জীবনে আমি খুব বেশি কিছু চেয়েছিলাম কি?
আজকাল এই প্রশ্নটা নিজেকেই করি।
উত্তরটা কখনো আসে—না।
আবার কখনো মনে হয়, আমি হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে স্বার্থপর মানুষ ছিলাম।
কারণ আমি একজন মানুষকে শুধু ভালোবাসতে চাইনি, তাকে নিজের করে পেতে চেয়েছিলাম। এমনভাবে চেয়েছিলাম, যেন পৃথিবীর আর কারও অধিকার নেই তার ওপর।
মানুষটার নাম মেঘলা।
অদ্ভুত একটা মেয়ে।
ওকে প্রথম দেখার দিনটাও আজও আমার মনে আছে।
সেদিন বিকেলটা ছিল মেঘলা। নামের সঙ্গে মিল রেখে আকাশটাও যেন মেঘে ঢাকা ছিল।
আমি রাস্তার পাশের একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখ চলে গেল রাস্তার ওপারে।
একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
সাদা-নীল পোশাক।
হাতে একটা বই।
চুলগুলো বাতাসে বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছিল, আর সে বিরক্ত হয়ে এক হাতে চুল সরিয়ে আবার বইয়ের পাতায় চোখ রাখছিল।
আমি জানি না কেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল—
এই মেয়েটার জীবনে নিশ্চয়ই অনেক গল্প আছে।
তখনও জানতাম না, একদিন সেই গল্পের একটা বড় অংশ হয়ে যাব আমি।
আর আরও জানতাম না—
একদিন সেই গল্প থেকেই আমাকে মুছে ফেলতে চাইবে মেয়েটা।
মেঘলার সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয়েছিল খুব সাধারণভাবে।
—আপনার বইটা ভালো?
সে বই থেকে চোখ তুলে তাকিয়েছিল।
—জানি না।
আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম,
—বই পড়ছেন, অথচ জানেন না ভালো কি না?
সে হেসেছিল।
সেই হাসিটা ছিল খুব ছোট।
কিন্তু আমার জন্য যথেষ্ট ছিল।
সে বলেছিল,
—শেষ না করা পর্যন্ত কোনো গল্পকে ভালো বা খারাপ বলা যায় না।
আমি তখন মজা করে বলেছিলাম,
—মানুষের ক্ষেত্রেও কি তাই?
মেঘলা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারপর বলেছিল,
—মানুষের গল্প শেষ হওয়ার আগেই মানুষ মানুষকে বিচার করে ফেলে।
সেদিন কথাটা শুনে হেসেছিলাম।
আজ বুঝি, মেয়েটা সেদিনই আমাকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলে দিয়েছিল।
আমি শুনেছিলাম।
কিন্তু বুঝিনি।
এরপর থেকে আমাদের দেখা হতে লাগল।
কখনো চায়ের দোকানে।
কখনো রাস্তার পাশে।
কখনো ফোনে।
তারপর ফোনের কথাগুলো দীর্ঘ হতে হতে রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যেত।
মেঘলা খুব অদ্ভুতভাবে কথা বলত।
তার কথার মধ্যে কোনো বাড়তি সাজসজ্জা ছিল না।
তবু তার সঙ্গে কথা বললে মনে হতো,
পৃথিবীটা একটু শান্ত হয়ে গেছে।
এক রাতে সে বলেছিল,
—তুমি কখনো কাউকে খুব ভালোবেসেছ?
আমি বলেছিলাম,
—না।
—কেন?
—হয়তো ঠিক মানুষটা পাইনি।
সে হেসে বলেছিল,
—মানুষ পাওয়া যায় না। মানুষকে চিনতে হয়।
সেদিন আমি জানতাম না,
আমার সামনে বসে থাকা মেয়েটাই একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে চেনা অথচ সবচেয়ে অচেনা মানুষ হয়ে যাবে।
ভালোবাসি—কথাটা প্রথম আমিই বলেছিলাম।
মেঘলা তখন চুপ হয়ে গিয়েছিল।
অনেকক্ষণ কোনো কথা বলেনি।
আমি ভয় পেয়েছিলাম।
ভাবলাম, হয়তো সবকিছু এখানেই শেষ।
তারপর সে খুব আস্তে বলেছিল,
—তুমি কি নিশ্চিত?
