জামায়াত-শিবির ও তৌহিদি জনতাদের কেন আমি ইয়াজিদের অনুসারী এবং ইসলাম ধর্মের ক্যান্সার বলি, তার আরেকটি কারণ হলো- কার জানাজায় কেমন মানুষ হলো, তার ভিত্তিতে তারা মুসলমানিত্ব বা ধার্মিকতা প্রমাণ করতে চায়।

​অথচ ইসলামের ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। যেমন- ইমাম আবু হানিফা (র.), যাঁর মাজহাবের অনুসারী বাংলাদেশের মুসলমানরা, কিন্তু তাঁকেই তৎকালীন খলিফা আল-মানসুর কারাগারে বন্দি করে বিষপ্রয়োগে হত্যা করেন। খলিফা মানসুরের ভয়ে এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় প্রথমে অতি গোপনে মাত্র ছয়জন মানুষ নিয়ে তাঁর প্রথম জানাজা সম্পন্ন করা হয়েছিল।

​ইমাম বুখারি (র.), যিনি বোখারি শরিফ হাদিস গ্রন্থের সংকলক- একপর্যায়ে তৎকালীন শাসক বুখারার গভর্নর খালিদ ইবনে আহমদ আল-যুহলী; ইমাম বোখারীকে বিতাড়িত করেন, তাই তিনি নিজ জন্মভূমি ত্যাগ করে সমরকন্দের কাছে 'খারতাঙ্ক' নামক একটি গ্রামে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। রাজনৈতিক চাপ ও বিবাদের কারণে তাঁর মৃত্যুর পর স্থানীয় অল্প কয়েকজন মানুষ ও নিকটাত্মীয় ছাড়া বড় কোনো জমায়েত হতে দেওয়া হয়নি।

​হজরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.), যাঁকে তৎকালীন শাসক মারওয়ান শহীদ করার পর তাঁর লাশ কিছুদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে তাঁর মা হজরত আসমা (রা.)-এর দাবির মুখে লাশ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয় এবং অত্যন্ত সীমিত পরিসরে অনুসারীদের ছাড়াই তাঁকে দাফন করা হয়।

পক্ষান্তরে,

ইমাম আবু হানিফা (র.)'র খুনি খলিফা আল-মানসুরের মৃত্যুর পর তৎকালীন মক্কা ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক স্তরে বহু মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর দাফন ও জানাজা সম্পন্ন হয়।

ইমাম বোখারীকে বিতাড়িত করা এবং জানাজায় ও দাফনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা সেই শাসক খালিদ ইবনে আহমদ আল-যুহলী এর মৃত্যুর পর জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল।

​হজরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.)-এর হত্যাকারী আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল।

​খলিফা মুতাওয়াক্কিল 'মুতাযিলা' সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত আকিদা দূর করে সুন্নি আলেমদের (বিশেষ করে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের অনুসারীদের) মুক্তি দেন এবং ঐতিহ্যবাহী সুন্নি ইসলাম পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এতে সাধারণ মানুষের চোখে তিনি একজন মহৎ ও ধার্মিক শাসক হিসেবে পরিচিতি পান। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত মদ্যপ, বিলাসী ও অনৈতিক আচরণে লিপ্ত ছিলেন বলে ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেছেন। রাজনীতিতে তিনি ছিলেন প্রচণ্ড নিষ্ঠুর। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কবর শরিফ ভেঙে সমান করে দেওয়া এবং সেখানে পানি প্রবাহিত করার মতো বিতর্কিত নির্দেশও তিনি দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত নিজের সন্তান ও তুর্কি প্রহরীদের ষড়যন্ত্রে তিনি রাজপ্রাসাদেই নিহত হন। কিন্তু খলিফা হওয়ার কারণে এবং সুন্নি ইসলামের পুনর্জাগরণকারী হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তি থাকায় সামাজিকভাবে বহু মানুষ তাঁর জানাজা ও দাফনে শরিক হয়েছিল।

​কারবালার ময়দানে ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে ঘেরাও ও শহীদ করার মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ। অথচ উমাইয়া আমলের কুফা ও বসরা অঞ্চলের এই প্রভাবশালী গভর্নর নিজেকে ইসলামের সুশৃঙ্খল রক্ষক হিসেবে দাবি করতেন। তিনি জুমার খুতবায় তাকওয়া, খোদাভীতি ও উম্মাহর ঐক্যের কথা বলতেন।

