মাগুরার বিনোদপুরে তখন শরৎ শেষ হয়ে শীত নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিকেলের আকাশে হালকা মেঘ, রাস্তার দুপাশে শুকনো পাতার আনাগোনা, আর দূরে কোথাও শোনা যাচ্ছে আজানের ধ্বনি। এমনই এক বিকেলে অর্ণব প্রথম বুঝেছিল, একজন মানুষ জীবনে এলে পৃথিবীর চেনা দৃশ্যগুলোও কীভাবে অচেনা সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।

মেয়েটির নাম প্রিয়ন্তী।

প্রিয়ন্তীর সঙ্গে অর্ণবের পরিচয় খুব সাধারণভাবেই হয়েছিল। কোনো সিনেমার মতো বৃষ্টিতে ধাক্কা খাওয়া, কোনো নাটকীয় ঘটনা কিংবা প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাওয়ার গল্প ছিল না তাদের। ছিল কিছু সাধারণ কথা, মাঝেমধ্যে খোঁজ নেওয়া, ছোটখাটো অভিমান আর ধীরে ধীরে একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে ওঠা।
প্রথম দিকে প্রিয়ন্তির একটি ছোট্ট বার্তাই অর্ণবের মুখে হাসি ফুটিয়ে দিত।

— কী করো?

এই দুটি শব্দের মধ্যেই অর্ণব খুঁজে পেত এক অদ্ভুত আপন অনুভূতি। মনে হতো, ব্যস্ত পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষ আছে, যে দিনের শেষে তার কথা মনে করে। যে তার ভালো থাকার খবর জানতে চায়।
অর্ণব হয়তো তখনও জানত না, মানুষের জীবনে সবচেয়ে গভীর মায়াগুলো অনেক সময় খুব ছোট ছোট অভ্যাস থেকেই জন্ম নেয়।

প্রিয়ন্তির সঙ্গে কথা বলতে বলতে তার দিন কাটতে শুরু করল। সকালবেলার প্রথম ভাবনা থেকে রাতের শেষ প্রার্থনা পর্যন্ত কোথাও না কোথাও মেয়েটি জড়িয়ে থাকত। কোনো ভালো খবর পেলে সবার আগে তাকে জানাতে ইচ্ছে করত, মন খারাপ হলে তার কণ্ঠ শুনতে ইচ্ছে করত।
আর প্রিয়ন্তিও একসময় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল অর্ণবের যত্নে।
রাতে ঘুমানোর আগে অর্ণবের একটি প্রশ্ন থাকত—

— আজ তোমার মন ভালো তো?
প্রিয়ন্তি কখনো হাসির ইমোজি পাঠাত, কখনো বলত, “হ্যাঁ, ভালো আছি।” অর্ণব তবু বুঝতে চেষ্টা করত, সেই ভালো থাকার আড়ালে কোনো কষ্ট লুকিয়ে আছে কি না।

কারণ, ভালোবাসা বোধহয় এমনই। একজন মানুষ যখন অন্য কারও প্রতি সত্যিকারের মায়া অনুভব করে, তখন শুধু তার হাসিটুকু নয়, হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষণ্নতাটুকুও নিজের মনে জায়গা করে নেয়।
দিন গড়িয়ে মাস হলো। তাদের কথার মধ্যে ভবিষ্যৎ এসে জায়গা করে নিল। একসঙ্গে পথ চলার স্বপ্ন, পাশাপাশি বসে বিকেল দেখার ইচ্ছে, জীবনের কঠিন সময়গুলোতে একে অপরের হাত ধরে থাকার প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে অর্ণবের কাছে প্রিয়ন্তি আর শুধু একজন মানুষ ছিল না; সে হয়ে উঠেছিল তার ভবিষ্যতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অর্ণব বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, কিছু মানুষ জীবনে আসে থেকে যাওয়ার জন্যই।
কিন্তু মানুষ যা বিশ্বাস করতে ভালোবাসে, জীবন সব সময় তার সত্যতা প্রমাণ করে না।