আমি বলেছিলাম,
—তোমার ব্যাপারে আমি জীবনে প্রথমবার নিশ্চিত।
সে আবার চুপ।
তারপর বলেছিল,
—তাহলে আমাকে একটা কথা প্রতিশ্রুতি দাও।
—কী?
—আমাকে কখনো নিজের সম্পত্তি ভাববে না।
আমি হেসে বলেছিলাম,
—পাগল নাকি? ভালোবাসি তোমাকে, কিনে তো নিইনি।
মেঘলাও হেসেছিল।
কিন্তু আমি জানতাম না,
একদিন এই কথাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে।
মেঘলা ছিল এমন একজন মানুষ,
যাকে দেখলে ভালো লাগত।
শুধু আমার না।
প্রায় সবারই।
তার সঙ্গে কেউ কয়েক মিনিট কথা বললেই তার প্রতি একটা মায়া তৈরি হয়ে যেত।
আর এই ব্যাপারটাই আমাকে ধীরে ধীরে বদলে দিল।
আমি ভয় পেতে শুরু করলাম।
মেঘলা কোথায় যাচ্ছে?
কার সঙ্গে কথা বলছে?
কেউ তাকে এতক্ষণ ফোন করল কেন?
কেউ তার ছবিতে মন্তব্য করল কেন?
আমি প্রশ্ন করতাম।
প্রথমদিকে মেঘলা হেসে উত্তর দিত।
তারপর বিরক্ত হয়ে।
তারপর ক্লান্ত হয়ে।
একদিন সে বলেছিল,
—তুমি আমাকে ভালোবাসো, নাকি পাহারা দাও?
আমি রাগ করে বলেছিলাম,
—দুটো একই কথা।
সে মাথা নেড়ে বলেছিল,
—না। ভালোবাসা আর পাহারা দেওয়া এক জিনিস না।
আমি তখন বুঝিনি।
আমার কাছে ভালোবাসা মানেই ছিল—
যাকে ভালোবাসি, তাকে হারাতে দেব না।
আজ বুঝি,
কাউকে হারানোর ভয় থেকে তাকে আটকে রাখা যায়,
কিন্তু ধরে রাখা যায় না।
আমার পাগলামিগুলো প্রথমে মেঘলার কাছে ভালোই লাগত।
আমি বলতাম,
—তুমি কোথাও গেলে আমাকে জানাবে।
সে বলত,
—ঠিক আছে।
আমি বলতাম,
—রাতে দেরি করে একা ফিরবে না।
সে বলত,
—আচ্ছা।
আমি রাগ করে বলতাম,
—আমাকে নিয়ে মজা করো না।
সে হেসে বলত,
—তুমি এত সিরিয়াস কেন?
এই হাসিগুলোই আমাকে আরও সাহসী করেছিল।
আমি ভেবেছিলাম,
সে আমার সবকিছু মেনে নিচ্ছে মানে সে আমার মতোই অনুভব করে।
কিন্তু একটা মানুষ সবকিছু মেনে নিচ্ছে মানেই যে সে কষ্ট পাচ্ছে না—
এটা বুঝতে আমার অনেক দেরি হয়েছিল।
একদিন মেঘলা খুব অসুস্থ ছিল।
আমি অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলাম।
সে ফোন করেছিল।
আমি ধরিনি।
একটা মেসেজ এসেছিল—
সময় পেলে ফোন দিও।
আমি দেখেছিলাম।
কিন্তু উত্তর দিইনি।
কিছুক্ষণ পর আবার ফোন।
আমি বিরক্ত হয়ে ফোন ধরে বলেছিলাম,
—কী হয়েছে?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর সে বলেছিল,
—কিছু না।
আমি বলেছিলাম,
—তাহলে এতবার ফোন করছ কেন?
