বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’য় হয়ে উঠেছেন একজন দার্শনিক নজরুল। এখানে জীবনবোধ, সমাজবাস্তবতা ও মানুষের অন্তর্গত যন্ত্রণার যে গভীর উপলব্ধি তাঁর কথনে প্রকাশ পেয়েছে, তার কিছু উক্তি পাঠকমনে তৃপ্তির জলোচ্ছ্বাস নামায়। যেমন—

★ “মাগরিবের আজান স্মরণ করায়—জীবনের বেলা শেষ, আর সময় নাই। মাগরিবের নামাজ যেন মৃতদেহ সামনে জানাজা নামাজ।”

★ "রূপের যে একটা মোহ থাকে, তাতে কেবল পুরুষই মুগ্ধ হয় না, দজ্জাল মেয়েরাও রূপের আঁচড়ে গলে নরম হয়।”

★ "হাতের লজ্জা কখনো হৃদয় দিয়ে ঢাকা যায় না।”

★ “কপালে সুখ না লেখা থাকলে তা পাথরে ঠুকে লাভ নেই। তাতে কপাল যথেষ্ট ফুলে কিনা, কিন্তু ভাগ্য মোটেও ফোলে না।”

নজরুল ইসলামের প্রতিটি সাহিত্যকর্মের নামকরণেই যেন এক ধরনের শিল্পসফলতা রয়েছে। তাঁর সাহিত্যকর্মের নাম কেবল একটি নাম নয়; অনেক সময় তা হয়ে ওঠে সমগ্র রচনারই দর্পণ। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—যারা কেবল নামকে নামই মনে করেন, তিনি তাঁদের দলের নন। কবি নজরুলও যেন সেই চেতনারই ধারক। তাঁর প্রতিটি সাহিত্যকর্মের নামের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে রচনার অন্তর্গত সুর।

তাঁর অনন্যকীর্তি ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস। নামকরণের দিক থেকে এই উপন্যাস কতটা সার্থক, তা বিচার করতে হলে প্রথমেই ফিরে তাকাতে হয় এর চরিত্র ও জীবনবাস্তবতার দিকে।

মানুষের সহজাত স্বাভাবিক ক্ষুধা থাকে খাবারের জন্য—যে ক্ষুধা তাকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু ‘মৃত্যুক্ষুধা’-র চরিত্রগুলোর জীবনে দুঃখ-কষ্ট এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে যে, সেই কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে কখনো কখনো মৃত্যুই যেন একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ জীবনের স্বাভাবিক ক্ষুধার পাশাপাশি এখানে জন্ম নেয় মৃত্যুর প্রতি এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা। সেই অর্থেই উপন্যাসটির নাম ‘মৃত্যুক্ষুধা’ যথেষ্ট সার্থক।

আবার উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ করলে দেখা যায়, ক্ষুধা ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে এর অধিকাংশ ঘটনা। ক্ষুধার তাড়নায় ধর্মান্তরের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়; আবার মৃত্যুর আশঙ্কায় মেঝোবউয়ের ভেঙে পড়াও লক্ষণীয়। অর্থাৎ ক্ষুধা ও মৃত্যু এখানে শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, বরং পুরো জনপদের জীবনযাপনের নিয়ামক।

ঔপন্যাসিক কাতলীপাড়াকে যেন মৃত্যুর গোডাউন হিসেবে দেখেছেন—যেখানে মানুষগুলো শুধু জীবনধারণের জন্য অপেক্ষা করছে, অথচ মৃত্যুর অর্ডার যেন যেকোনো মুহূর্তে এসে যেতে পারে। কাতলীপাড়া তাই শুধু একটি স্থান নয়; এটি হয়ে ওঠে তৎকালীন দরিদ্র সমাজের প্রতীক।

অভাবের রাজ্যে হিন্দু, মুসলিম ও নবদীক্ষিত খ্রিষ্টান—সবাই একসঙ্গে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে কাতলীপাড়ায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। বাচ্চারা সারাদিন রোদে পুড়ে ঘুড়ি ওড়ায়, মাঝেমধ্যে মায়ের কাজে সাহায্য করে। ছেলে সন্তান একটু বড় হয়ে উঠলেই তার হাতে তুলে দেওয়া হয় পরিবারের হাল। অপরিণত বয়সে বিয়ে, তারপর সন্তান-সন্ততি নিয়ে বিশাল পরিবার—এইভাবেই চলতে থাকে জীবন।