পরিবর্তনটা প্রথমে খুব ছোট ছিল।
প্রিয়ন্তির উত্তর আসতে দেরি হতো। আগের মতো নিজে থেকে কথা শুরু করত না। অর্ণব কোনো কিছু জানতে চাইলে ছোট্ট উত্তর দিয়ে কথার ইতি টানত। যে মানুষটি একসময় তার সারাদিনের গল্প শুনতে চাইত, সে এখন কয়েকটি কথার পরই ব্যস্ততার অজুহাতে চলে যেত।
অর্ণব প্রথম দিকে নিজেকে বোঝাত, হয়তো প্রিয়ন্তির কাজ বেড়েছে। হয়তো কোনো সমস্যার মধ্যে আছে। হয়তো একটু সময় দরকার।
তাই সে অপেক্ষা করত।
একদিন, দুদিন, তারপর আরও অনেক দিন।
প্রিয়ন্তির ব্যস্ততার প্রতি তার কোনো অভিযোগ ছিল না। অভিযোগ ছিল শুধু এইটুকু—মেয়েটি কি একবারও বুঝতে পারছে না, তার এই নীরবতা অর্ণবকে কতটা অসহায় করে তুলছে?
এক সন্ধ্যায় অর্ণব লিখেছিল—
তুমি কি আগের মতো আর আমার সঙ্গে কথা বলতে চাও না?
বার্তাটি পাঠিয়ে সে দীর্ঘক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল। উত্তর আসতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগেছিল।

প্রিয়ন্তি লিখেছিল—
এত কিছু ভাবছ কেন? আমি একটু ব্যস্ত আছি।

অর্ণব আর কিছু লেখেনি।
সে বুঝেছিল, কিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে পাওয়া যায় না। কখনো কখনো মানুষের বদলে যাওয়া আচরণই সেই উত্তর দিয়ে দেয়, যেটা শুনতে তার সবচেয়ে বেশি ভয় হয়।
তবু সে হাল ছাড়েনি। ভালোবাসার মানুষ বদলে যাচ্ছে—এ কথা মেনে নেওয়া যতটা সহজ শোনায়, নিজের ভেতরে সেই পরিবর্তনের সত্যতা স্বীকার করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
অর্ণব ভেবেছিল, একটু বেশি যত্ন নিলে হয়তো সব আগের মতো হয়ে যাবে। একটু বেশি সময় দিলে, একটু বেশি বুঝলে, নিজের অভিমানগুলো চেপে রাখলে হয়তো প্রিয়ন্তি আবার আগের মতো ফিরে আসবে।
সে বুঝতে পারেনি, একটি সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখতে দুজনের ইচ্ছা লাগে। একজনের সমস্ত চেষ্টা দিয়ে দুজনের ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখা যায় না।

সেদিন আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা ছিল। বিকেলের দিকে বৃষ্টি নামল। বিনোদপুরের রাস্তায় জমে থাকা পানির ওপর ছোট ছোট ঢেউ উঠছিল। অর্ণব জানালার পাশে বসে ছিল, ফোনটা হাতে নিয়ে।
অনেক দিন ধরে জমে থাকা কথাগুলো সেদিন সে একসঙ্গে বলতে চেয়েছিল।

সে লিখল—
প্রিয়ন্তী, আমি কি তোমার কাছে খুব বেশি কিছু চেয়ে ফেলেছি? আমি তো শুধু চাইতাম, তুমি একটু সময় দেবে, নিজের থেকে আমার খোঁজ নেবে। তোমার মন খারাপ হলে আমাকে বলবে। আমি সব সমস্যার সমাধান করতে পারব না, কিন্তু তোমার পাশে থাকতে পারব। অথচ এখন মনে হয়, তোমার জীবনে আমার উপস্থিতিটাই তোমার কাছে বাড়তি হয়ে গেছে।