​এমনকি ইয়াজিদের জানাজায়ও মানুষের ঢল নেমেছিল, যিনি ইমাম হাসান ও হোসাইনের অন্যতম হত্যাকারী এবং ইমাম হোসেনের মস্তক (মাথা) মোবারক নিয়ে রাজপ্রাসাদে উল্লাস করেছিলেন। ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া নিজেকে প্রকৃত মুসলিম ও খলিফা হিসেবে জাহির করতে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তিনি নিয়মিত জুমার নামাজে খুতবা দিতেন ও ইমামতি করতেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মক্কায় হজযাত্রীদের কাফেলার নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতেন। ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তারকে তিনি জিহাদ হিসেবে তুলে ধরতেন এবং বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে কনস্টান্টিনোপল অভিযানের মতো যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রচার চালিয়ে নিজের ধর্মীয় ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করতেন। অথচ তিনি হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রিয় কন্যা, বেহেশতের নারীদের সর্দার ও খলিফা হযরত আলী (রাঃ)'র স্ত্রী বিবি ফাতেমার দুই সন্তান " ইমাম হোসেন ও ইমাম হাসান" এর পরিবারসহ নির্মমভাবে কারবালার প্রান্তরে হত্যা করেছিলেন।

​এছাড়া তিনি তৎকালীন বিশিষ্ট আলেমদের রাজদরবারে আমন্ত্রণ জানিয়ে পুরস্কৃত করতেন এবং খিলাফতের আইনি বৈধতা বজায় রাখতে আলেমদের কাছ থেকে ফতোয়া আদায়ের চেষ্টা চালাতেন। ধর্মীয় বিভিন্ন সামাজিক সেবা, সাধারণ মানুষকে দান-সদকা করা এবং বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথকে আল্লাহর আনুগত্যের সঙ্গে তুলনা করে নিজের ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো ছিল তাঁর নিজেকে ধার্মিক ও শরিয়তসম্মত শাসক হিসেবে প্রমাণের অন্যতম প্রধান উপায়।

​ঠিক একইভাবে, ইসলামের প্রথম চার খলিফার মধ্যে তিন খলিফাকে হত্যা করা হয়েছিল এবং তাঁদের জানাজায় সাধারণ মানুষকে ঠিকমতো অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। পৃথিবীতে থাকাকালীন জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া এই খলিফাদের অত্যন্ত গোপনে দাফন করতে হয়েছিল। যেমন- হজরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করেছিল, তাদের একটি বড় অংশও ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা, নিজেদের মনগড়া তাকওয়া এবং তথাকথিত 'ইসলামী ইনসাফ' প্রতিষ্ঠার স্লোগান দিয়েই সাধারণ মানুষকে উসকে দিয়েছিল। বিভিন্ন প্রদেশ (মিশর, কুফা ও বসরা) থেকে আসা বিদ্রোহী ও অসন্তুষ্ট এক দল লোক মদিনায় তাঁর বাসভবন ঘেরাও করে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। তাঁর ওপর চূড়ান্ত ও মারাত্মক আঘাত হানার ক্ষেত্রে সুদান ইবনে হুমরান আল-মুরাদী এবং আমর ইবনুল হমুক আল-খুজাই-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

হযরত আলী (রাঃ) এর হত্যাকারীরা নিজেদের কোরআন ও সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী বলে দাবি করত। তারা দাবি করত যে, তারা আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা এবং 'শিরক-কুফরি' ও ক্ষমতার মোহ থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্যই লড়াই করছে। ইবনে মুলজিম তরল তরবারি শাণিত করার সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিল যেন তিনি তার এই কাজের মাধ্যমে 'আল্লাহর সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টিকে' (তাদের দৃষ্টিতে হযরত আলীকে) হত্যা করে নেকি হাসিল করতে পারে।

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মাণ হয় যে, যুগে যুগে উগ্রবাদী ও ধর্মব্যবসায়ীরা কীভাবে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক ও ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইসলামের সূর্যালোক যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন থেকেই এক শ্রেণির উগ্র ও হঠকারী গোষ্ঠী ধর্মের সরলতাকে বিকৃত করতে শুরু করেছিল। খলিফা হজরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করেছিল, তারা মুখে 'ইসলামী ইনসাফ', সুশাসন ও অধিকার আদায়ের কথা বললেও মূলত তাদের অন্তরে ছিল গোত্রীয় কোন্দল এবং ক্ষমতার লোভ। তারা সাধারণ সহজ-সরল মানুষকে ধর্মের আবেগ ও উসকানি দিয়ে মদিনায় একত্রিত করেছিল এবং নিজেদের তথাকথিত ইনসাফের প্রবক্তা সাজিয়ে এমন এক নৈরাজ্য তৈরি করেছিল, যার পরিণতিতে ইসলামের মহান খলিফাকে পবিত্র কোরআন পাঠরত অবস্থায় শহীদ হতে হয়। অন্যদিকে, হজরত আলী (রা.)-এর বিরোধীরা যারা পরবর্তীতে খারিজি সম্প্রদায় নামে পরিচিত হয়, তারা নিজেদের সবচেয়ে বড় 'তৌহিদি জনতা' ও কোরআনের একনিষ্ঠ রক্ষক বলে দাবি করত। তাদের স্লোগান ছিল- হুকুম তো কেবল আল্লাহরই। তারা সমাজকে 'শিরক ও কুফরি' থেকে মুক্ত করার মিথ্যা পবিত্রতার ধোঁয়া তুলে খলিফার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল। ইবনে মুলজিম যখন বিষাক্ত তরবারি শাণিত করছিল, তখন সে পাপিষ্ঠ আল্লাহর দরবারে ইবাদতের ভঙ্গিতে দোয়া করেছিল যেন সে 'সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি'কে হত্যা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে, যা ছিল ধর্মের চরম বিকৃতি ও অন্ধত্বের চূড়ান্ত রূপ।

