কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে খুব নিঃশব্দে।
কোনো ঘোষণা থাকে না।
কোনো প্রতিশ্রুতিও থাকে না।
শুধু একদিন হঠাৎ তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়, দু-একটা কথা হয়, তারপর অজান্তেই তারা আমাদের প্রতিদিনের ভাবনার অংশ হয়ে যায়।
অরণ্যের জীবনেও এমন একজন এসেছিল।
তার নাম মেঘলা।
মুনসুর আলী মেডিকেলের সেই মায়াবী মেয়েটি।
তবে এই গল্পটা তাদের প্রথম দেখা হওয়ার নয়।
এটা সেই সময়ের গল্প, যখন তারা দুজনেই জানত—তাদের মধ্যে কিছু একটা আছে, কিন্তু কেউ জানত না সেই ‘কিছু একটা’ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
নাখালপাড়া, তেজগাঁওয়ের ব্যাচেলর বাসাটায় অরণ্যের দিনগুলো তখন বেশ একঘেয়ে।
সকাল হলে অফিস।
সারাদিন সাইট ভিজিট।
কখনো উত্তরা, কখনো মহাখালী, কখনো ঢাকার অন্য কোনো প্রান্ত।
আর কাজ শেষ হলে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে একটা ছোট্ট ঘর, কিছু নীরবতা আর ঘুম।
জীবনটা যেন খুব হিসেব করে চলছিল।
শুধু একটা জায়গায় কোনো হিসেব ছিল না।
মেঘলার জন্য।
রাতে ফোন হাতে নিয়ে অরণ্য যখন মেঘলার নম্বরটা খুঁজে বের করত, তখন তার মনে হতো—দিনের এত ব্যস্ততার মাঝেও এই মেয়েটার জন্য কীভাবে এতটা সময় জমে থাকে?
মেঘলাও কম ছিল না।
দিনের ব্যস্ততার মধ্যে কথা বলতে না পারলে রাতে অভিমান করত।
—তোমার কি আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না?
অরণ্য হাসত।
—ইচ্ছে করে।
—তাহলে ফোন করো না কেন?
অরণ্য একটু চুপ করে বলত,
—মামার সঙ্গে থাকি তো। রাতে কথা বলা কঠিন।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মেঘলা বলত,
—সবসময় তোমার একটা না একটা সমস্যা থাকে।
অরণ্য জানত, মেঘলার অভিমানটা আসলে রাগ নয়।
তার ভেতরে ছিল অন্য কিছু।
সে অরণ্যকে মিস করত।
অরণ্যও তাকে মিস করত।
শুধু দুজনের প্রকাশের ধরন ছিল আলাদা।
এক শনিবার বিকেলে তারা মহাখালীতে দেখা করেছিল।
শহরের ব্যস্ততার মধ্যেও সেদিন অরণ্যের মনে হয়েছিল, পৃথিবীটা যেন একটু ধীর হয়ে গেছে।
দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল।
কখনো কথা বলছিল।
কখনো কোনো কারণ ছাড়াই চুপ করে যাচ্ছিল।
মেঘলা হঠাৎ বলেছিল,
—তুমি জানো, তোমার একটা ব্যাপার আমার খুব ভালো লাগে?
অরণ্য তাকিয়ে বলেছিল,
—কী?
—তুমি নিজেকে খুব বড় কিছু ভাবো না।
অরণ্য হেসে বলেছিল,
—বড় হওয়ার মতো কিছু তো নেই আমার।
মেঘলা মাথা নেড়ে বলেছিল,
—আছে।
—কী?
মেঘলা উত্তর দেয়নি।
শুধু অরণ্যের দিকে তাকিয়ে হেসেছিল।
সেই হাসির অর্থ অরণ্য সেদিন পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
বছর কয়েক পরে বুঝেছিল।
মেঘলা মাঝে মাঝে অরণ্যের পুরোনো কাপড়, পুরোনো জুতো কিংবা সাধারণ জীবন নিয়ে মজা করত।
কিন্তু কখনো তাকে ছোট করত না।
বরং একদিন বলেছিল,
—তুমি জানো, তোমার কাছে টাকা কম হতে পারে, কিন্তু তোমার ভেতরটা খুব সুন্দর।
অরণ্য হেসে বলেছিল,
—এতদিনে বুঝলে?
মেঘলা বলেছিল,
—হুম। তাই তো ভয় হয়।
—কিসের ভয়?