এখানে মোড়লরা এলাকা শাসন করে। তারা অন্যায় করলেও প্রতিবাদের সুযোগ নেই। অশিক্ষিত সমাজে প্রতিবাদ করার মতো মানুষও নেই। অন্যদিকে ধনকুবের মহাজন ও মিশনারিদের রয়েছে একচেটিয়া আধিপত্য। অর্থাৎ কাতলীপাড়া এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষের দারিদ্র্য শুধু তার পেটকেই ক্ষুধার্ত রাখে না; তার চিন্তা, শিক্ষা, অধিকার ও প্রতিবাদের ক্ষমতাকেও ক্ষীণ করে দেয়।

দায়িত্ববোধের জায়গায় প্যাঁকালে এক অনন্য চরিত্র। অশিক্ষিত সমাজের অশিক্ষিত প্যাঁকালে তার পরিবারের জন্য যা করেছে, বর্তমান শিক্ষিত সমাজের অনেক সভ্য নাগরিকও তা করে না।

প্যাঁকালের তিন ভাই—বারিক, গজালে ও সোভান—তাদের তিন বিধবা স্ত্রী এবং সন্তান-সন্ততিসহ মোট ডজনখানেক সদস্যের পরিবার সে একাই টেনেছে। কোনোদিন মন খারাপ করেনি। আয় করা পয়সা দিয়ে বাজার করেছে, কিছু জমিয়েছে; কিন্তু প্রয়োজন দেখা দিলে সেই জমানো অর্থও ভাবিদের ওষুধ কিনতে উজাড় করে দিয়েছে।

প্রিয় মানুষটিকে কামারের সঙ্গে দেখে কুন্তির আঘাতে আহত হয়ে প্যাঁকালে এলাকা ত্যাগ করে। পরে শুধুমাত্র তাকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সে ধর্মান্তরিত হয়। আবার পরবর্তীতে তওবা করে মুসলিম ধর্মে ফিরে আসে।

প্যাঁকালের জীবন তাই শুধু একজন ব্যক্তির জীবন নয়; এটি দায়িত্ব, ভালোবাসা, অভাব ও সামাজিক বাস্তবতার এক জটিল প্রতিচ্ছবি। অশিক্ষিত হয়েও সে যে মানবিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়, তা আজকের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়।

অভাবের তাড়নায় শিশুর গগনবিদারী আর্তনাদ কিংবা নীরব অভিমান, তাদের শীর্ণ শরীর, মায়ের দুগ্ধশূন্য বুক—সবকিছু মিলে ‘মৃত্যুক্ষুধা’-র পৃথিবী যেন এক দীর্ঘ আর্তনাদ।

দুগ্ধপোষ্য সন্তানের সারাদিনের অবিরাম কান্না অসহায় মায়ের বুকে বিষাক্ত তীরের মতো আঘাত হানে। ফলে একসময় সেই মা-ই তার আদরের সন্তানের মৃত্যু কামনা করতে বাধ্য হয়। মাতৃত্বের যে স্বাভাবিক কোমলতা, ক্ষুধা সেখানে এসে তাকে নিষ্ঠুরতার দিকে ঠেলে দেয়।

আবার সন্তান হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মাকে খেতে দেখা যায়। আমরা সাধারণত জানি—মা নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ায়। কিন্তু চরম অভাবের সমাজে সেই চিরচেনা মাতৃত্বের ছবিও উল্টে যায়।

এমনকি আর্থিক নিদারুণ অভাব মেটাতে নিজের সন্তানকে নরবলির জন্য বিক্রি করতেও দেখা যায় কাতলীপাড়ার মানুষকে। খাবার জোগাড় করতেই তারা এতটা মগ্ন যে, তাদের ঘরে এমন অভাব—গায়ে পড়ে বড় ঝগড়া করারও যেন ফুরসত নেই।

এখানেই ‘মৃত্যুক্ষুধা’ শুধু একটি উপন্যাসের নাম নয়; এটি হয়ে ওঠেছে সময়ের সামাজিক দলিল।

কাতলীপাড়ার মানুষ নিজ নিজ ধর্মে কট্টর। মুসলিম, হিন্দু, অভাব মেটাতে নবদীক্ষিত খ্রিষ্টান—সবাই একই জনপদে পাশাপাশি বসবাস করে। ছোটখাটো ঝগড়া দেখা গেলেও বড় কোনো ধর্মীয় দাঙ্গা এখানে হয় না।

কারণ, অর্থের অভাব এখানে সবার নিত্যসঙ্গী। বেঁচে থাকার জন্য সবারই সবাইকে প্রয়োজন। তাই ছোটখাটো ঝগড়ার পর আবার মিলও হয়ে যায় অনায়াসে।

প্যাঁকালের মায়ের সঙ্গে বিরিম্বার বাঘে-মোষে কলহ; কিন্তু প্যাঁকালের বোনের সন্তান জন্মদানের প্রয়োজনে সেই কলহ নিমিষেই শেষ হয়ে যায়।

