অবহেলার ওপারে সম্মান
মোঃ বুলবুল হোসেন
সকালবেলার রোদ তখনও তেমন তীব্র হয়ে ওঠেনি। গ্রামের সরু মেঠোপথ ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছিল রাশেদ। এক হাতে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ, অন্য হাতে কয়েকটি বই। পরনে সাদামাটা পাঞ্জাবি, পায়ে বহুদিনের ব্যবহারে বিবর্ণ স্যান্ডেল। তাকে দেখলে বোঝার উপায় ছিল না, এই সাধারণ চেহারার মানুষটির ভেতরে কত বড় একটি স্বপ্ন লুকিয়ে আছে।
রাশেদ গ্রামের একটি উচ্চবিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই সে চেষ্টা করেছে শুধু বইয়ের পাঠ না দিয়ে ছাত্রদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। দরিদ্র ছাত্রের খাতা কিনে দেওয়া, অসুস্থ কোনো ছাত্রের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়া, কারও পরীক্ষার ফি না থাকলে নিজের পকেট থেকে দিয়ে দেওয়া—এসব তার কাছে কোনো মহৎ কাজ ছিল না। সে মনে করত, একজন শিক্ষক হিসেবে এগুলো তার দায়িত্ব।
কিন্তু সবাই রাশেদের এই কাজকে ভালো চোখে দেখত না। বিশেষ করে গ্রামের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী কামাল সাহেব তাকে প্রায়ই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন।
একদিন স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে রাশেদকে প্রধান অতিথির সামনে বক্তব্য দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলো। অনুষ্ঠান শেষে গ্রামের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বসেছিলেন। কামাল সাহেবও সেখানে ছিলেন।
রাশেদ বলছিল, আমাদের সন্তানদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই হবে না। তাদের ভালো মানুষ হতে হবে। মানুষের প্রতি সম্মান, সততা আর দায়িত্ববোধ—এসবই জীবনের আসল শিক্ষা।
কথা শেষ হতেই কামাল সাহেব হেসে উঠলেন।
স্যার, এত বড় বড় কথা বলে লাভ কী? এই যুগে সততা দিয়ে কয়জন চলে? টাকা থাকলে মানুষ সম্মান করে, টাকা না থাকলে কেউ ফিরেও তাকায় না।
চারপাশে কয়েকজন মুচকি হাসল।
রাশেদ কিছু বলল না।
কামাল সাহেব আবার বললেন, আপনি এত ছাত্রের পেছনে সময় দেন, কিন্তু নিজের অবস্থাটা দেখেছেন? এখনও সেই পুরোনো স্যান্ডেল, পুরোনো ব্যাগ! মানুষকে আগে নিজের অবস্থান দেখাতে হয়, তারপর সম্মান পাওয়া যায়।
কথাগুলো শুনে কয়েকজনের হাসি আরও বেড়ে গেল। রাশেদের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। অপমানটা সে অনুভব করেছিল। কিন্তু মুখে কোনো কথা আনল না।
শুধু শান্তভাবে বলল, সম্মান যদি পোশাক, টাকা আর ক্ষমতার ওপর নির্ভর করত, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত মানুষগুলো সবসময় সবচেয়ে ধনী হতো।
কামাল সাহেব বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। রাশেদও সেখান থেকে চলে গেল।
রাশেদের সংসার খুব সাধারণ। বৃদ্ধ মা আমেনা বেগম, স্ত্রী সালমা আর ছোট মেয়ে মাইশাকে নিয়ে তার সংসার। বাবাকে সে ছোটবেলাতেই হারিয়েছে। অভাবের মধ্যেই বড় হয়েছে। তাই অভাবকে সে ভয় পায় না।
তার মা প্রায়ই বলতেন, বাবা, মানুষ তোকে কী বলল সেটা নিয়ে বেশি ভাবিস না। তুই শুধু এমনভাবে চলবি, যেন রাতে ঘুমানোর সময় নিজের বিবেকের কাছে লজ্জা না লাগে।
মায়ের কথাগুলো রাশেদ বুকের মধ্যে ধারণ করে রেখেছিল।
এক রাতে খাওয়ার সময় সালমা বলল, আজ আবার কামাল সাহেব তোমাকে কিছু বলেছেন?
রাশেদ অবাক হয়ে তাকাল।
তুমি জানলে কীভাবে?
মাইশা শুনেছে। বাড়ি ফিরে সে আমাকে বলেছে।
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
সালমা ধীরে বলল, তোমার কষ্ট হয়?
রাশেদ মৃদু হাসল।
মানুষ হলে কষ্ট তো হবেই। কিন্তু কষ্টের কারণে নিজের পথ বদলাতে চাই না।
তুমি কখনও ভাবো না, সবাইকে একটু খুশি রাখলে তোমার জীবনটা সহজ হতো?