মেঘলা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলেছিল,
—একদিন যদি তুমি বদলে যাও?
অরণ্য হেসেছিল।
—মানুষ বদলায়।
মেঘলা ধীরে বলেছিল,
—তুমি বদলাবে না।
অরণ্য তখন কোনো উত্তর দেয়নি।
কারণ সে জানত না, ভবিষ্যৎ মানুষকে কতভাবে বদলে দেয়।
সময় গড়িয়ে গেল।
তাদের দেখা হতে লাগল সপ্তাহে একদিন।
কখনো চিড়িয়াখানা।
কখনো বোটানিক্যাল গার্ডেন।
কখনো মহাখালীর ব্যস্ত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটের দেখা।
কখনো কোনো ছোট্ট রেস্টুরেন্টে বসে ফুচকা আর চটপটি খাওয়া।
একদিন বোটানিক্যাল গার্ডেনের একটা নিরিবিলি পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মেঘলা হঠাৎ অরণ্যের হাত ধরে ফেলেছিল।
অরণ্য অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
মেঘলা বলেছিল,
—কী দেখছ?
—কিছু না।
—মিথ্যা বলছ।
অরণ্য হেসে বলেছিল,
—তোমাকে দেখছি।
মেঘলা চোখ নামিয়ে ফেলেছিল।
সেই মুহূর্তে দুজনের মধ্যে কোনো কথা ছিল না।
তবুও অনেক কথা হয়ে গিয়েছিল।
কিছু সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর কথাগুলো আসলে মুখে বলা হয় না।
চোখে বলা হয়।
নীরবতায় বলা হয়।
একটু কাছে এসে দাঁড়ানোর মধ্যে বলা হয়।
একদিন মেঘলা অরণ্যকে বলেছিল,
—তুমি যদি কোনোদিন আমাকে হারিয়ে ফেলো, কী করবে?
অরণ্য হেসে বলেছিল,
—তোমাকে খুঁজব।
—যদি না পাও?
অরণ্য একটু ভেবে বলেছিল,
—অপেক্ষা করব।
মেঘলা বলেছিল,
—কতদিন?
অরণ্য তখন মজা করে বলেছিল,
—যতদিন তুমি ফিরে আসো।
মেঘলা মৃদু হেসেছিল।
তারপর বলেছিল,
—সবাই কিন্তু ফিরে আসে না।
অরণ্য কথাটা শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।
সেদিন সে জানত না, কয়েক বছর পর এই একটা বাক্যই তার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হয়ে দাঁড়াবে।
তারপর একদিন সবকিছু বদলে গেল।
একটা ভুল বোঝাবুঝি।
একটা ভাঙা ফোন।
হারিয়ে যাওয়া একটা নম্বর।
তারপর দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা।
রংপুর।
দিনাজপুর।
অচেনা শহর।
অচেনা হোটেল।
আর প্রতিটি রাতের শেষে মেঘলাকে মনে পড়া।
অরণ্য অপেক্ষা করেছিল।
মেঘলাও হয়তো অপেক্ষা করেছিল।
কিন্তু কেউ কারও কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
কেউ কাউকে বিদায়ও বলেনি।
তাদের সম্পর্কের শেষটা হয়েছিল কোনো শেষ কথার মাধ্যমে নয়—
নীরবতার মাধ্যমে।
অনেক বছর পর এক রাতে অরণ্য আবার মেঘলার কণ্ঠ শুনেছিল।
মাত্র একটি “হ্যালো”।
কিন্তু সেই একটি শব্দই যেন তার জীবনের বহু বছরকে আবার জাগিয়ে দিয়েছিল।
এরপর ইমোতে রাতভর কথা।
পুরোনো প্রশ্ন।
পুরোনো অভিমান।
পুরোনো ভালোবাসা।
আর নতুন বাস্তবতা।
মেঘলা তখন রাজশাহীতে।
অরণ্যের নিজের পরিবার আছে।
জীবন দুজনকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ভালোবাসা আছে—কিন্তু পথ নেই।
মেঘলা একসময় বলেছিল,
—তুমি আমাকে আবার তোমার জীবনে জায়গা দাও।
অরণ্য চুপ করে ছিল।
তার হৃদয় বলেছিল, হ্যাঁ।
তার বিবেক বলেছিল, না।
অবশেষে সে নিজের হৃদয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে বিবেকের কথাই শুনেছিল।
মেঘলা দূরে সরে গিয়েছিল।
আবার।
তারপরও অরণ্য মাঝে মাঝে জানালার পাশে দাঁড়াত।
রাতের ঢাকা শহর দেখত।
নাখালপাড়ার ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে আসত।
দূরে গাড়ির আলো।
কোনো কোনো জানালায় আলো জ্বলছে।
কোথাও হয়তো কেউ অপেক্ষা করছে।
কোথাও কেউ ফোনে কথা বলছে।
কোথাও কোনো মেয়ে হয়তো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তার প্রিয় মানুষটির কথা ভাবছে।
অরণ্য কখনো কখনো ভাবত—
মেঘলাও কি কোনো রাতে এমনভাবে জানালার পাশে দাঁড়ায়?
