প্রথম পর্ব

শ্রাবণের বৃষ্টিমুখর রাত। টিনের চালে আছড়ে পড়ছে তীব্রগতির অঝোরধারা। বারান্দার এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে নিশান। একা, নীরব, অচল, অটল। ঘরের কোণায় জমা হওয়া স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে তার চিরচেনা নোনা গন্ধ। তবে আজ চিরচেনা গন্ধের সাথে অপরিচিত এক আলাদা ঘ্রাণের মিশেল। মিশে আছে পোড়া কাঠের এক বিষাদ সৌরভ—যা তিন বছর আগে তার জীবনে ঘটে যাওয়া কালরাতের বিষাদোপহার। কোনোদিন কোনো বিনিময়ে নিশানের নাসারন্ধ্র থেকে মোছেনি যা।

মাঝেমাঝে বাতাসে সে এখনো শুনতে পায় বাবার হাতের তৈরি চট্টগ্রামের বিখ্যাত সেগুন কাঠের তৈরী বাবার প্রিয় খাট দাউদাউ করে জ্বলে ওঠার শব্দ। শুনতে পায় তীব্রানলে কাঠফাটার সেই চটচট আওয়াজ। এখনো তার বুকপাঁজরে আঘাত করে চরম।

মানুষের সবকিছু হারিয়ে শান্ত হয়ে যায়, চিৎকার করে কাঁদার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলে। শীতল জলের মতো নিথর হয়ে যায় উচাটন করা মনও। কান্নারা আর শব্দ করে না। বুকের ভেতরেই বাষ্প হয়ে জমা হয়, তারপর চোখের কোণ দিয়ে চুইয়ে পড়ে ভিজিয়ে দেয় চেহারার রুক্ষ স্কীন।

ঘরের এক কোণে একটা প্লাস্টিকের ছেঁড়া বস্তায় নিশানের অবশিষ্ট সম্বল—দুটো পুরনো শার্ট, আধপুরানা একটি লুঙ্গি, নিচের দিকে খানিক পুড়ে যাওয়া একটি প্যান্ট, একটি তালি দেওয়া গামচা আর কভার পুড়ে যাওয়া একটি জীর্ণ কোরআন শরিফ।

"নিশান... কিছু খাবি?"
আনাসের গলাটা কেমন যেন ভেঙে এসেছে। দরজার পাশে একটা খাঁজকাটা মাটির তৈরী বাটিতে দুটো শুকনো রুটি আর সামান্য মসুরের তরল ডাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। ডালের ওপর ভেসে থাকা দুটো শুকনো মরিচ যেন তাদের বর্তমান দারিদ্র্যকে উপহাস করছে।
আনাস নিশানের ছেলেবেলার বন্ধু। সে নিশানের দিকে তাকাতে পারছে না। এক অদৃশ্য অপরাধবোধে তার চোখ দুটো মাটিতে নত হয়ে আছে।

"তুই বস আনাস," নিশানের গলাটা খুব নিচু, যেন বহু দূর কোনো নির্জন পাহাড়ের তলদেশ থেকে ভেসে আসছে মৃদুস্বর। "নিজেকে এত অপরাধী ভাবিস না। তুই তো আমার কোনো ক্ষতি করিসনি।"

"আমি তো তোকে বাঁচাতেও পারিনি নিশান!" আনাস হাত থেকে বাটিটা মেঝেতে নামিয়ে মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। তার গলা দিয়ে ডুকরে কান্না বেরিয়ে এল। "যেদিন ওরা তোর দোকানটা পুড়িয়ে দিল, যেদিন দারোগা তোকে হাতকড়া পরিয়ে টেনে নিয়ে গেল... আমি কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত কামড়ালাম! গ্রামের শত শত মানুষ দেখল, কেউ এগিয়ে এল না! আমরা কেউ প্রতিবাদ করতে পারলাম না সিকদারের ভয়ে! আমরা পুরুষ নই নিশান, আমরা কাপুরুষ!"