তবে কলতলায় মুসলিম ও নবদীক্ষিত খ্রিষ্টান দুই বান্ধবীর মধ্যে পানি নেওয়াকে কেন্দ্র করে তুমুল ঝগড়াও দেখা যায়। সেখানে ধর্ম বন্ধুত্বকে অনায়াসে ডিঙিয়ে যায়। অর্থাৎ ধর্মীয় পরিচয় কখনো সামাজিক সম্পর্কের ওপর, আবার কখনো প্রয়োজন ও মানবিকতার কাছে পরাজিত হয়—এই দ্বৈত বাস্তবতাও নজরুল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন।

অশিক্ষিত কাতলীপাড়া এতটাই অশিক্ষিত যে এখানকার মুসলিমরা আল্লাহকে জোড়া মুরগির লোভ দেখায়। অথচ একই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি অত্যন্ত প্রকট।

মেঝোবউয়ের ছোট মেয়েটির মধ্যেও আমরা সেই ধর্মীয় অনুভূতির চরম প্রকাশ দেখি। শয্যাশায়ী দাদির শিয়রে বসে সে প্রকাশ করে—মায়ের চেয়ে সে ধর্মকে বেশি ভালোবাসে, কারণ তার মা খ্রিষ্টান হয়ে গেছে। দূরে থাকা খ্রিষ্টান মায়ের কাছে না গিয়ে সে পরপারে বাবার কাছে যেতে রাজি। কারণ, ধর্মান্তর তার কাছে মৃত্যুর চেয়েও জঘন্য।

শৈশবে দেওয়া ধর্মীয় শিক্ষা তার মনে এমনভাবে প্রোথিত হয়েছে যে, পরবর্তী জীবনের বাস্তবতাও তাকে সহজে তা থেকে সরাতে পারে না।

অন্যদিকে মেঝোবউ সন্তানদের ক্ষুধার যন্ত্রণা নিবারণের জন্য মুসলিম ধর্ম ছেড়ে খ্রিষ্টান হয়ে হেলেন নাম ধারণ করে। কিন্তু আমাদের ধর্মান্ধ মুসলিম সমাজ কেবল তার ধর্মান্তর দেখেছে; ধর্মান্তরের কারণ দেখেও যেন দেখেনি।

কেউ কখনো সাহায্যের হাত বাড়ায়নি, কিন্তু ধর্মান্তরের পর অপবাদ দিতে কারও কুণ্ঠা হয়নি।

এখানেই নজরুলের প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে—মানুষ যখন ক্ষুধার কারণে ধর্ম পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়, তখন তার ধর্মান্তরের দায় কি শুধু তার নিজের?

সেকালের অশিক্ষিত সমাজে কোনো ইসলামি স্কলার ছিল না। যারা মোটামুটি আরবি হরফ চিনত, তারাই অনেক সময় হয়ে উঠত ধর্মের ধারক-বাহক। কোরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞানের চিহ্ন না থাকলেও নিজেদের মতো করে ফতোয়া দেওয়ার প্রবণতা ছিল। আর সেই সুযোগে সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে কোণঠাসা করে তাদের ব্যবসাও জমে উঠত।

মেঝোবউ খ্রিষ্টান হয়েছে—তাতে মেঝোবউ ও তার দুই সন্তানের কিছুটা লাভ হয়েছে ঠিকই; কিন্তু সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে কাতলীপাড়ার মোল্লাদের। তারা বরাবরই ইসলামকে ব্যবসার মূলধন হিসেবে ব্যবহার করেছে—এমন এক কঠোর সমালোচনার জায়গা থেকেই নজরুল সমাজের দিকে তাকিয়েছেন।

প্যাঁকালে ও মেঝোবউ খ্রিষ্টান হওয়ায় তাদের মায়ের শেষ সম্বল ছাগলগুলো বিক্রি করে সেই টাকা বহসের খরচ হিসেবে মোল্লার হাতে তুলে দিতে হয়; অন্যথায় তাদের পাড়া থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। তারা না খেয়ে মরলেও যেন কারও কিছু যায়-আসে না। এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।

তবে ব্যবসাটা কেবল ইসলাম নিয়ে হয়নি। দরিদ্র পরিবারগুলোর অভাবকে পুঁজি করে ধর্মপ্রচার ও নানা ধরনের প্রলোভনের মাধ্যমে খ্রিষ্টান মিশনারিরাও নিজেদের কার্যক্রম বিস্তার করেছে। মেঝোবউ তারই শিকার। এমন কত মুসলিম ও হিন্দু পরিবার যে তাদের গভীর চালের শিকার হয়েছে, তার হিসাব নেই।