রাজশাহীর কোনো এক নীরব সন্ধ্যায়?
তার কি কখনো অরণ্যের কথা মনে পড়ে?
সে কি কখনো ভাবে—
অরণ্য এখন কোথায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অরণ্য জানত না।
হয়তো কোনোদিন জানবেও না।
এক সন্ধ্যায় অরণ্য পুরোনো একটা বাক্স খুলতে গিয়ে সেই ঘড়িটা পেল।
মেঘলা তাকে পাঠিয়েছিল।
অনেক বছর আগে।
ঘড়িটা তখনও ঠিকঠাক চলছিল।
অরণ্য কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হাতে পরল।
ঘড়ির কাঁটা চলছিল।
সময় এগিয়ে যাচ্ছিল।
অরণ্য হঠাৎ বুঝতে পারল—
সময় কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না।
মানুষ থেমে থাকে।
স্মৃতি থেমে থাকে।
অপেক্ষা থেমে থাকে।
কিন্তু সময় থামে না।
মেঘলা তার জীবন থেকে চলে গেছে।
কিন্তু তার রেখে যাওয়া কিছু মুহূর্ত অরণ্যের জীবনে এখনও হাঁটে।
একটা হাসি।
একটা অভিমান।
একটা চুম্বন।
একটা আলিঙ্গন।
কক্সবাজার থেকে আনা একটা থ্রি-পিস।
একটা ঘড়ি।
কিছু চকলেট।
আর অসংখ্য অসমাপ্ত কথা।
অরণ্য মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করে—
আমি কি মেঘলাকে হারিয়েছিলাম, নাকি সময় আমাদের দুজনকে হারিয়ে দিয়েছিল?
উত্তর আসে না।
তবু তার মনে হয়, ভালোবাসার সব গল্পের শেষটা একসঙ্গে থাকার মধ্যে হয় না।
কিছু গল্পের শেষ হয়—
একজন মানুষ অন্যজনের জীবনে না থেকেও তার স্মৃতিতে থেকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
মেঘলা অরণ্যের জীবনে নেই।
তার সঙ্গে নিয়মিত কথা হয় না।
তার হাত ধরে হাঁটা হয় না।
কোনো শনিবার বিকেলে মহাখালীতে দেখা করার অপেক্ষাও নেই।
তবুও কোনো কোনো সন্ধ্যায় অরণ্য যখন জানালার পাশে দাঁড়ায়, তখন তার মনে হয়—
জানালার ওপাশে হয়তো মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে।
দুজনের মাঝখানে শুধু একটা জানালা নয়—
একটা শহর।
একটা জীবন।
অনেক বছর।
আর অসংখ্য না-বলা কথা।
অরণ্য জানে, সেই দূরত্ব আর কখনো কমবে না।
তবুও সে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে।
কারণ কিছু অপেক্ষার কোনো গন্তব্য থাকে না।
তবুও মানুষ অপেক্ষা করে।
কিছু ভালোবাসার কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না।
তবুও মানুষ ভালোবাসে।
আর কিছু মানুষকে জীবনে ফিরে পাওয়া যায় না—
তবুও তারা সারাজীবন থেকে যায়।
জানালার ওপাশের মেয়েটির মতো।
অরণ্য ধীরে জানালাটা বন্ধ করে দিল।
ঘড়ির কাঁটা তখনও চলছে।
সময় এগিয়ে যাচ্ছে।
আর তার ভেতরে কোথাও একজন মেয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে—
সেই প্রথম দিনের মতোই,
চোখে মায়া নিয়ে,
চুপচাপ তাকিয়ে আছে অরণ্যের দিকে।
মেঘলা।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।