এত কোলাহল, এত কৃত্রিমতা,
এত হিসেবি আর যান্ত্রিক হাসির ভিড়েও-
আমার নদী আমাকে ডাকে,
আমার বৃষ্টি আমাকে ডাকে,
আমার চেনা বিকেল আমাকে ডাকে।
আমি ছুঁয়ে দেখতে চাই মহাজাগতিক ধূলিকণা,
পাড়ি দিতে চাই আলোর চেয়ে দ্রুতগামী কোনো যান,
ল্যুভরের দেয়ালে দেয়ালে খুঁজতে চাই শিল্পের চরম রহস্য।
নিউ ইয়র্কের কোনো জ্যাজ ক্লাবে বসে
হারিয়ে যেতে চাই সুরের জটিল গোলকধাঁধায়।
তারপর-
সব চকমকে পথের শেষে,
শহুরে গলির মোড়ে এক চিলতে ছাউনির নিচে
একটি মাটির ভাঁড়ে সস্তা লিকার চায়ে চুমুক দিয়ে,
হৃদয়ের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে ফেলতে চাই।
আমি পড়তে চাই কাফকা, কামু আর মার্কেজের জাদুবাস্তবতা,
বুঝতে চাই পৃথিবীর তাবৎ জটিল দর্শন।
তারপর কোনো এক অলস শ্রাবণ সন্ধ্যায়
রবীন্দ্রনাথের একটা চেনা সুরের আশ্রয়ে
নিজের অস্তিত্বের সহজ মানে খুঁজে পেতে চাই।
আমি হেঁটে যেতে চাই টোকিওর নিয়ন আলোর নিচে,
আইফেল টাওয়ারের চূড়া থেকে দেখতে চাই আলোকসজ্জিত শহর,
কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার হিমশীতল নীরবতায়
খুঁজতে চাই নর্দার্ন লাইটসের অদ্ভুত মায়া।
সব ফেলে-
আমার চেনা শহরের কর্দমাক্ত চেনা গলিতে,
রিকশার হুড ফেলে দিয়ে,
হঠাৎ নামা প্রথম আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হতে চাই।
আমি আস্বাদন করতে চাই ফরাসি পেস্ট্রি,
ইতালীয় পাস্তা আর মেক্সিকান মসলার তীব্র ঝাঁজ।
দিনশেষে ঘরে ফিরে
শুকনো মরিচ পোড়া আর খাঁটি সরিষার তেলে
এক থালা গরম ধোঁয়া ওঠা আলুভর্তা-ভাতের অমৃত স্বাদে
পৃথিবীর সব রাজকীয় ভোজকে তুচ্ছ করতে চাই।
আমি দেখতে চাই রাজ্যস্থানের মরুভূমির বুকে ভারতের রঙিন উৎসবের ধুলো,
অনুভব করতে চাই মস্কোর তুষারঝড়ে রাশিয়ার সেই ধ্রুপদী আভিজাত্য,
আর আরবের তপ্ত বালুকা বেয়ে নেমে আসা প্রাচীন ইতিহাসের সুবাস।
সব দেশের বর্ণিল রূপ চোখে মেখে,
হৃদয়ে জমিয়ে বিশ্বপথিকের ক্লান্তি,
আমি দিনশেষে একমুঠো চেনা রোদ্দুরের লোভে
আমার চেনা বাংলার উঠোনে এসে থমকে দাঁড়াতে চাই।
আমি জড়াতে চাই দামি পশমি কোট,
ব্র্যান্ডেড জুতো আর সিল্কের রাজকীয় স্কার্ফ।
এক লহমায় সব কৃত্রিম আবরণ খুলে রেখে
খালি পায়ে ভেজা ঘাসের ওপর হেঁটে,
মাটির নরম স্পর্শে
আমার আদিম সত্তাকে জাগিয়ে তুলতে চাই।
আমি শুনতে চাই প্রাচীন মন্দিরের কাঁসরের ধাতব অনুরণন,
দেখতে চাই গথিক গির্জার মোমবাতির কাঁপা আলোয় নীরব মোনাজাত,
কিংবা পাহাড়ি প্যাগোডার শূন্যতায় বিলীন হওয়া ধ্যানমগ্ন স্তব্ধতা।
অতঃপর গোধূলি নামানো সন্ধ্যায়-
আমার চেনা গ্রামের সেই শ্যাওলাধরা ছোট্ট মসজিদের বারান্দায়,
আজানের সুর ধরে মাগরিবের নামাজে দাঁড়িয়ে
আমার অশান্ত আত্মার শেষ ঠিকানা খুঁজে নিতে চাই।
আমি দেখতে চাই পৃথিবীর সুউচ্চ স্কাইলাইন,
জানতে চাই আধুনিক সভ্যতার মহত্তম অর্জন।
সবই দেখতে চাই,
সবই জানতে চাই,
সবই অনুভব করতে চাই।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত-
আমি ফিরে আসতে চাই আমার বাংলায়।
কারণ পৃথিবী আমাকে দেয় গতির তীব্রতা,
বাংলা আমাকে দেয় থমকে দাঁড়ানোর স্নিগ্ধতা।
পৃথিবী আমাকে দেয় সাফল্যের মুকুট,
বাংলা আমাকে দেয় একমুঠো শান্তি।
আমি বিশ্বনাগরিক হতে পারি,
কিন্তু দিনশেষে আমি শুধুই এক ঘরমুখী বাঙালি।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।