তুমি আসবে বলে কল্পনারা
আকাশ ছুঁয়ে ঘর বাঁধল,
একটি মন ভাঙতে ভাঙতে
সহস্রবার নতুন হলো।
বুকের ভেতর ঝড় উঠল,
নিভল আলো, জাগল ক্ষত,
প্রতিটি ভাঙা টুকরো বলল,
এইবার বুঝি শেষ প্রতীক্ষার রাত।
তবু তুমি এলে না।
তুমি আসবে বলে শূন্য বুকে
একটি শহর জন্ম নিল,
পাথরগুলো স্বপ্ন শিখল,
নদীরাও পথ বদলাল।
সভ্যতা গড়ল, সভ্যতা ভাঙল,
ইতিহাসে জমল ধুলো,
সহস্র শতাব্দী পার হয়ে গেল।
তবু তুমি এলে না।
স্বপ্ন একদিন পথ হারিয়ে
নিজের কাছেই ফিরল না,
সময় তার চলার নিয়ম
কোনো অজানায় ভুলে গেল।
তারারাও নীরব হলো,
অপেক্ষা শুধু দাঁড়িয়ে রইল
যে পথে তোমার আসার কথা ছিল।
তবু তুমি এলে না।
যে দরজাতে কান পেতে থাকত
আমার সমস্ত নির্ঘুম রাত,
সেই দরজাতে মাকড়সারা
বুনল বিস্মৃতির জাল।
যে জানালায় চোখ রাখতাম
একটু ছায়ার আশায়,
সেই জানালার কাচে এখন
ধূসর সময় ঘুমিয়ে রয়।
তবু তুমি এলে না।
অপেক্ষাটাকে যত্ন করে
রেখে দিলাম জাদুঘরে,
তার পাশে কিছু শুকনো ফুল,
কিছু চিঠি, কিছু বিকেল।
থেমে যাওয়া একটি ঘড়ি,
একটি দীর্ঘশ্বাসের ছবি,
আর একটি নামহীন ফলক,
লেখা আছে, “এখানে কেউ একজন
কাউকে আসতে বলেছিল।”
তবু তুমি এলে না।
কাচের নিচে বন্দি রইল আমার সমস্ত কাল,
একটি দরজা, একটি সন্ধ্যা, একটি প্রতীক্ষার জাল।
দর্শনার্থীরা দেখল স্মৃতি,
বুঝল না তার ক্ষয়,
কীভাবে একজনের না আসা
আরেকজনের ইতিহাস হয়।
তবু তুমি এলে না।
তুমি এতবার ‘আসব’ বলেছ,
এতবার দিয়েছ কথা,
প্রতিশ্রুতির ঘর্ষণে ক্ষয়ে
গেছে ভাষার সব ব্যাকরণ।
অভিধান থেকে মুছে গেছে
ক্রিয়ার যত রূপ,
'আসব', 'ফিরব', 'থাকব' শব্দ
হারিয়েছে অর্থ, হারিয়েছে ধ্বনি।
শুধু 'অপেক্ষা' শব্দটি রয়ে গেল,
অর্থহীন এক অনন্তকাল হয়ে।
তবু তুমি এলে না।
কতবার ভেবেছি, এবার বুঝি
অপেক্ষারও মৃত্যু হবে,
কতবারই শেষ বলে
নতুন করে শুরু করেছি।
শেষের পরেও শেষ এসেছে,
নিভে গেছে আশার প্রদীপ,
তবু বুকের গোপন ঘরে
কে যেন তোমার পথ চেয়ে রয়।
তবু তুমি এলে না।
হয়তো তুমি আসবে বলে
আমি আসাকেই সত্য ভেবেছি,
হয়তো তোমার অনুপস্থিতিতেই
তোমার অস্তিত্ব এঁকেছি।
যাকে ঘিরে এত আয়োজন,
সে কি আদৌ আসার ছিল?
নাকি আমার নিঃসঙ্গতাই
তোমার মুখের মুখোশ পরেছিল?
আজ আর তোমার আসার খবর
আকাশপানে পাঠাই না,
ভাঙা স্বপ্ন জোড়া দিয়ে
নতুন কোনো শহর গড়ি না।
শুধু জানি, কিছু অপেক্ষা
পূরণের জন্য জন্মায় না,
কিছু মানুষ আসে না বলেই
সারাজীবন থেকে যায়।
তবু যদি কোনো একদিন
সময় ফিরে তাকায় পিছে,
ধ্বংসস্তূপের ধুলোর ভেতর
পায়ের চিহ্ন খুঁজতে গিয়ে,
দেখবে, একটি মানুষ ছিল
যে তুমি আসার আগেই তোমায় চিনত,
তোমার সঙ্গে দেখা না হয়েও
তোমার বিরহে জীবন লিখত।
সেদিন হয়তো তুমি আসবে,
যেদিন আর অপেক্ষা নেই,
দরজা খোলা থাকবে, অথচ
ফিরে তাকানোর অবকাশ নেই।
তোমার হাতে সহস্র প্রতিশ্রুতি,
আমার চোখে নির্বাক ক্ষয়,
তুমি বলবে, “এসেছি অবশেষে”,
আমি হাসব, বলব, “আমি তো নেই!”
কারণ, যে মানুষটি তোমার আশায়
সহস্রবার জন্মেছিল,
তোমার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে
সে মরে গিয়েছিল।
তুমি আসবে বলে পৃথিবী
কতবার যে নতুন হলো,
শুধু আমার ভেতরকার মানুষটি
আর কোনোদিন ফিরল না।
ঋতু ফিরে আসে আবার,
শুষ্ক ডালেও কুঁড়ি ফোটে,
এমনকি ধ্বংসও জানে
কীভাবে আবার শুরু করতে হয়।
শুধু যে হৃদয় একবার
অনন্তকাল ধরে অপেক্ষা করে,
তার কাছে অনন্তকালও একদিন
ভীষণ দেরি হয়ে যায়।
মন্তব্য (3)