​ইতিহাসের সেই প্রাচীন খারিজি এবং উমাইয়াপন্থী উগ্রগোষ্ঠীর এই ডিএনএ আজ নিখুঁতভাবে ধারণ করছে বাংলাদেশের জামায়াত-শিবির এবং তথাকথিত উগ্রপন্থী ওয়াজ ব্যবসায়ীরা। এই উগ্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল এবং ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করতে হরহামেশাই 'তৌহিদী জনতা'র সাইনবোর্ড ব্যবহার করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে 'ইসলামী হুকুমত' বা 'ইনসাফ' প্রতিষ্ঠার স্লোগান তোলে। কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য থাকে ধর্মের মোড়কে সমাজকে বিভক্ত করা এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করা। এরাও জানাজার ভিড়, বাহ্যিক হুল্লোড় কিংবা ধর্মীয় লেবাসের ওপর ভিত্তি করে মানুষকে কাফের বা মুমিন সার্টিফিকেট দেয়, অথচ প্রকৃত হকপন্থী মনীষী, আলেম ও সত্যবাদীরা যুগে যুগে এদের হাতেই নিপীড়িত হয়েছেন আর কুখ্যাত স্বৈরশাসক বা ধর্ম ব্যবসায়ীরা এদের কাছে হিরো বনে গেছে। খারিজিদের মতো আজকের এই উগ্র গোষ্ঠীগুলোও নিজেদের বিরোধীদের 'নাস্তিক', 'মুরতাদ' বা 'ইসলামের শত্রু' আখ্যা দিয়ে সমাজে ঘৃণা ও হিংসা ছড়ায়, অথচ ইসলামের আসল শিক্ষা মানবতা, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচার তাদের কার্যকলাপে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত ধর্মের লেবাসধারী এই উগ্রবাদী মোল্লারা ধর্মের কোনো সেবা করেনি, বরং ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ও দুনিয়াবি স্বার্থ উদ্ধার করেছে। তাই বর্তমান যুগের জামায়াত-শিবির ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো প্রকৃত ইসলাম নয়, বরং ইতিহাসের সেই অভিশপ্ত খারিজি ও ইয়াজিদপন্থী রাজনীতিরই আধুনিক ও ভয়ংকর সংস্করণ।

ইসলামের ইতিহাসের এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, জামায়াত-শিবির ও ধর্মব্যবসায়ী ওয়াজকারী উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো মূলত কাদের অনুসারী। প্রমাণিত হওয়ার অন্যতম ​কারণ- জামায়াত-শিবির, ওয়াজি ধর্মব্যবসায়ী এবং তৌহিদি জনতারা আজও মনে করে ধর্মের নামে বাহ্যিক প্রদর্শনী এবং জানাজায় ভিড় ও মানুষের ঢল নামলেই বুঝি কেউ খাঁটি মুসলমান ও ধার্মিক হয়ে যায়! তাই ​জামায়াত-শিবির ও তৌহিদি জনতার কাছে আজ আমাদের স্পষ্ট প্রশ্ন করা দরকার-

১. ​আমরা যে ইমামের মাজহাবের অনুসারী, সেই ইমাম আবূ হানীফা (র.)-কে কারা হত্যা করেছিল? এবং যে হাদিসগ্রন্থ বুখারি শরিফকে আমরা আমাদের প্রধান হাদিসগ্রন্থ বলে মনে করি, সেই বুখারি শরিফের সংকলক ইমাম বুখারিকে কেন বিতাড়িত করা হয়েছিল?

২. ​কেনই বা তাঁদের জানাজা গোপনে হয়েছিল এবং দাফনের সময় সাধারণ মানুষকে আসতে দেওয়া হয়নি? অথচ তাঁদের হত্যাকারীদের জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল- কেন?

৩. ​মূলত ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম বুখারি কি খাঁটি মুসলমান ও ধার্মিক ছিলেন, নাকি তাঁদের হত্যাকারীরা- যাদের জানাজায় লোকে লোকারণ্য ছিল- তারা খাঁটি মুসলমান ও ধার্মিক ছিলেন?

৪. ​পবিত্র কোরআনের সংকলক হজরত উসমান (রা.) এবং হজরত আলী (রা.) খাঁটি মুসলমান ও ধার্মিক ছিলেন, নাকি "ইসলামী ইনসাফ" প্রতিষ্ঠার নামে যারা তাঁদের হত্যা করেছিল, তারা খাঁটি মুসলমান ও ধার্মিক ছিল?