, কালো বেলুন থাকলে দাও। কালো আমার প্রিয় রং।"
রামপ্রসাদ হাসলেন। "বাবা, বেলুনে কালো রং হয় না।"
"কেন?"
"কারণ বেলুন আকাশে ওড়ে। আর আকাশ কখনো অন্ধকার রাখতে নেই।"
ছেলেটা অবাক হয়ে তাকাল। নীল একটা বেলুন নিয়ে চলে গেল।

রামপ্রসাদের জীবনটা এমনিতে সহজ ছিল না। একসময় ছোট একটা মুদিখানা ছিল তাঁর। বন্যায় সব ভেসে গেছে তিন বছর আগে। ঘর গেছে, দোকান গেছে, সঞ্চয় গেছে। স্ত্রী সুমিত্রা সেই কষ্টের ধাক্কা সামলাতে না পেরে একদিন বললেন, "তুমি কি আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না?"
রামপ্রসাদ সেদিন চুপ করে ছিলেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
পরদিন ভোরে উঠে বাজার থেকে কিছু বেলুন কিনলেন। মাত্র পঞ্চাশ টাকার। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিক্রি শুরু করলেন। প্রথমদিন লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যাচ্ছিল। পাড়ার লোক দেখে হাসছিল। কেউ কেউ বলল, "রামপ্রসাদদা, এই কাজ করছ?"
তিনি মাথা তুলে বললেন, "হ্যাঁ। কাজ তো কাজই।"

দিন গেল। মাস গেল।
রামপ্রসাদ শুধু বেলুন বিক্রি করলেন না — শিশুদের মুখে হাসি ফোটালেন। কোনো বাচ্চার কাছে পয়সা না থাকলে বিনামূল্যে দিলেন। কোনো কাঁদতে থাকা শিশুর হাতে একটা হলুদ বেলুন তুলে দিয়ে বললেন, "কাঁদে না, দেখ এটা কত সুন্দর উড়ছে।"
ধীরে ধীরে তাঁর একটা পরিচয় তৈরি হলো। শহরের লোক বলতে লাগল — "বেলুনওয়ালা রামপ্রসাদ।" ছেলেমেয়েরা দূর থেকে দেখলেই দৌড়ে আসত।
একদিন স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের সাংবাদিক তরুণ ছেলে অর্জুন এসে মাইক্রোফোন ধরল। "আপনার এত কষ্টের পরেও মুখে হাসি কীভাবে থাকে?"
রামপ্রসাদ বেলুনের থোকাটা একটু উঁচু করে ধরলেন।
"দেখো বাবা — এই বেলুনগুলো আমি আটকে রাখি বলেই এগুলো আমার সাথে থাকে। কিন্তু ছেড়ে দিলেই উড়ে যায়। দুঃখটাও ঠিক এমনই। আঁকড়ে ধরলে ডোবায়, ছেড়ে দিলে উড়ে যায়।"
অর্জুন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

সেই সাক্ষাৎকার ছাপা হলো কাগজে। শহরের মানুষ পড়ল। অনেকে এলেন রামপ্রসাদের কাছে — শুধু বেলুন কিনতে নয়, একটু কথা বলতে।
সুমিত্রা একদিন সন্ধ্যায় স্বামীর হাত ধরে বললেন, "তুমি আমাকে ভুল প্রমাণ করেছ।"
রামপ্রসাদ হাসলেন। "না। তুমি আমাকে প্রশ্ন করেছিলে বলেই আমি উত্তর খুঁজেছিলাম।"
সেই রাতে তাঁদের ছোট ঘরে একটা রঙিন বেলুন ঝুলছিল জানালার কাছে। বাইরে থেকে বাতাস এসে সেটাকে দুলিয়ে যাচ্ছিল — যেন বলছে,
পড়ে গেলে উঠতে হয়। থেমে গেলে হাঁটতে হয়। আর হাসি হারিয়ে গেলে — একটা রঙিন বেলুন হাতে নিতে হয়।