নিশান খুব ধীরে আনাসের কাঁধে হাত রাখে। নিশানের খসখসে হাত, যে হাত কাঠের গায়ে শিল্প আঁকতে পরিশ্রম করেছে ছোটবেলা থেকে। আর কারাবরণের পর জেলের সশ্রম নিয়মে যে হাত পরিশ্রম করছে এক হাজার একশো একান্ন দিন।

"মানুষের ক্ষমতা কতটুকু আনাস?" নিশান আলতো হেসে প্রশ্ন করে। হাসিতে কোনো তিক্ততা নেই, আছে এক অদ্ভুত বিষাদমাখা প্রশান্তি। "যে আগুন আমার দোকান ও ব্যবসা পুড়িয়েছে, সে আগুন তো কাঠ জ্বালিয়েছে কেবল। আমার বুকের ভেতর যে ঈমান, সেটা তো ছাই করতে পারেনি। তাই না? আমার রব আমাকে ডেকেছেন, পরীক্ষা করেছেন। আমি শুধু অপেক্ষা করছি, তিনি কখন আমায় বলবেন—'নিশান, তোমার পাওনা মিটে গেছে।'' আমি এ নিয়ে এত দুঃখ করি না জানিস? আচ্ছা, তোর রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা পংক্তিটা মনে আছে?
'বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।'
বিশ্বকবি হয়তো কাব্য করে বলেছিলেন। কিন্তু জীবনের এই কণ্টকাকীর্ণ মোড়ে এসে বুঝি— দুঃখ তো আঘাতের মতোই আসে, আর ধৈর্য হলো তার বর্ম।"

আনাস জলভরা চোখে নিশানের দিকে তাকিয়ে বলে "কিন্তু এত কষ্ট সহ্য করা কি মানুষের পক্ষে সম্ভব নিশান? তোকে এভাবে নিঃস্ব হতে দেখে আমার বুকটা ফেটে যায়।"

"কেন সম্ভব নয় আনাস?" নিশান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, পবিত্র কুরআনের সুরাহ্ বাকারার ১৫৬তম আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন—
'وَالَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
আর যখন তারা কোনো বিপদে পতিত হয়, তখন বলে—'নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যই এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।'
আমরা তো তাঁরই আমানত আনাস! তিনি পরীক্ষা করার জন্য সাময়িকভাবে যা দিয়েছেন, তা যদি কেড়ে নেন, তবে বান্দাহর নালিশ করার কিছু থাকে? তাছাড়া হাদিসগ্রন্থ সহীহ্ মুসলিমে এসেছে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'মুমিনের ব্যাপারটি সত্যিই বিস্ময়কর! তার প্রতিটি পরিস্থিতিই তার জন্য কল্যাণকর। যদি সে সুখে থাকে এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, তা তার জন্য কল্যাণকর; আর যদি সে বিপদে পড়ে এবং ধৈর্য ধারণ করে, সেটাও তার জন্য কল্যাণকর।' তাই আমি অসন্তুষ্ট নই আনাস।"

বৃষ্টির তোড় বাড়ছে। টিনের চালে জলের নূপুরধ্বনি রচনা করছে শোকের মহাকাব্য। বাতাস এসে বারান্দার এক কোণ ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আপন মনে। নিশানের হৃদয়ের ভেতরে জমানো বিষাদের দাবানল নেভানোর শক্তি পৃথিবীর কোনো বর্ষার নেই। নিশান চোখ বুজে শুনছে ভারী বৃষ্টির অস্ফুট ক্রন্দন। তার মনে হচ্ছে, এই নিশিরাতে প্রকৃতি যেন কেবল তার একার জন্য অনন্ত বিরহগাথা গাইছে। খাবার সামনে নিয়ে নীরব বসে আছে দুই বন্ধু। একজন সর্বস্ব হারানো নিথর দেহে, অপরজন অপরাধবোধের দেয়াল টপকাতে না পারা অতুষ্ট নয়নে।

মানুষের মন বড় অদ্ভুত এক আঁধার। দুঃখ যখন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে, তখন প্রথম প্রথম সেই ঢেউ মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু তিল তিল করে সহ্যের সীমা যখন অসীমে গিয়ে ঠেকে, তখন সেই দুঃখই হয়ে ওঠে মানুষের ধূলি ধূসরিত অস্তিত্বের চিরন্তন সুর। নিশানের জন্য এই অন্ধকার কেবল আলোর অনুপস্থিতি নয়; এ অন্ধকার এক মায়াময় চাদর, যা তাকে পৃথিবীর কুৎসিত চোখগুলোর থেকে আড়াল করে রাখছে। তালি দেওয়া গামছার কোণা দিয়ে চোখের গড়িয়ে পড়া জলটুকু মুছে নেয় সে। আর নীরবে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যাচ্ছে একে একে। বাবার রেখে যাওয়া স্মৃতিময় ছোট্ট কাঠের দোকান-ঘরটি, যেখানে সে ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে করাত চালানো শিখেছিল। কাঠের মিষ্টি গন্ধ, মিহি ভুসির উড়ন্ত ধুলোবালি, আর সূর্যালোকের কাঁচাসোনা দ্যুতিতে ধূলিকণাদের অলৌকিক নাচ। বাবার কণ্ঠস্বর আজও তার মগজে প্রতিধ্বনি তোলে—"নিশান, কাঠের কাজে ফাঁকি দিবি না। কাঠ কিন্তু মানুষের মন বোঝে। তুই যদি ওরে ভালোবেসে হাত দেস, সে তোরে ছায়া দেবে, তোরে থাকার আশ্রয় দেবে।"
বাবার সেই আশ্বাসবাণী আজ কোথায় হারিয়ে গেছে! কাঠ তাকে ছায়া দেয়নি, বরং পোড়া ছাই হয়ে তার বুকের গহীনে আটকে গেছে।