নজরুল এখানে কোনো একটি ধর্মকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি; বরং ধর্মকে যখন মানুষের দুর্বলতার ওপর ব্যবসার হাতিয়ার বানানো হয়, তখন সেই ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধেই তাঁর অবস্থান।

মানবতার ফেরিওয়ালা হয়ে উপন্যাসে জন্ম নেয় আনসার—একজন জাত মানুষপ্রেমী।

তার মননে আগে মানুষ, পরে ধর্ম। তাই তিনি মেঝোবউকে খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করতে জোর করেননি। তিনি বুঝেছিলেন, তার ধর্মান্তরের পেছনে রয়েছে ক্ষুধা, অসহায়ত্ব ও ধর্মান্ধ সমাজব্যবস্থার নির্মমতা।

কিছুটা রহস্যময় হলেও আনসার একজন সংগ্রামী মানুষ। জনপদে জনপদে একতা ও ভালোবাসা স্থাপনই যেন তার জীবনের একমাত্র কাজ। শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করে সারা দেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি আমরণ কাজ করেছেন।

তিনি মানুষের মাঝে কেবল মানুষ দেখতেন।

রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে তাকে গ্রেফতার করা হলে জেলের দীর্ঘদিনের বসবাসে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। সেখান থেকে আর বেঁচে উঠতে পারেননি। তাঁর ভালোবাসার মানুষ রুবিও জীবনের শেষ সময়ে তাঁকে সেবা করতে গিয়ে একই রোগে আক্রান্ত হয়ে সহমরণ বরণ করে।

তবে মেঝোবউয়ের প্রতিও আনসারের একটি টান ছিল।

আনসার চরিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—তিনি মানুষের পরিচয়কে ধর্মীয় পরিচয়ের আগে স্থান দেন। ক্ষুধার্ত মানুষ কেন ধর্ম বদলেছে, সেটি বোঝার চেষ্টা করেন; শুধু ধর্ম বদলেছে বলে তাকে ঘৃণা করেন না।

‘মৃত্যুক্ষুধা’ তাই কেবল কাতলীপাড়ার গল্প নয়। এটি একটি সময়ের গল্প। ক্ষুধা এখানে কেবল পেটের ক্ষুধা নয়; এটি শিক্ষা, মর্যাদা, অধিকার, ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মানবিকতার ক্ষুধা।

মৃত্যুও এখানে কেবল জীবনের সমাপ্তি নয়; অনেকের কাছে তা হয়ে ওঠে দীর্ঘ যন্ত্রণার অবসানের আকাঙ্ক্ষা।

ক্ষুধা মানুষকে ধর্মান্তরিত করে, ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে, আবার প্রয়োজন মানুষকে সেই বিভাজন অতিক্রম করতেও বাধ্য করে। মোল্লা ধর্মকে ব্যবসার মূলধন বানায়, মিশনারি অভাবকে ধর্মপ্রচারের সুযোগ হিসেবে নেয়, আর আনসার ধর্মের ঊর্ধ্বে মানুষকে দেখতে শেখায়।

এই তিনটি প্রবণতার সংঘাতেই ‘মৃত্যুক্ষুধা’র সমাজজীবন নির্মিত।

নজরুলের কৃতিত্ব এখানেই—তিনি শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের ছবি আঁকেননি; তিনি দেখিয়েছেন ক্ষুধা কীভাবে মানুষের ধর্ম, নৈতিকতা, সম্পর্ক, মাতৃত্ব, ভালোবাসা এবং মৃত্যুচিন্তাকেও পরিবর্তন করে দেয়।

তাই ‘মৃত্যুক্ষুধা’ নামটি শুধু উপন্যাসটির নাম নয়—এ যেন সমগ্র কাতলীপাড়ার মানুষের জীবনের সংজ্ঞা।

যে জীবনে মানুষ বাঁচতে চায়, কিন্তু বাঁচার উপকরণ নেই;
যে সমাজে ধর্ম আছে, কিন্তু ধর্মের মানবিকতা নেই;
যেখানে মানুষ আছে, কিন্তু মানুষের অধিকার নেই;
যেখানে সন্তান আছে, কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে রাখার সামর্থ্য নেই;
যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু তার ওপরও অভাবের ছায়া;
সে সমাজে মৃত্যু কখনো কখনো ক্ষুধার মতোই অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আর এ কারণেই নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ কেবল একটি উপন্যাস নয়—এটি তার সময়ের ক্ষুধার্ত মানুষের জীবন, যন্ত্রণা ও সামাজিক বাস্তবতার এক নির্মম দর্পণ।

বিদ্রোহী নিশান
কবি ও সম্পাদক