বার্তাটি পাঠানোর পর অর্ণবের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা শুরু হলো।
কিছুক্ষণ পর প্রিয়ন্তির উত্তর এল।
“অর্ণব, তুমি অনেক বেশি ভাবো। সবকিছু আগের মতো নেই। আমি আর এই সম্পর্কটা এগিয়ে নিতে চাই না। তুমি নিজের মতো ভালো থেকো।”
অর্ণব বার্তাটি বারবার পড়ল।
বিশেষ করে শেষের তিনটি শব্দ।
ভালো থেকো।

কী আশ্চর্য! যে মানুষটিকে ভালো রাখার জন্য সে এত দিন নিজের সমস্ত অনুভূতি উজাড় করে দিয়েছে, সেই মানুষটিই আজ তাকে ভালো থাকার নির্দেশ দিয়ে চলে যাচ্ছে।
অর্ণব উত্তর দিতে গিয়েও থেমে গেল। কী লিখবে সে? জিজ্ঞেস করবে, এত দিনের মায়া কি এত সহজেই শেষ হয়ে যায়? জানতে চাইবে, একসময় বলা প্রতিশ্রুতিগুলোর কোনো মূল্য ছিল না?
কিন্তু সে জানত, উত্তর চেয়ে হয়তো কিছু শব্দ পাওয়া যাবে, ভালোবাসা ফিরে পাওয়া যাবে না।
তাই সে শুধু লিখল—
ভালো থেকো, প্রিয়ন্তী।

সেদিন অর্ণব প্রথমবার বুঝেছিল, কিছু বিদায়ের কোনো শব্দ থাকে না। মানুষ কয়েকটি সাধারণ বাক্য বলে চলে যায়, আর তার চলে যাওয়ার অর্থ বুঝতে বুঝতে অন্য একজনের জীবনের অনেকগুলো বছর কেটে যায়।

প্রিয়ন্তী চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন অর্ণব ভেবেছিল, সে সামলে নিতে পারবে।
নিজেকে ব্যস্ত রাখবে, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাবে, কাজের মধ্যে ডুবে থাকবে। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু সে জানত না, কাউকে হারানোর কষ্ট শুধু মানুষটিকে আর দেখতে না পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আসল কষ্ট লুকিয়ে থাকে সেই অভ্যাসগুলোর মধ্যে, যেগুলো একসময় দুজনকে কাছাকাছি এনেছিল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নেওয়া—প্রিয়ন্তির কোনো বার্তা এসেছে কি না দেখতে।

কোনো সুন্দর দৃশ্য দেখলে মনে হওয়া—ইশ, প্রিয়ন্তি যদি পাশে থাকত!
মন খারাপ হলে কাউকে কিছু না বলে তার পুরোনো বার্তাগুলো পড়া।
রাতে ঘুমানোর আগে হঠাৎ মনে পড়া—একসময় এই সময়টাতে তাদের কথা হতো।
এখনও অর্ণবের দিন কাটে, রাত আসে, সকাল হয়। বাইরে থেকে তার জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে না। সে হাসে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে, নিজের কাজ করে।
কিন্তু তার ভেতরে একটা জায়গা নীরব হয়ে গেছে।
কেউ সেই নীরবতা দেখতে পায় না।

একদিন বিকেলে বিনোদপুরের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে একটি পরিচিত গান শুনতে পেল। গানটি শুনে হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, একদিন প্রিয়ন্তি বলেছিল, এই গানটা শুনলে তার অর্ণবের কথা মনে পড়ে।
অর্ণবের পা থেমে গেল।
কত দিন হয়ে গেছে! অথচ স্মৃতিটা যেন সেদিনেরই।

সে বুঝতে পারল, সময় চলে যাওয়া আর স্মৃতি মুছে যাওয়া এক জিনিস নয়। সময় মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে শেখায়, কিন্তু অতীতের প্রতিটি দরজা বন্ধ করে দিতে পারে না।
কিছু দরজা হঠাৎ খুলে যায়—কোনো গান শুনলে, কোনো বৃষ্টির বিকেলে, কিংবা পরিচিত কোনো নাম চোখে পড়লে।
আর তখন মানুষ বুঝতে পারে, সে যতটা ভুলে গেছে বলে ভেবেছিল, আসলে ততটা ভুলতে পারেনি।