রাশেদ মাথা নেড়ে বলল, সবাইকে খুশি করতে গেলে হয়তো মানুষটা আমি থাকব না।
সালমা আর কিছু বলল না।
সে জানত, তার স্বামীকে ভেঙে দেওয়া সহজ নয়।
স্কুলে রাশেদের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র ছিল সুমন।
সুমনের বাবা দিনমজুর। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। সংসারে অভাব এত বেশি যে অনেক সময় দুপুরে খাবার জোটে, রাতে জোটে না।
একদিন সুমন স্কুলে এসে রাশেদের কাছে দাঁড়াল।
স্যার, একটা কথা বলব?
বল।
আমার বাবা বলেছে, আর পড়াশোনা করতে পারব না। আমাকে বাজারে দোকানে কাজ করতে হবে।
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তুমি কী চাও?
সুমনের চোখে পানি এসে গেল।
আমি পড়তে চাই স্যার।
রাশেদ তার কাঁধে হাত রাখল।
তাহলে পড়বে।
কিন্তু খরচ?
যতদিন পারি, আমি দেখব।
সুমন অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
আপনি পারবেন?
রাশেদ হেসে বলল, চেষ্টা করলে মানুষ অনেক কিছুই পারে।
সেদিন থেকে রাশেদ নিজের খরচ আরও কমিয়ে দিল। সুমনের বই, খাতা, পরীক্ষার ফি—যতটুকু সম্ভব সে দিতে লাগল।
কেউ জানল না।
কিন্তু মানুষের ভালো কাজ কখনও পুরোপুরি গোপন থাকে না।
সময় চলে গেল।
সুমন পড়াশোনা শেষ করে শহরে ভর্তি হলো। রাশেদ তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। মাঝে মাঝে ফোন করে বলত, কেমন চলছে?
সুমন বলত, ভালো স্যার। আপনার দোয়া আছে বলেই।
রাশেদ উত্তর দিত, আমার দোয়া নয়, তোমার পরিশ্রম তোমাকে এগিয়ে নেবে।
অন্যদিকে কামাল সাহেবের ব্যবসা দ্রুত বড় হতে লাগল। নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি, শহরে জমি—সবই হলো।
গ্রামের মানুষ তার বাড়িতে যেত। কেউ ব্যবসার জন্য, কেউ সাহায্যের আশায়, কেউ শুধু তার ক্ষমতার কারণে।
কামাল সাহেব মনে মনে ভাবতেন, তিনিই গ্রামের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ।
রাশেদকে দেখলে এখনও তিনি আগের মতোই অবহেলা করতেন।
একদিন বাজারে দেখা হলে বললেন, স্যার, এখনও ওই স্কুলেই আছেন? এত বছরেও তো কোনো উন্নতি হলো না!
রাশেদ হেসে বলল, মানুষের উন্নতি সবসময় চোখে দেখা যায় না।
কামাল সাহেব হেসে বললেন, এই কথাগুলো দিয়ে জীবন চলে না।
রাশেদ বলল, জীবন শুধু টাকা দিয়ে চলে না।
কামাল সাহেব আর কথা বাড়ালেন না।
কয়েক বছর পর গ্রামের স্কুলে বড় একটি অনুষ্ঠান হলো। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে শহর থেকে একজন শিক্ষাবিদ আসবেন।
সেদিন স্কুলের সামনে মানুষের ভিড়।
হঠাৎ একটি গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেমে এলেন একজন তরুণ কর্মকর্তা। পরনে পরিপাটি পোশাক, হাতে ফাইল।
তিনি মঞ্চে উঠে প্রথমেই রাশেদকে খুঁজতে লাগলেন।
রাশেদ স্যার কোথায়?
রাশেদ পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল।
তরুণ কর্মকর্তা তাকে দেখে এগিয়ে এসে সালাম করলেন।
স্যার, আমাকে চিনতে পারছেন?
রাশেদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, সুমন?
