সাম্প্রতিক সময়ে আবিষ্কার করলাম বানানে বড্ড ভুল করছি । এর কী কী কারণ থাকতে পারে তা নিয়ে ভাবতে যেয়ে প্রথমেই যে বিষয়গুলো মনে এলো-

১. মাতৃভাষা হওয়াতে "পারিই তো " এই ধরণের মনোভাব,

২. তাড়াহুড়ো করে কি-বোর্ড চালানো :

৩. শুদ্ধভাষায় মন্তব্য করার চেয়ে কৌতুক করে মন্তব্য করার সংখ্যা বেশি পরিমাণে হলে তখন শুদ্ধভাষার চর্চা তুলনামুলকভাবে কমে যায়, ফলে বানান ভুলের পরিমাণ বাড়তে থাকে ।

৪. নিয়মিত শুদ্ধভাবে লিখতে চেষ্টা না করা ।

আরো কারণ থাকতে পারে ।


অভ্র কি-বোর্ড :

একবার ফনেটিকে লেখার সময় বানান নিয়ে খুব বিপদে পড়েছিলাম । কিছুতেই সব বানান শুদ্ধভাবে লিখতে পারছিলাম না ! যদিও অনেকেই হয়তো পারেন । আমার মতো যারা ফনেটিকে লিখতে বানান নিয়ে সমস্যায় পড়েন , তারা অভ্র-এর পুরাতন ভার্সন ব্যবহার করে দেখতে পারেন ।

অভ্র ৪.৫.১ ভার্সন-
http://www.mediafire.com/?5v435wp0ccklijy


ইউনিকোড

আমি নিজে ইউনিকোড ব্যবহার করি না, কিন্তু বানান সার্চ দিতে যেয়ে যা পেলাম ভাবলাম আপনাদের কাজে লাগতেও পারে ।

ইউনিকোডে হ্রস্ব ইকার র্বণের পরে দিতে হয়। যেমন : ইউনিকোড লিখতে ই+উ+ন+ি+ক+ে+া+ড।

'আমি' লিখতে হলে এভাবে লিখুন gfmd এখানে আ-কার, ই-কার, ঈ--কার, উ-কার, ঊ-কার, ঋ-কার, এ-কার, ঐ-কার, ও-কার এবং ঔ-কার সবই ব্যঞ্জন বর্ণের পরে হবে।


বিদেশী শব্দে সবসময় হ্রস্ব-ই হবে

দীর্ঘ ঈ উচ্চারণের দীর্ঘত্বের নির্দেশক নয়, বরঞ্চ শব্দটির উৎস ভাষা যে সংস্কৃত - তার নির্দেশক

কাজেই তৎসম না এমন সব শব্দে হ্রস্ব ইকার দিয়ে হবে ।

আর তাই বিদেশী কোন শব্দে দীর্ঘ-ইকার স্বাভাবিক নিয়মেই বসবে না ।

Bangla Academy নিয়ম করেছে যে, বিদেশী শব্দে ঈ-কার হবে না এবং a-এর বাঁকা উচ্চারণে 'অ্যা' হবে যেমন: অ্যাকাডেমি ।

বিদেশী যেসব শব্দের উচ্চারণে ই-টা দীর্ঘ ভাবে হয়, তাদের ক্ষেত্রে কোনটা ব্যবহার করতে হবে, ই নাকি ঈ? যেমন নিউজীল্যান্ড, নাকি নিউজিল্যান্ড? অ্যাশলি নাকি অ্যাশলী?

এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমির বর্তমান নিয়ম হল হ্রস্ব ই ।

অ্যাশলী/অ্যাশলি-র ক্ষেত্রে অ্যাশ্‌লি হতে এমনিতেও কোন বাধা নেই, কারণ লি-টা (ley) ইংরেজিতে দীর্ঘ করে উচ্চারিত হয় না। প্রসঙ্গত, এই -ley টা অন্য ভাবেও ঝামেলা বাধাতে পারে; অনেকে এটাকে "লে" আকারে লেখেন, যেমন - অ্যাশলে। সেটাও উচ্চারণ অনুযায়ী ভুল। Berkley, Ashley, Wembley - এগুলো সবসময় বার্ক্‌লি, অ্যাশ্‌লি, ওয়েম্ব্‌লি - এভাবে লেখা উচিত ।

-ey তে (এবং কখনো কখনো -ay তে) শেষ হয় এরকম সব ইংরেজি নামের ক্ষেত্রেই হ্রস্ব-ইকার ব্যবহার করা উচিত। Surrey - সারি, Murray - মারি, ইত্যাদি।

আর শেষ কথা হচ্ছে বিদেশী ভাষার ক্ষেত্রে হ্রস্ব ইকার হবে ।

নিউ ইয়র্ক, নিউ ক্যাসেল, নিউ মার্কেট, নিউ দিল্লি, নিউজিল্যান্ড,

ইস্টার্ন, স্ট্রিট, স্টিল, গ্রিল, স্টিমার


একই/কাছাকাছি উচ্চারণে ভিন্ন অর্থ


১.

কি:

যেসব প্রশ্নের উত্তর 'হ্যাঁ' বা 'না' দ্বারা দেয়া যায়, সেসব প্রশ্নে 'কি' ব্যবহৃত হবে। যেমন :

তোমার নাম কি জামান?

তুমি কি আজ যাবে?

তুমি কি কেবলই ছবি?

আমি কি আর কারেও ডরাই?

কে জানে, আমি বাঁচব কি না।

কিছু ফেলে গেলেন কি?

একটা ফোন করা যাবে কি?

আমার ছোট তরি, বলো যাবে কি?