অর্ণবের মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করত, প্রিয়ন্তিরও কি কখনো তার কথা মনে পড়ে?
হয়তো কোনো নির্জন রাতে পুরোনো কথোপকথন দেখতে গিয়ে সে থেমে যায়। হয়তো কোনো ব্যস্ত বিকেলে হঠাৎ মনে পড়ে, একজন মানুষ একসময় তার ছোটখাটো কষ্ট নিয়েও কতটা চিন্তা করত।
হয়তো কিছুই মনে পড়ে না।
অর্ণব জানে না।

সে শুধু জানে, যে মানুষটিকে একসময় নিজের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ ভেবেছিল, আজ তার মনের ভেতর কী চলছে, তা জানার কোনো অধিকার তার নেই।
এই উপলব্ধিটা তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত।
একসময় প্রিয়ন্তির ভালো-মন্দ জানা ছিল তার প্রতিদিনের অভ্যাস। আজ সে জানতেও পারে না, মেয়েটি কেমন আছে, কী নিয়ে ব্যস্ত, কোনো দিন মন খারাপ হলে কার সঙ্গে কথা বলে।
একসময় যে মানুষটির কাছে নিজের সব কথা বলা যেত, আজ তার জীবন সম্পর্কে সামান্য কিছু জানার জন্যও অর্ণবকে দূর থেকে অনুমান করতে হয়।

ভালোবাসার মানুষ অপরিচিত হয়ে গেলে বোধহয় এমনই লাগে।
চেনা মানুষটিকে চিনতে কোনো অসুবিধা হয় না, অথচ তার জীবনে নিজের জায়গাটুকু আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

এক রাতে অর্ণব পুরোনো বার্তাগুলো পড়ছিল।
সেখানে প্রিয়ন্তির হাসির কথা ছিল, মন খারাপের কথা ছিল, ছিল কিছু ছোট ছোট অভিমান। একসময় সে লিখেছিল, তুমি পাশে থাকলে আমার আর কিছু নিয়ে ভয় লাগে না।
অর্ণব বার্তাটির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর ফোনটা বন্ধ করে দিল।

কী অদ্ভুত! একদিন যে মানুষটি তার উপস্থিতিতে নিরাপত্তা খুঁজে পেত, আজ সেই মানুষটির অনুপস্থিতিতে অর্ণব নিজেই নিজের ভেতর আশ্রয় খুঁজে পায় না।
হঠাৎ তার মনে হলো, প্রিয়ন্তির চলে যাওয়াটা শুধু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি ছিল না। সেই সঙ্গে ভেঙে গিয়েছিল নিজের সম্পর্কে তার কিছু বিশ্বাসও।

সে ভাবত, কাউকে মন থেকে ভালোবাসলে অন্তত সেই ভালোবাসার মূল্য থাকবে। প্রতিশ্রুতি দিলে মানুষ তা মনে রাখবে। একে অপরের জীবনে জায়গা করে নেওয়ার পর হুট করে সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়া এত সহজ হবে না।
কিন্তু জীবন তাকে অন্য কিছু শিখিয়েছে।
সব ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকার ঠিকানা খুঁজে পায় না। সব প্রতিশ্রুতি সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে না। আর যে মানুষটিকে নিজের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে হয়, কখনো কখনো সেই মানুষটিই চলে গিয়ে সবচেয়ে বড় শূন্যতা তৈরি করে।

তবু অর্ণব প্রিয়ন্তিকে ঘৃণা করতে পারল না।
তার কষ্ট ছিল, অভিমান ছিল, কিছু উত্তরহীন প্রশ্ন ছিল। কিন্তু সেই মানুষটির প্রতি জন্ম নেওয়া মায়াটুকু সে ইচ্ছা করলেই মুছে ফেলতে পারল না।
তারপর প্রথমবার নিজের কাছে একটি কঠিন প্রশ্ন রাখল—
যে মানুষটি আমাকে ছাড়া ভালো থাকতে শিখে গেছে, তার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আমি আর কত দিন নিজের জীবনটাকে থামিয়ে রাখব?
প্রশ্নটির উত্তর সেদিনই সে খুঁজে পায়নি।
তবে সেই রাতেই সে বুঝেছিল, কাউকে ভালোবাসা আর নিজের সমস্ত জীবন তার অপেক্ষায় আটকে রাখা এক কথা নয়।