তরুণটি হাসতে হাসতে মাথা নত করল।
জি স্যার। আপনার সেই সুমন।
রাশেদের চোখ ভিজে উঠল।
সুমন এখন একজন সরকারি কর্মকর্তা। বহু কষ্ট পেরিয়ে সে নিজের জায়গা তৈরি করেছে।
মঞ্চে উঠে সুমন বলল, আজ আমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, তার পেছনে আমার বাবা-মায়ের পরিশ্রম আছে। কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে একজন মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি হলেন আমার শিক্ষক রাশেদ স্যার।
পুরো মাঠ নীরব।
সুমন বলতে লাগল, যখন আমার পরিবার আমাকে পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে বলেছিল, তখন স্যার আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনি কখনও আমাকে দয়া করেননি। তিনি আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন। সেই বিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে দিয়েছে।
রাশেদ মাথা নিচু করে বসে ছিল।
সুমন মঞ্চ থেকে নেমে এসে তার পা ছুঁতে গেল।
রাশেদ দ্রুত তাকে তুলে ধরল।
না বাবা, এমন করো না।
সুমন বলল, স্যার, আপনি আমাকে মানুষ করেছেন।
রাশেদের চোখের পানি আর আটকাল না।
সেই অনুষ্ঠানে কামাল সাহেবও ছিলেন।
তিনি দূর থেকে সব দেখছিলেন।
কিছুদিন আগে পর্যন্ত যাকে তিনি তুচ্ছ করতেন, আজ সেই মানুষটির জন্য শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে সম্মান জানাচ্ছে।
কামাল সাহেবের মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
তিনি প্রথমবার বুঝতে পারলেন, মানুষের সম্মান আর মানুষের সম্পদ এক জিনিস নয়।
অনুষ্ঠান শেষে তিনি রাশেদের কাছে গেলেন।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, স্যার, একটা কথা বলব?
জি, বলুন।
কামাল সাহেবের কণ্ঠ এবার আগের মতো দৃঢ় নয়।
আমি আপনাকে অনেকবার ছোট করেছি। আপনার পোশাক নিয়ে, আপনার অবস্থান নিয়ে, আপনার আয় নিয়ে কথা বলেছি। তখন মনে হতো, আমার টাকা আছে বলেই আমি বড়। আজ বুঝলাম, বড় হওয়া আর বড় দেখানো এক জিনিস নয়।
রাশেদ কিছু বলল না।
কামাল সাহেব বললেন, আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন?
রাশেদ মৃদু হাসল।
ক্ষমা চাওয়ার মতো কিছু নেই। আমরা সবাই ভুল করি।
কামাল সাহেব মাথা নিচু করলেন।
আপনি আমার ওপর রাগ করেননি?
রাশেদ বলল, রাগ করে কী লাভ? আপনার কথাগুলো যদি আমার চরিত্র বদলে দিত, তাহলে ক্ষতিটা আমারই হতো।
কামাল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
আপনি সত্যিই অন্যরকম মানুষ।
রাশেদ বলল, না। আমি শুধু চেষ্টা করি, অন্যের আচরণের কারণে যেন নিজের আচরণ খারাপ না হয়ে যায়।
কিছুদিন পর কামাল সাহেবের ব্যবসায় বড় বিপদ দেখা দিল। একজন ঘনিষ্ঠ অংশীদার তার সঙ্গে প্রতারণা করল। অনেক টাকা আটকে গেল। যাদের তিনি এতদিন সাহায্য করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই দূরে সরে গেল।
যারা প্রতিদিন তার বাড়িতে আসত, তারা ফোন ধরা বন্ধ করে দিল।
কামাল সাহেব তখন বুঝলেন, মানুষের ভিড় আর মানুষের সম্পর্ক এক নয়।
একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে বাড়িতে পড়ে ছিলেন। খবর পেয়ে রাশেদ দেখতে গেল।
কামাল সাহেব অবাক হয়ে বললেন, আপনি এসেছেন?
অসুস্থ মানুষকে দেখতে আসার জন্য পুরোনো হিসাব লাগে না।
কামাল সাহেবের চোখ ভিজে গেল।
আমি তো আপনাকে কখনও আপনজন ভাবিনি।
রাশেদ শান্তভাবে বলল, আপনি না ভাবলেও আমি আপনাকে শত্রু ভাবিনি।
এই একটি বাক্য কামাল সাহেবের হৃদয়ে গভীরভাবে আঘাত করল।
তিনি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন, স্যার, মানুষকে ছোট করার আগে মানুষকে চিনতে হয়। আমি আপনাকে চিনিনি।
রাশেদ বলল, মানুষকে চেনার জন্য তার পোশাক দেখতে হয় না, তার ব্যবহার দেখতে হয়।
এরপর থেকে কামাল সাহেব বদলে যেতে শুরু করলেন।
তিনি গ্রামের দরিদ্র ছাত্রদের জন্য একটি শিক্ষাবৃত্তি চালু করলেন। স্কুলের লাইব্রেরি সংস্কার করলেন। গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াতে শুরু করলেন।
একদিন তিনি রাশেদকে বললেন, আপনার কাছ থেকে একটা জিনিস শিখেছি।
কী?