কী:

যেসব প্রশ্নের উত্তর 'হ্যাঁ' বা 'না' দ্বারা দেয়া যায় না, সেসব প্রশ্নে এবং বিশেষণ ও ক্রিয়াবিশেষণ হিশেবে বিস্ময়সূচক বাক্যে 'কী' ব্যবহৃত হবে। যেমন :

তোমার নাম কী?

কী খেতে চাও?

কী দিয়ে খেতে চাও?

কীভাবে বুঝলে?

তুমি কীজন্যে যাবে?

পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়!

এ কী!

সে কী!

কী রে? কী খবর?

কী যে ভালো লাগল!

কী নিষ্ঠুর লোকটা!

কী করি আজ ভেবে না পাই!

সে কী না কী মনে করেছে, কে জানে।

গাড়িটা কী দ্রুত চলে গেল!



২.

স্বীকার-মেনে নেয়া, প্রকাশ (কৃতজ্ঞতা স্বীকার), গ্রহণ (নিমন্ত্রণ স্বীকার), সম্মতিদান, অঙ্গিকার (দিতে স্বীকার বা পাওয়া), বরণ, সহ্য করা (দুঃখ স্বীকার)

শিকার-হত্যা, লুন্ঠন প্রভৃতি দুষ্কর্মের লক্ষ্য


৩.

বেশী/বেশিনী = বেশধারণকারী (ছদ্মবেশী, ভদ্রবেশী)

বেশি = আধিক্য


৪.

কালি = লেখার বা ছাপার রঞ্জিত তরল বিশেষ, অন্ধকার, কলঙ্ক

কালী = কালিকা দেবী, চন্ডিকার রূপ বিশেষ


আশীষ (আশিস এর রূপভেদ),

ভুল : স্নেহাশীষ ।
শুদ্ধ : স্নেহাশিস ।


উভয় বানানই হতে পারে

কুমির/কুমীর, বাড়ি/বাড়ী, গাড়ি/গাড়ী, পাখি/পাখী-শুদ্ধ বানান


দীর্ঘ-ঈ কার হবে

সমীচীন, পরীক্ষিত, অণুবীক্ষণ, দূরবীক্ষণ, নীরব


কিছু সন্দেহ থেকে সমাধান :

‘বিদেশী’ না ‘বিদেশি = বিদেশি, বিদেশী

(বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা-৮৭৩)

(সংসদ বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা-৬১৫)



‘দেশী’ না ‘দেশি’ = দেশি, দেশী । তবে অভিধানে 'দেশি' বেশি ব্যবহৃত হতে দেখলাম

(বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা-৬২৪)

(সংসদ বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা-৪২২)


শ্রীলংকা’= শ্রীলঙ্কা (বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান পৃ.-১০৪৬)


‘মালদ্বীপ’ = দ্বীপ এর বানান দীর্ঘ ঈকার দিয়ে (বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃ-৬৩২)



‘কালী’ দেবীর পদ অর্থে লেখা হলেও বানানটা ‘কালিপদ’ লেখা হয় কেন-

কালিপদ শব্দটাও দেখলাম না ।

তবে 'কালিদাস' শব্দে সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে কালী শব্দটি কালি রূপ ধারণ করে ।

প্রাণী এর সঙ্গে কোন শব্দ যুক্ত হলে তখন প্রাণি হবে (বা.এ.ব্য.বা.অ.পৃষ্ঠা-৭৯৪)



সূচিপত্র’ শব্দটিতে ‘পত্র’ বাদে শব্দটি ‘সূচি’ না ‘সূচী’ উভয়ই হতে পারে ।

(বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃ-১১৬৮)


'তৈরি' বানানের অন্য কোন বানান তো দেখলাম না । (বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃ-৫৬৯)



'শহিদ' বা 'শহীদ (বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃ-১০৭২)

'শহীদ্'= আরবি ( সংসদ বাংলা অভিধান, পৃ-৭৭৩)

‘সবজি’, বানানটা ঠিক আছে ।

‘বেঈমান’ = সঠিক রূপ বেইমান ( সংসদ বাংলা অভিধান, পৃ-৬৩৭)

‘গীতাঞ্জলী’, = অভিধানে বানানটা নেই । ইন্টারনেটে দেখলাম ভুল বানানটাই চলছে । তবে মূলটা পেলাম গীতাঞ্জলি এবং গীতাঞ্জলি-ই সঠিক ।


‘পুস্পাঞ্জলী =পুষ্পাঞ্জলি (বা.এ.বা.বা.অ. পৃ-৭৬৩)


রেফারেন্স হিসেবে যে অভিধানগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে :

১. বাংলা একাডেমি (অভিধানে একাডেমী লেখা !)

ব্যবহারিক বাংলা অভিধান

পঞ্চদশ পুনর্মুদ্রণ : জানুয়ারি ২০১২

মূল্য :৪০০ টাকা


২.

"বাংলা একাডেমী

বাঙলা উচ্চারণ অভিধান"

দ্বিতীয় সংস্করণের ষষ্ঠ পুনর্মুদ্রণ : নভেম্বর ২০১১

মূল্য : ৩০০ টাকা

বাংলা একাডেমি থেকে কিনলে ৩০% কমিশনে কিনতে পারবেন ।

এছাড়া আজিজ সুপার মার্কেট বা কনকর্ড এম্পারিয়াম শপিং কমপ্লেক্স থেকে ১০ থেকে ১৫% কমিশনে কিনতে পারবেন ।

৩. বানান অভিধানটি বাজারে সহজলভ্য নয় ...তবে আগ্রহীরা বাংলা একাডেমিতে মাঝে মাঝে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন ।




চলবে...

----------
ভাষা ও সাহিত্য
(Post20131027035336)