অতঃপর, অনন্তের আলিঙ্গন
একদিন ঠিক এই কোলাহল থেমে যাবে। শহরের ব্যস্ত রাজপথ, চায়ের কাপে জমিয়ে ওঠা আড্ডা, কিংবা হিসেবের খাতায় জমে থাকা না-মেলা অঙ্কগুলো—সব এক নিমিষে পড়ে থাকবে পেছনে। সেদিন সূর্যটা হয়তো রোজকার মতোই ডুববে পশ্চিমের আকাশে, পাখিরা ডানা ঝাপটে ফিরে যাবে তাদের চেনা নীড়ে, শুধু আমার আর ফেরা হবে না এই পরিচিত উঠোনে।
মৃত্যু তো কোনো হিমশীতল অন্ধকার সমাপ্তি নয়; মৃত্যু হলো এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর যাত্রার পর পরম শান্তিতে আপন আশ্রয়ে ফিরে যাওয়া। যেন এক পুরোনো, ধুলোপড়া জীর্ণ পোশাক ছেড়ে নতুন এক শুভ্র চাদর গায়ে জড়ানো। সেদিন রবের ডাকে সাড়া দিয়ে আমি পা বাড়াবো এক অচেনা, অথচ অদ্ভুত রকম চিরচেনা গন্তব্যে। যে নদীর ওপারে কোনো হাহাকার নেই, কোনো হারানোর ভয় নেই, আছে কেবল অনন্ত এক প্রশান্তি আর অসীম নিঃস্তব্ধতা।
হয়তো সেদিন আকাশ কাঁদবে না, পৃথিবী তার আপন নিয়ম মেনেই চলবে। আমার ফেলে যাওয়া চশমা, ডায়েরির পাতা, আর সযত্নে গুছিয়ে রাখা বইগুলো অন্য কারও হাতে উঠবে। যে মানুষগুলো আজ আমায় ছাড়া এক মুহূর্ত ভাবতে পারে না, তারাও সময়ের প্রলেপে একদিন শোক ভুলে হাসতে শিখবে। এটাই তো জগতের নিয়ম। আমরা পৃথিবীতে আসি কেবল চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে। জীবন হলো এক ক্ষণস্থায়ী প্রতীক্ষালয়, আর মৃত্যু হলো সেই কাঙ্ক্ষিত ডাক, যা আমাদের নিয়ে যায় চিরস্থায়ী এক ঠিকানায়।
মাটির এই শরীর আবার ফিরে যাবে তার আদি গন্তব্যে—স্নিগ্ধ, শীতল মাটির বুকে। আর আত্মা? সে তো উড়াল দেবে তার স্রষ্টার সান্নিধ্যে, অসীম মহাকাশের ওপারে। সেদিন পৃথিবীর সমস্ত মোহ, সমস্ত জমানো অভিমান, সব না-পাওয়া এক নিমেষে শূন্যে মিলিয়ে যাবে। কানে ভেসে আসবে কেবল সেই অলৌকিক, হৃদয় জুড়ানো ডাক—"হে প্রশান্ত আত্মা, ফিরে এসো তোমার রবের কাছে, সন্তুষ্ট চিত্তে।"
সেই মহাপ্রস্থানের জন্য আমি প্রস্তুত হচ্ছি, রোজ একটু একটু করে। হয়তো আজ রাতেই, হয়তো বা আরও বহু বসন্ত পেরিয়ে—যেদিন সেই অমোঘ ডাকটি আসবে, সেদিন যেন কোনো পিছুটান না থাকে। সেদিন যেন ঠিকানায় ফেরার আনন্দে একবুক তৃপ্তি নিয়ে হাসিমুখে বলতে পারি, "আমি আসছি। পৃথিবীর সব মোহ আর দেনাপাওনা চুকিয়ে, আমি আসছি আমার অনন্তের ঘরে।"