বিনোদপুরে শীত নেমে এসেছে।
সকালের বাতাসে কুয়াশার গন্ধ, বিকেলে রোদ দ্রুত ফুরিয়ে যায়। অর্ণব এখনো মাঝে মাঝে প্রিয়ন্তির কথা ভাবে। কোনো কোনো দিন পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসে, বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে।
কিন্তু আগের মতো প্রতিটি স্মৃতির কাছে সে আর নিজেকে হারিয়ে ফেলে না।
সে বুঝতে শিখেছে, কাউকে ভুলে যাওয়া মানেই তাকে ঘৃণা করা নয়। কখনো কখনো ভুলে যাওয়ার অর্থ হলো—সেই মানুষটিকে নিজের অতীতের জায়গায় রেখে বর্তমানকে বাঁচতে দেওয়া।

প্রিয়ন্তি তার জীবনের একটি সত্যি ছিল। তাদের ভালোবাসা, একসঙ্গে কাটানো সময়, বলা প্রতিশ্রুতি—সবকিছুই একসময় সত্যি ছিল। সম্পর্কটি শেষ হয়ে গেছে বলে সেই সময়টুকু মিথ্যে হয়ে যায় না।
কিন্তু অতীত সত্যি ছিল বলেই বর্তমানকে তার কাছে বন্ধক রাখতে হবে, এমন কোনো নিয়মও নেই।
অর্ণব ধীরে ধীরে নিজের কাছে ফিরে আসতে শুরু করল।
যে গান একসময় তাকে কাঁদাত, এখন সেটি শুনেও সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে পারে। যে বিকেলগুলোতে একা থাকতে ভয় লাগত, এখন সেই বিকেলেই সে হাঁটতে বের হয়। যে কথাগুলো একসময় প্রিয়ন্তিকে বলতে ইচ্ছে করত, সেগুলো এখন নিজের ডায়েরিতে লিখে রাখে।

তার কষ্ট পুরোপুরি চলে যায়নি।
শুধু কষ্টের সঙ্গে বসবাস করার পদ্ধতিটা বদলে গেছে।

একদিন ডায়েরির শেষ পাতায় সে লিখল—
প্রিয়ন্তী, তুমি আমার জীবনে এসে আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলে। চলে গিয়ে শিখিয়েছ, ভালোবাসার মানুষ চলে গেলেও জীবন থেমে থাকে না। তোমাকে হারিয়ে আমি অনেক কিছু হারিয়েছি, কিন্তু এই হারানোর ভেতর দিয়েই বুঝেছি, নিজেকে হারিয়ে ফেলে কাউকে ভালোবাসা যায় না।

তুমি ভালো থেকো। সত্যিই ভালো থেকো।
কিন্তু এবার তোমার ভালো থাকার সঙ্গে আমার ভালো থাকাটাকেও একটু জায়গা দিতে চাই।
লেখাটা শেষ করে অর্ণব ডায়েরি বন্ধ করল।
বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। আকাশের পশ্চিম কোণে শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
অর্ণব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, জীবনের কিছু গল্পের শেষটা একসঙ্গে থাকা দিয়ে হয় না। কিছু গল্পের শেষ হয় নিজের কাছে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে।

