ছেলেবেলা নিয়ে সবার মধ্যেই একটা নস্টালজিয়া কাজ করে। একটা অসম্ভব ভালো লাগা, অনিন্দ্য সুন্দর স্মৃতি, অকল্পনীয় আনন্দের ফল্গুধারা- যেন সমস্ত চেতনায় জেগে থাকে। যদি প্রশ্ন করো সময় যানে পিছিয়ে যাওয়া গেলে কোথায় যেতে চাও? প্রশ্নটা তো সহজ; আর উত্তরটাও জানা; আমার ছেলেবেলায়, সেখানে মনের গোপন ঘরে জমে অযুত অযুত স্মৃতি, মনের মনিকোঠায় একান্তে লুকিয়ে যেন প্রেমের প্রথম চিঠি।
সে এক এমন সময় যেখানে না থাকার আনন্দে ছিলাম মশগুল। ভাবনা নেই, জটিলতার অলি গলিতে ঘুরে মরার অলুক্ষুনে উৎকণ্ঠা নেই, বসের তাড়না নেই, সপ্তাহান্তের রিপোর্ট দেওয়ার তাগিদ নেই, EMI মেটানোর ঝক্কি নেই, প্যারেন্ট-টিচার মীট এর ন্যাকামি নেই, ইলিশের পেট টিপে তেলাপিয়া কেনার কৃপণতা নেই, …….ছিল অনেক কিছুই…. ততটা দামি ঠিক নয়, তবে এখনও তা ভীষণ মহার্ঘ… মায়ের বকুনিতে আদর জড়ানো অভয়, বাবার রাগী চোখে অনেকটা স্নেহ মেশানো প্রশ্রয়, বন্ধুত্বের অকৃত্রিম ভরসা, সারাদিন খেলে বেড়ানোর, ঘুরে বেড়ানোর, পাড়া বেড়ানোর অবাধ স্বাধীনতা।
যদি প্রশ্ন করো কিছুই কি ছিল না এমন কোনো জটিলতা যে কাঁটা এখনও বিঁধে কোন এক গোপন খাতায়? ছিল তো; আর কিছু নয় সকালে বিকালে কতশত অঙ্ক কষা! তেল মাখানো বাঁশে বানর উঠছে নামছে! চৌবাচ্চায় জল ভরছে, কমছে, আবার ভরছে! ট্রেন কখনো প্ল্যাটফর্ম পেরোয় কখনো কোনো গাছ, কখনো দুটো ট্রেন একই দিকে আবার কখনো বিপরীতে! এমনি অনেক জটিলতা, জটিলতা নয়?
আমার তো বেশ মনে পড়ে, শীতের সকাল, কুয়াশা দিয়েছে ঢেকে চারিদিক, মায়ের হাতের কাজ হয়নি সারা; চাদর মুড়ি দিয়ে উঠোনের কাছে আমার অঙ্ক কষা। স্কুলের পড়ার তাগিদ, সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কে আটকে গেছি-মা কে ডেকে ডেকে সারা, বাবার অফিসে যাবার তাড়া, ওদিকে একটু ব্যস্ততা- ছুঁড়ে দিই অঙ্কের বই-খাতা পুকুরের জলে - সে পুকুর ভীষণ শীতল, কখনো পড়েনি তাতে সূর্যের ছায়া- তার জল কনকনে- আমার মায়ের তখন নিদারুণ বিপন্নতা, ঝাঁপ দিল নিমেষে গলা জলে, তুলে আনে জটিল অঙ্কের বই নিখুঁত সন্তরণে। এরপরও বলবে জটিলতা নেই?
পেরিয়েছে অনেক অনেক বছর। অঙ্ক কষেছি, এখনো কষছি হাজার হাজার! বানরের স্মৃতি এখনো জেগে সমস্ত সত্ত্বায়, হিসেবের অঙ্ক প্রতিটি পদক্ষেপে।- দু'কদম এগোনো- ঠিক দু'কদম পেছনে মেপে! স্থবিরতা জেগে থাকে সমস্ত কাজে, কে কতটা এগিয়েছে কোন দিকে, চুল চেরা বিশ্লেষণ! সবাই সবার এগোনো টা নিক্তিতে মাপে। এটাই জীবন, জীবন তো প্রতিদিন সিঁড়ি ভাঙা, প্রতিদিনই সরলীকরণ!
মন্তব্য (17)