মানুষের দেওয়া সম্মান ধরে রাখতে গেলে মানুষের প্রশংসার পেছনে ছুটতে হয়। কিন্তু ভালো মানুষ হতে গেলে কারও প্রশংসা লাগে না।
রাশেদ মৃদু হেসে বলল, ভালো কাজের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো নিজের বিবেকের শান্তি।
বছর কয়েক পর রাশেদ অবসর নিল।
অবসরের দিন স্কুলের মাঠে বিশাল আয়োজন করা হলো।
গ্রামের মানুষ, শিক্ষক, ছাত্র, সাবেক ছাত্র—সবাই উপস্থিত।
মঞ্চে উঠে একজন বৃদ্ধ কৃষক বললেন, স্যার, আপনি আমার ছেলেকে পড়িয়েছেন। সে আজ বিদেশে চাকরি করে। আমি গরিব মানুষ, আপনাকে কিছু দিতে পারিনি। শুধু দোয়া করেছি।
একজন মা বললেন, আমার মেয়েকে যখন সবাই বলেছিল পড়াশোনা করে লাভ নেই, তখন আপনি তাকে সাহস দিয়েছিলেন।
একজন সাবেক ছাত্র বলল, স্যার, আপনি আমাদের বাংলা পড়িয়েছেন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি শিখিয়েছেন কীভাবে মানুষ হতে হয়।
রাশেদ মঞ্চে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাল।
তার চোখে পানি।
সে বলল, জীবনে আমাকে অনেকেই অবহেলা করেছে। কেউ আমার পোশাক দেখে, কেউ আমার আয় দেখে, কেউ আমার সাধারণ জীবন দেখে আমাকে ছোট ভেবেছে। কিন্তু আমি কখনও তাদের ভুল প্রমাণ করার জন্য ভালো কাজ করিনি। আমি ভালো কাজ করেছি, কারণ আমি বিশ্বাস করি, মানুষের মূল্য মানুষের কথায় নির্ধারিত হয় না।
মাঠ নিস্তব্ধ।
রাশেদ আবার বলল, আপনাকে কেউ অবহেলা করলে নিজেকে ছোট ভাববেন না। কেউ আপনার মূল্য বুঝতে না পারলে নিজের মূল্য কমিয়ে দেবেন না। সময় সবকিছুর উত্তর দেয়। তবে তার চেয়েও বড় কথা, আপনার কর্ম আপনার পরিচয় হয়ে দাঁড়াবে।
সে আকাশের দিকে তাকাল।
হে আল্লাহ, মানুষ আমাকে মনে রাখুক বা না রাখুক, তুমি যেন আমার ভালো কাজগুলো কবুল করো।
মাঠের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কামাল সাহেব।
তার চোখেও পানি।
তিনি ধীরে ধীরে হাত তুলে দোয়া করলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় রাশেদ বাড়ির পথে হাঁটছিল।
আগের সেই মেঠোপথ। একই গ্রামের রাস্তা। একই সাধারণ মানুষ।
কিন্তু আজ তার মনে কোনো অভিমান নেই।
মাইশা বাবার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, বাবা, আজ সবাই তোমাকে এত সম্মান করল। তুমি কি খুব খুশি?
রাশেদ মৃদু হেসে বলল, খুশি হয়েছি। তবে একটা কথা মনে রাখবে মা, আজ মানুষ সম্মান করেছে বলে আমি ভালো মানুষ হয়ে যাইনি। আমি ভালো থাকার চেষ্টা করেছি বলেই আজকের সম্মানটা এসেছে।
মাইশা বলল, কেউ যদি তোমাকে অবহেলা করে?
রাশেদ মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল, তাহলে তাকে অবহেলা করতে হবে না। নিজের পথ ঠিক রাখতে হবে।
আর যদি কেউ অন্যায় করে?
অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে, কিন্তু নিজের চরিত্র নষ্ট করবে না।
মাইশা বাবার হাত শক্ত করে ধরল।
রাশেদ ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। মেঠোপথের ওপর লম্বা ছায়া পড়েছে।
রাশেদের পুরোনো স্যান্ডেল এখনও সেই আগের মতোই।
কাপড়ও সাধারণ।
ব্যাগটাও পুরোনো।
শুধু একটি জিনিস বদলেছে।
আজ আর কেউ তার পোশাক দেখে তার মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না।
কারণ তার পরিচয় এখন তার পোশাকে নয়, তার চরিত্রে।
তার সম্পদ এখন তার ঘরে নয়, অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।
আর তার সবচেয়ে বড় সম্মান কোনো মানুষের দেওয়া পদক নয়।
তার সবচেয়ে বড় সম্মান হলো, যাদের জীবনে সে আলো জ্বালিয়েছে, তারা আজও তাকে ভালোবেসে মনে রেখেছে।
রাশেদ আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, হে আল্লাহ, মানুষ আমাকে মনে রাখুক বা না রাখুক, তুমি যেন আমার ভালো কাজগুলো কবুল করো।
তারপর সে বাড়ির পথে এগিয়ে গেল।
পেছনে পড়ে রইল সেই মেঠোপথ, সেই পুরোনো স্যান্ডেলের শব্দ আর একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনের গল্প।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।