মনে আছে বাবা!!!!

যখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ, আমি যখন পড়তে পারিনা কিন্তু বিভিন্ন দেশ, মহাদেশের নাম লিখে ফেলতাম, তুমি আমাকে তোমার স্কুলে নিয়ে গিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের সামনে ক্লাসের বোর্ডে সব লিখতে বলতে।

মনে আছে বাবা!!!

আমি যখন স্কুলে ভর্তি হলাম, তুমি আমাকে তোমার সাইকেলের সামনে বসিয়ে নিয়ে যেতে, অন্য সব ভাই বোনেরা হেঁটে যেত, আমি হাটতে পছন্দ করতাম না তাই তুমি সাইকেলে নিয়ে যেতে।

মনে আছে বাবা!!!

স্কুলে টিফিন শুরু হলে তুমি আমাকে তোমার রুমে নিয়ে যেতে, আম্মা প্রতিদিন রুটি আর আলু ভাজি দিত,আমার ভাল লাগত না,তুমি আমার জন্য স্কুল এর সামনে রফিক ভাই এর দোকান থেকে বিস্কিট আর কলা কিনে নিয়ে আসতে।  

মনে আছে বাবা!!!!!

অষ্টম শ্রেনী  থেকে নবম শ্রেনীতে এ উঠার সময় আমার রোল ৭ হয়েছিল, এই ভয়ে আমি বাড়ি না এসে সোজা নানী বাড়ী চলে গিয়েছিলাম, এই কথা শুনে তুমি আসলে আমাকে নিতে ঠোঁটে সাহস জাগানিয়া হাসি আর মুখে অভয়ের সব কথামালা নিয়ে।

মনে আছে বাবা!!!  

রোকেয়া হলে থাকতে তুমি যখন পটিয়া পি টি আই থেকে মাগুরার উদ্দেশে রওনা দিতে প্রতিবার মাঝ পথে ঢাকায় নামতে তোমার এই পাগলী মেয়েটার  সাথে একটু দেখা করার জন্য।

মনে আছে বাবা!!!

আমি যখন স্কুলে চাকরী করতাম, আমার পেটে তখন আবীর, আমি দুই সপ্তাহ পর পর বাড়ী আসতাম, তুমি ফ্রীজ খুলে একটা পর একটা খাবার বের করতে থাকতে, সব খাবার তুমি একটু একটু করে আমার জন্য ফ্রীজে জমা করতে,

মনে আছে বাবা!!!!

পি টি আই ট্রেনিং এর সময় আমি যখন সকালে তাড়াতাড়ি রওনা দিতাম, তুমি বাদশাহ মামার দোকান থেকে পরোটা কিনে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে একটু খাওয়ানোর জন্য।

মনে আছে বাবা!!!!

২০০৫ সালে রোযার ঈদের সময় আমি বাংককে, তোমার আর দুই মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে, তুমি আমাকে ফোন করে বললে, “ মা এই প্রথম আমি আমার মেয়েদের ছাড়া ঈদ করছি”। তোমার অনেক কস্ট লাগছিল না বাবা আমাদের জন্য?

খুব ইচ্ছে করে বাবা,

এই বুড়ো বয়সে তোমার বুকে একটু মাথা রেখে ঘুমাতে,

দুপুরের কড়া রোদে ঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে তোমার কাছ থেকে আর একবার ইংরেজি গ্রামার গুলো শিখতে।

খুব ইচ্ছে করে সবাই মিলে তোমার ঘরে তোমার খাটটাতে বসে গল্প করতে।

খুব ইচ্ছা করে তোমাকে একবার জড়িয়ে ধরে বলি বাবা আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি।

জীবন নদীর ওপাড়ে হারিয়ে গেছ তুমি বাবা,  হয়ে  গেছ ওই দূর আকাশের তারা হয়ে, তারপরে ও আমি জানি আমার এই সব ইচ্ছার কথা তোমার কাছে পৌঁছাবেই।

কেন এরকম না বলে হারিয়ে গেলে বাবা, খুব অভিমান ছিল আমাদের উপর, তোমার এই মেয়ে যখন এই দূর পরবাসে বসে তোমার নিরবে চলে যাওয়ার খবর শুনল,বাংলাদেশ এ তখন হরতাল, তারপর যখন পউছাল ,তখন তুমি মাটির ঘরে চির নিদ্রায় শায়িত, বাবা কি  ভাবে মনকে বুঝাই যে আমি আমার প্রান প্রিয় বাবাকে শেষ বারের মত দেখতে পারিনি।

বাস্তবে হয়ত তোমাকে আর পাবনা বাবা জানি।

কিন্তু ঝি ঝি ডাকা কোন রাতে , রুপালী জোছনার আলোয় আমি আরেকবার কাঁদতে চাই বাবা,তোমাকে জড়িয়ে আমি আরেকবার কাঁদতে চাই।