আনাস তখনও নিঃশব্দে ফুঁপাচ্ছে। নিশান বন্ধুর মাথায় শান্ত হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, "কাঁদিস না আনাস। রোমান দার্শনিক সেনেকা বলেছিলেন—'কঠিন পরিস্থিতি মানুষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য আসে না, বরং তার ভেতরের আসল শক্তিসত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলতে আসে।' কান্না তো পরম করুণাময়ের এক মস্ত বড় নেয়ামত। যে কাঁদতে পারে, তার মন এখনো পাথর হয়ে যায়নি। তুই কাঁদতে পারছিস মানে তোর ভেতরে মানুষটা এখনো বেঁচে আছে। দেখ, কাঁদতে কাঁদতে একদিন চোখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। কেউ চাইলেও এক ফোঁটা জল ফেলতে পারে না।"

"তুই মানুষ নোস নিশান, তুই কোনো সাধারণ মানুষ নোস," আনাস মাথা তুলে নিশানের মুখের দিকে তাকায়। চেহারায় আলোর লেশমাত্র নেই, অথচ কী এক গভীর একত্ববাদের জ্যোতি ফুটে উঠেছে।
"যে লোক তোর এত ক্ষতি করল, তোর জীবনটা ধ্বংস করে দিল, তুই তার ওপর এক ফোঁটা ক্ষোভ রাখিসনি? তোর বুকে কি কোনোদিন প্রতিশোধের আগুন জ্বলে না?"

নিশান হালকা নিঃশ্বাস ফেলে দূরের তমসাচ্ছন্ন বাঁশঝাড়ের দিকে তাকিয়ে বলে। "প্রতিশোধ কার ওপর নেব আনাস? সৈয়দের ওপর? নাকি এই সমাজের ওপর— যারা অন্ধ, যারা সত্যকে দেখেও না দেখার ভান করে? তাদের ওপর কীসের ক্ষোভ? জালিম তো নিজের ওপরই জুুলুম করে। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন—'চোখের বদলে চোখ উপড়ে নেওয়ার নীতি শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বকেই অন্ধ করে দেয়।' আর আমাদের ইসলাম ধর্মে ক্ষমা ও ধৈর্যের মর্যাদা তো সর্বোর্ধে। সুরা আশ-শূরার ৪৩তম আয়াতে আল্লাহ বলেছেন—
'وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَٰلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ'
— আর নিশ্চয়ই যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে, তা তো দৃঢ়সংকল্পেরই কাজ।

আসল বিচার তো অন্য কোথাও তৈরি হচ্ছে আনাস। বিচারক সেখানে বসে আছেন। তিনি যখন পাল্লা মেপে ন্যায়বিচার করবেন, তখন আর কোনো বান্দার আদালতের প্রয়োজন থাকবে না। আমি আমার সমস্ত নালিশ সেই মহান বিচারকের দরবারে সোপর্দ করেছি।"

রাতের গভীরতা বাড়ছে, পৃথিবীর কলরোল থিতিয়ে আসছে ধীরে। আনাস ক্লান্ত শরীরে দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু নিশানের চোখে ঘুম নেই। ঘুম তো বছর তিনেক আগে বন্দিশালার প্রথম প্রহরেই বিলীন হয়ে গেছে। সে উঠে দাঁড়াল। বারান্দার খাঁজ ধরে দাঁড়িয়ে একমুঠো শ্রাবণের ঝরঝর বৃষ্টি নিজের মুখে মেখে নিল। চোখের জল আর বৃষ্টির জল মিলেমিশে একাকার।তার গালের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়া ফোটাগুলো শ্রাবণের ধারা নাকি বহু বছরের সঞ্চিত অবচেতনের অশ্রু— তা পার্থক্য করার মতো কোনো শক্তি আর তার অস্তিত্বে নেই। সে শুধু অনুভূতির অতল গভীরে ডুবে গিয়ে নিজের রবের স্মরণ করে —"ইয়া আল্লাহ, ইয়া সবুর..."

চলবে........