বসন্তের নামান্তর
ইসাবেলা আহমেদ
পর্ব: ১

“নিলয়!”

পেছন থেকে ডেকে উঠল সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর। ঘুরে দাঁড়ালাম আমি। ডিপ নেভি ব্লু রঙের একটা শিফন শাড়ি পরেছে প্রতিমা।

ওর গা থেকে ভেসে আসছে এলিজাবেথ আর্ডেনের পারফিউমের ঘ্রাণ। বরাবরের মতোই চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে ওর সৌন্দর্যে। তবে আজ ওকে ভীষণ অচেনা লাগছে। মনের ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ‘অন্য গ্রহের চাঁদ’ গানটা।

প্রতিমা কি তবে অন্য মন্দিরের প্রতিমা?

“সামনের মাসের একুশ তারিখ আমার বিয়ে, জানোই তো। এ ক’দিনে আর শহরে আসতে পারব না। তাই আজই দেখা করতে এলাম।”

বিয়ের কার্ডটা আমার হাতে ধরিয়ে একনাগাড়ে কথা বলে চলল মেয়েটা।

কিন্তু আজ ওর প্রত্যেকটা অক্ষর অবধি আমার বুকে ছুরি চালাচ্ছে।

আমি জানতাম, এরকম কিছুই হবে। তবু কেন মেনে নিতে পারছি না? কোনো কিছু জেনে নেওয়া আর মেনে নেওয়ার পার্থক্য যে এক আলোকবর্ষ, তা আজই প্রথম উপলব্ধি করতে পারলাম।

কার্ডে প্রতিমা মজুমদারের নামের পাশে বিহান লাহিড়ীর নাম থাকাটাই স্বাভাবিক। সেখানে আমার চোখ কেন কার্ডের ওপর নিজের নামটা খুঁজে চলেছে?

ঘটনাটা আসলে খোলসা করে না বললে কিছুই বুঝবেন না পাঠক। তাই একদম শুরু থেকে বলা আমার ওপর ফরজ হয়ে গেছে।

এসএসসিতে ডাব্বা মেরে বাবা-মায়ের কাছে বেশ দাবড়ানি খেতে হচ্ছিল আমাকে। উঠতে-বসতে ‘নালায়েক’ বলে খোঁটা খাওয়াটা আমার রুটিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।

নতুন কোচিংয়ে ভর্তি হলাম। আমার বাবা-মা পারলে শহরের সব কোচিংয়েই আমাকে ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু এভাবে যে ডিরেক্ট ফেল মেরে দেব, সেটা কেউই ভাবেনি!

স্টুডেন্ট হিসেবে আমি খুব একটা খারাপ নই। মগজে ধার আছে, সবাই বলে। তবে সেটা খাটাই কম।

পাঁচজন স্যারের কাছে পড়া, আর সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতেই আমার কাজিন আলিফ ভাইয়ার ব্যাচে পড়তে বসা—সব মিলিয়ে জীবনটা তখন রীতিমতো দুর্বিষহ। ব্যাচের সদস্য আমরা সব কাজিনই।

সারাদিন পড়াশোনা, তার ওপর স্কুলে আবার ক্লাস টেনে থেকে যাওয়ার কারণে স্যারদের খোঁটা—সব মিলিয়ে আমার মনের রং কোথায় যেন উড়ে গেল একেবারে।

তবে সেদিনের একটা ফোনকল আমার মনে আবার বসন্তের আবিরের ছোঁয়া লাগিয়ে দিল।

মা কথা বলছিলেন আমার এক বোনের সঙ্গে। আর আমি ভদ্র ছেলের মতো কানে হেডফোন গুঁজে এলভিস প্রিসলির গান শুনতে শুনতে ত্রিকোণমিতি করছিলাম।

গানের সুর ভেদ করে মায়ের একটা কথা কানে এল।

“প্রতিমা! বেশ নাম তো। হিন্দু নাকি?”

এই দুটো লাইন শুনেই মনের ভেতরকার রোমিওটা উঁকি মারতে শুরু করল।

মনের ধর্মীয় অংশটা সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান দিতে এল—

“হিন্দু মেয়ে, নিলয় সোনা! এত লাফালাফি করে কাজ নেই। আগে নিজের পড়াশোনার দিকে নজর দাও!”

মনের রোমিওটা আবার মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“ধ্যাৎ! এত জ্ঞান কে চেয়েছে তোর থেকে?”

বুঝুন পাঠক, মেয়েটাকে না দেখেই মনের হাল এই! দেখলে না জানি কী হতো!