সে বলেছিল,
—থাক।
ফোন কেটে দিয়েছিল।
সেদিন রাতে আমি নিজে থেকে আর ফোন করিনি।
পরদিন সে স্বাভাবিক ছিল।
আমিও।
কিন্তু সেই দিনের একটা ছোট্ট কষ্ট
তার ভেতরে হয়তো থেকে গিয়েছিল।
আমি জানতাম না।
এভাবেই আমাদের সম্পর্কের ভেতরে
অদৃশ্য ফাটল তৈরি হতে লাগল।
ভালোবাসার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—
সবকিছু ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত
কেউ বুঝতে পারে না যে কিছু একটা ভাঙছে।
মেঘলা ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেল।
আগে আমি রাগ করলে সে দশবার ফোন করত।
এখন একবার ফোন করে অপেক্ষা করত।
আগে আমি কথা না বললে সে অভিমান করত।
এখন আমার নীরবতাকে সে নীরবতাতেই ফিরিয়ে দিত।
আগে আমার একটা কথায় তার মন ভালো হয়ে যেত।
এখন আমার দশটা কথাতেও তার মুখে হাসি আসত না।
আমি তখনও ভাবতাম—
মেঘলা বদলে গেছে।
আমি একবারও ভাবিনি—
হয়তো আমার আচরণই তাকে বদলে দিয়েছে।
এক রাতে আমি তাকে বললাম,
—তুমি আর আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না।
মেঘলা চুপ করে ছিল।
আমি আবার বললাম,
—কথা বলো।
সে খুব আস্তে বলেছিল,
—ভালোবাসি।
—তাহলে এমন করো কেন?
সে বলেছিল,
—কারণ ভালোবাসা সবসময় মানুষকে কাছে রাখে না।
আমি রেগে গিয়ে বলেছিলাম,
—তাহলে আমাকে ছেড়ে দাও।
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর সে বলেছিল,
—ঠিক আছে।
আমি ফোন কেটে দিয়েছিলাম।
সেদিন আমি ভেবেছিলাম,
সে হয়তো আমাকে থামাবে।
একটা ফোন করবে।
বলবে—
আমি পারব না তোমাকে ছেড়ে থাকতে।
কিন্তু কোনো ফোন আসেনি।
সেই রাতেই প্রথম বুঝলাম,
কিছু কিছু কথা রাগের মাথায় বলা হলেও
সামনের মানুষটা সেগুলো সত্যি বলে ধরে নেয়।
তারপর কয়েকটা দিন কেটে গেল।
কথা কমে গেল।
তারপর আরও কম।
একসময় প্রায় বন্ধ।
আমি বাইরে থেকে স্বাভাবিক ছিলাম।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা মানুষ প্রতিদিন ভেঙে যাচ্ছিল।
পুরোনো মেসেজগুলো খুলতাম।
মেঘলার পাঠানো ছবি দেখতাম।
খেয়েছ?—
ঘুমাওনি কেন?—
রাগ করো না।
আমি তো আছি।
এই ছোট ছোট কথাগুলো পড়তাম আর ভাবতাম—
আমি কীভাবে এত সহজে একজন মানুষকে হারানোর পথে নিয়ে গেলাম?
একদিন মেঘলার সঙ্গে দেখা হলো।
সে আমার সামনে বসেছিল।
অনেকদিন পর।
আমি তাকিয়ে ছিলাম।
মনে হচ্ছিল,
মেয়েটা একই আছে।
শুধু আমাদের মাঝখানটা বদলে গেছে।
আমি বললাম,
—আমি কি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি?
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
আমার বুকটা কেঁপে উঠল।
—কতটা?
সে একটু হেসে বলল,
—যতটা তুমি বুঝতে পারোনি।
আমি চুপ।
সে বলল,
—তুমি আমাকে ভালোবাসতে। আমি জানি। কিন্তু তোমার ভালোবাসার ভেতরে সবসময় একটা ভয় ছিল। আর সেই ভয়টা ধীরে ধীরে আমার জন্য শ্বাস নেওয়া কঠিন করে দিয়েছিল।
আমি মাথা নিচু করলাম।
সে বলল,
—তুমি আমাকে হারানোর ভয় পেতে পেতে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছিলে যে, একসময় তোমার হাতের ভেতরেই আমার কষ্ট হতে শুরু করেছিল।
আমার চোখে পানি চলে এসেছিল।
আমি বললাম,
—আমি বদলে যাব।
মেঘলা চুপ।
—একটা সুযোগ দাও।
সে আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে ভালোবাসা ছিল।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল ক্লান্তি।
সে বলল,
—তুমি বদলাবে। কিন্তু আমার জন্য নয়। নিজের জন্য বদলাও।
আমি বললাম,
—তাহলে?