বছর ঘুরে গেল।
বিনোদপুরের সেই পথ, সেই বিকেল, সেই শীতের কুয়াশা—সবকিছু আগের মতোই রয়ে গেল। শুধু অর্ণবের ভেতরের মানুষটি বদলে গেছে।
এখনো কোনো কোনো দিন প্রিয়ন্তির কথা মনে পড়ে। এখনো কখনো মনে হয়, যদি আরেকবার দেখা হতো, যদি একবার জানতে পারত, মেয়েটি কেমন আছে!
কিন্তু সেই ইচ্ছের সঙ্গে এখন আর আগের মতো মরিয়া অপেক্ষা জড়িয়ে নেই।
সে জানে, প্রিয়ন্তি ফিরে আসুক বা না আসুক, তার জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ, যে মানুষটি চলে গেছে, তাকে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা তার নেই; কিন্তু নিজের জীবনে আবার আলো জ্বালানোর দায়িত্বটুকু তার নিজের।

তবু কিছু রাতে স্মৃতিরা ফিরে আসে।
পুরোনো কোনো কথার মতো, চেনা কোনো গানের সুরের মতো, কিংবা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া কোনো স্বপ্নের মতো।
তখন অর্ণব আর নিজেকে দোষ দেয় না। ভাবে না, কেন এখনো মনে পড়ে। সে শুধু মেনে নেয়—কিছু মানুষকে জীবনের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু হৃদয়ের ইতিহাস থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না।
প্রিয়ন্তি তার জীবনে নেই, কিন্তু তাকে ঘিরে যে অনুভূতিগুলো জন্মেছিল, সেগুলো অর্ণবকে বদলে দিয়েছে। তাকে আরও নীরব করেছে, আরও গভীর করেছে, শিখিয়েছে ভালোবাসার পাশাপাশি নিজের আত্মসম্মানকেও আগলে রাখতে।

অর্ণব আজও জানে না, প্রিয়ন্তি কখনো তার কথা ভাবে কি না।
জানার প্রয়োজনটাও আগের মতো তীব্র নয়।
শুধু মাঝে মাঝে বিনোদপুরের কোনো মেঘলা বিকেলে তার মনে হয়, পৃথিবীতে কিছু মানুষ আসে, যাদের সঙ্গে আমাদের পথ শেষ পর্যন্ত এক হয় না। অথচ তারা চলে যাওয়ার পরও আমাদের জীবনের অনেকটা জায়গা জুড়ে থেকে যায়।
কেউ তাদের নাম দেয় স্মৃতি, কেউ অভ্যাস, কেউবা অসমাপ্ত ভালোবাসা।
অর্ণব সেই অনুভূতির নাম দিয়েছে—মায়া।
কারণ, প্রিয়ন্তি চলে যাওয়ার পরও তার প্রতি অর্ণবের অনুভূতিগুলো একদিনে শেষ হয়ে যায়নি। শুধু সেই অনুভূতিগুলোর ওপর তার আর কোনো দাবি নেই।

এক সন্ধ্যায় ডায়েরির পুরোনো পাতাগুলো গুছিয়ে রাখতে গিয়ে অর্ণব আবার সেই বাক্যটি পড়ল, যেটি একসময় প্রিয়ন্তি লিখেছিল—
তুমি পাশে থাকলে আমার আর কিছু নিয়ে ভয় লাগে না।
অর্ণবের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। চোখের কোণে জমল একফোঁটা জল।
সে আস্তে করে ডায়েরিটি বন্ধ করল।

তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
তুমি হয়তো আমাকে ছেড়ে ভালো থাকতে শিখে গেছ, প্রিয়ন্তী। আর আমি শিখে গেছি, তোমাকে ছাড়াও বেঁচে থাকতে হয়। তবে তোমার চলে যাওয়া আমাকে একটা কথা বুঝিয়ে দিয়েছে—কাউকে ভালোবাসা খুব সুন্দর, কিন্তু সেই ভালোবাসার ভেতরে নিজেকেও বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।
তুমি আমার জীবনের অসমাপ্ত গল্প হয়েই থেকো। তোমাকে আর ফিরে পেতে চাইব না, কিন্তু একসময় তোমাকে সত্যি ভালোবেসেছিলাম—সেই সত্যিটুকুও অস্বীকার করব না।

সেদিন বিনোদপুরের আকাশে চাঁদ উঠেছিল।
অর্ণব অনেক দিন পর জানালার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস না ফেলে মৃদু করে হাসল।