সে খুব আস্তে বলল,
—আমাদের আর আগের মতো হওয়া সম্ভব নয়।
সেদিন বাড়ি ফিরে আমি প্রথমবার কাঁদলাম।
শুধু মেঘলাকে হারানোর জন্য নয়।
নিজেকে চিনতে পেরে।
আমি বুঝলাম,
আমি মেঘলাকে ভালোবাসতাম ঠিকই,
কিন্তু তাকে বোঝার চেষ্টা করিনি।
আমি তার ভালো চেয়েছিলাম,
কিন্তু আমার চাওয়া অনুযায়ী।
আমি তাকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলাম,
কিন্তু তার ইচ্ছেটা জানতে চাইনি।
আমি তাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম,
কিন্তু সেই ভয়েই তাকে হারিয়ে ফেললাম।
তারপর একদিন মেঘলার কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম।
খামটা খুলতে আমার হাত কাঁপছিল।
ভেতরে মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা।
চিঠির শুরুতে লেখা—
তুমি জানো, তোমার একটা অভ্যাস আমি খুব পছন্দ করতাম?
আমি পড়তে লাগলাম।
তুমি যখন আমাকে হারানোর ভয় পেতে, তখন তোমার চোখে সত্যিকারের ভালোবাসা দেখতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ভয়টা তোমার আচরণে এসে পড়ল। তুমি আমাকে ভালোবাসার চেয়ে বেশি ভয় পেতে শুরু করলে। আর আমি বুঝতে পারলাম, তোমার কাছে আমি মানুষ নই—তোমার হারিয়ে ফেলার ভয়।
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।
আরও পড়লাম।
তবু একটা কথা সত্যি—আমি তোমাকে কখনো ঘৃণা করিনি।
তারপর—
আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি একদিন বুঝবে, ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের কাছে আটকে রাখা নয়। ভালোবাসা মানে এমন একটা জায়গা তৈরি করা, যেখানে মানুষটা নিজের ইচ্ছায় ফিরে আসতে চায়।
চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল—
আমাকে হারানোর পর যদি তুমি ভালোবাসতে শেখো, তাহলে হয়তো আমাদের ভালোবাসা পুরোপুরি ব্যর্থ ছিল না।
আমি অনেকক্ষণ চিঠিটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
তারপর হঠাৎ শেষ পাতার নিচে একটা ছোট্ট লাইন চোখে পড়ল।
আমি থেমে গেলাম।
লাইনটা ছিল—
আর একটা কথা—আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি না।
আমার বুক ধক করে উঠল।
তার নিচে লেখা—
আমি শুধু তোমার কাছ থেকে একটু দূরে যাচ্ছি, যাতে তুমি আমাকে হারানোর ভয় ছাড়াই আমাকে ভালোবাসতে শেখো।
চিঠিটা হাতে নিয়ে আমি মেঘলাকে ফোন করলাম।
ফোন বন্ধ।
পরদিনও বন্ধ।
তারপর আরও কয়েকদিন।
আমি অপেক্ষা করলাম।
এক সপ্তাহ।
দুই সপ্তাহ।
এক মাস।
মেঘলার কোনো খবর নেই।
আমি ভাবলাম,
হয়তো সে সত্যিই চলে গেছে।
একদিন বিকেলে সেই পুরোনো চায়ের দোকানে গিয়ে বসেছিলাম।
যেখানে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।
আকাশে সেদিনও মেঘ ছিল।
আমি এক কাপ চা নিয়ে চুপ করে বসে ছিলাম।
হঠাৎ দোকানের ছেলেটা এসে বলল,
—ভাই, আপনার জন্য একটা জিনিস রেখে গিয়েছিল একজন।
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
সে একটা ছোট্ট খাম আমার হাতে দিল।
আমার হাত কাঁপছিল।
খাম খুললাম।
ভেতরে একটা ছবি।
আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার দিনের সেই জায়গার ছবি।
আর ছবির পেছনে লেখা—
তুমি সবসময় ভাবতে, আমি তোমাকে ছেড়ে অন্য কারও কাছে চলে যাব।
তার নিচে—
কিন্তু তুমি কখনো জানতে চাওনি, আমি আসলে কোথায় যেতে চেয়েছিলাম।
আমি থমকে গেলাম।
আরও পড়লাম—
আমি তোমার কাছেই ফিরতে চেয়েছিলাম।
আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ে যাচ্ছিল।
শেষে লেখা ছিল—
কিন্তু তোমার কাছে ফেরার আগে আমাকে নিশ্চিত হতে হয়েছিল—তুমি আমাকে আগের মতো নিজের করে পেতে চাইবে, নাকি আমার নিজের মতো করে বাঁচার অধিকারটুকুও ভালোবাসবে।
আমি চিঠিটা বুকে চেপে ধরলাম।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ শুনলাম—
—এতদিনেও কি শিখলে না?
আমি ঘুরে তাকালাম।
মেঘলা দাঁড়িয়ে ছিল।
সেই একই চোখ।
সেই একই মুখ।
শুধু আজ তার চোখে কোনো ভয় নেই।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
কিছু বলতে পারলাম না।
মেঘলা ধীরে ধীরে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
আমি শুধু বললাম,
—তুমি ফিরে এসেছ?
সে মৃদু হেসে বলল,
—না।
আমার বুকটা আবার কেঁপে উঠল।
সে বলল,
—আমি কোথাও যাইনি।
আমি তাকিয়ে রইলাম।
মেঘলা বলল,
—আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম, তুমি কখন বুঝবে—ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে এমনভাবে পাশে থাকা, যাতে মানুষটা নিজের ইচ্ছায় তোমার হাতটা ধরে।
আমি চোখের পানি মুছে বললাম,
—আর যদি আমি আবার ভুল করি?
মেঘলা একটু হেসে বলল,
—তাহলে এবার আমাকে প্রশ্ন করবে। অনুমান করবে না।
আমি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম।
কিন্তু এবার তাকে টেনে নিইনি।
শুধু হাতটা বাড়িয়ে রেখেছিলাম।
মেঘলা কিছুক্ষণ আমার হাতের দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর নিজের ইচ্ছায় আমার হাতটা ধরল।
সেই মুহূর্তে বুঝলাম—
কাউকে নিজের করে পাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হলো,
যখন সে নিজের ইচ্ছায় তোমার কাছে ফিরে আসে।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে মেঘলা আমার পাশে হাঁটছিল।
আমি খুব সাবধানে তার হাত ধরে ছিলাম।
আগের মতো শক্ত করে নয়।
যেন একটু বেশি চাপ দিলেই আবার হারিয়ে ফেলব।
মেঘলা হেসে বলল,
—এত আস্তে ধরেছ কেন?
আমি বললাম,
—ভয় হয়।
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কিসের?
আমি বললাম,
—তোমাকে হারানোর।
মেঘলা থেমে গেল।
তারপর আমার হাতটা একটু শক্ত করে ধরে বলল,
—এবার ভয় পেয়ো না।
আমি তাকালাম।
সে বলল,
আমি তোমার সম্পত্তি নই।
আমি তোমার মানুষ।
আর মানুষকে ধরে রাখতে হয় না—
ভালোবাসতে হয়।
সেদিন প্রথমবার মনে হয়েছিল,
আমি মেঘলাকে ফিরে পাইনি।
আমি বরং প্রথমবারের মতো
মেঘলাকে ভালোবাসতে শিখেছি।
আর হয়তো এটাই আমাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়—
যেখানে ভালোবাসা শেষ হয়ে যায়নি,
শুধু ভালোবাসার অর্থটা বদলে গেছে।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।