ষষ্ঠ পর্ব: অভাবের সংসারে ভালোবাসার আলো
হাসপাতালের করিডোরে পায়চারি করছে মূসা। মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ, চোখে অস্থিরতা। কিছুক্ষণ আগেই ডাক্তার জানিয়েছেন, তার বাবার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। নিয়মিত চিকিৎসা ও কিছু পরীক্ষা করাতে হবে।
রৌদ্রময়ী চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে আছে। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকটা ভারী হয়ে উঠছে।
সে ধীরে করে মূসার হাত ধরল।
— চিন্তা করো না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। ইনশাআল্লাহ, আব্বু সুস্থ হয়ে উঠবেন।
মূসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— জানো রৌদ্রময়ী, বাবার অসুস্থতার কথা শুনে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে, তাঁর চিকিৎসার খরচ কীভাবে জোগাড় করব। হাতে তেমন টাকা নেই।
রৌদ্রময়ী স্বামীর হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
— টাকা-পয়সার চিন্তা তুমি একা করো না। আমরা দুজন মিলে একটা ব্যবস্থা করব।
মূসা স্ত্রীর দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু পাশে থাকার দৃঢ়তা।
— তোমাকে অনেক কষ্টের মধ্যে ফেলছি, তাই না?
রৌদ্রময়ী মৃদু হেসে বলল,
— সংসার কি শুধু সুখের নাম? সুখে তোমার পাশে থাকব, আর বিপদে দূরে সরে যাব—এমন স্ত্রী তো হতে চাইনি।
মূসা আর কিছু বলতে পারল না। শুধু স্ত্রীর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
সেদিন রাতেই বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওষুধ লিখে দিলেন। মূসা ওষুধের তালিকাটা হাতে নিয়ে ফার্মেসির দিকে গেল।
ওষুধের দাম শুনে তার মুখটা মলিন হয়ে গেল। হিসাব করে দেখল, হাতে থাকা টাকায় সব ওষুধ কেনা সম্ভব নয়।
সে চুপচাপ ফিরে এসে রৌদ্রময়ীকে বলল,
— কিছু ওষুধ আজই কিনতে হবে। বাকিগুলো কাল কিনব।
রৌদ্রময়ী বুঝতে পারল, মূসা কিছু একটা লুকাচ্ছে।
— সব ওষুধ কেনা যাচ্ছে না?
মূসা একটু ইতস্তত করে বলল,
— টাকা একটু কম পড়ছে। কাল ব্যবস্থা করে ফেলব।
রৌদ্রময়ী নিজের ব্যাগ খুলে ছোট্ট একটা খাম বের করল।
— এখানে কিছু টাকা আছে। আমার জমানো টাকা। কাজে লাগাও।
মূসা অবাক হয়ে তাকাল।
— তুমি টাকা জমিয়েছো?
— হ্যাঁ। ভেবেছিলাম, কোনো প্রয়োজন হলে কাজে লাগবে। আজ তার চেয়ে প্রয়োজনীয় সময় আর কী হতে পারে?
মূসা খামটা নিতে চাইল না।
— না, এটা তোমার জন্য জমিয়ে রেখেছিলে।
রৌদ্রময়ী তার হাতের ওপর খামটা রেখে বলল,
— আমার প্রয়োজন আর তোমার প্রয়োজন আলাদা নয়, মূসা। এই সংসারে আমরা দুজন একসঙ্গে আছি। তাই এই টাকাও আমাদের।
মূসা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের কোণে পানি চিকচিক করছিল।
পরদিন সকালে বাবার অবস্থা কিছুটা ভালো হলো। ডাক্তার জানালেন, নিয়মিত চিকিৎসা চললে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠার আশা আছে।
মূসা কিছুটা স্বস্তি পেলেও আর্থিক চিন্তা তার পিছু ছাড়ল না। হাসপাতালের খরচ, ওষুধ, বাড়ির খরচ—সব মিলিয়ে তার আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠছিল।
কয়েক দিন পর তারা বাবাকে বাড়িতে নিয়ে এল। কিন্তু চিকিৎসা চলতে থাকল।
একদিন রাতে মূসা হিসাবের খাতা খুলে বসেছিল। মাসের আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলাতে গিয়ে দেখল, অনেক কিছুই বাকি থেকে যাচ্ছে।
রৌদ্রময়ী পাশে এসে বসল।
— কী হিসাব করছো?
— সংসারের হিসাব। আয় যত, খরচ তার চেয়ে বেশি।
— তাহলে কিছুদিন একটু বুঝেশুনে চলব।
মূসা মাথা নাড়ল।
— তোমার কোনো শখ পূরণ করতে পারছি না। বিয়ের পর তোমাকে কত কিছু দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। অথচ এখন একটা ভালো শাড়িও কিনে দিতে পারছি না।
রৌদ্রময়ী মৃদু হেসে বলল,
— আমার শখ পূরণ করার জন্য তোমাকে নিজের ওপর এত চাপ নিতে হবে না। তুমি সুস্থ থাকো, আব্বু সুস্থ হন, আর আমাদের সংসারে শান্তি থাকুক—এগুলোই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
মূসা বলল,
— কিন্তু তোমারও তো কিছু ইচ্ছা আছে।
— আছে। তবে সব ইচ্ছা একসঙ্গে পূরণ করতে হয় না। সময় হলে হবে। এখন আমাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে।
রৌদ্রময়ী উঠে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
— আর শোনো, কাল থেকে চায়ের সঙ্গে বিস্কুট কম খাব। সংসারের খরচ বাঁচাতে হবে!
মূসা হেসে ফেলল।
— তোমার বিস্কুটের খরচ বাঁচিয়ে কি সংসার চলবে?
— চলবে না কেন? ছোট ছোট সঞ্চয় থেকেই তো বড় সঞ্চয় হয়!
মূসার মনটা অনেক দিন পর হালকা হলো।
দিনগুলো এভাবেই কাটতে লাগল। রৌদ্রময়ী সংসারের খরচ কমিয়ে দিল। নিজের জন্য নতুন কিছু কেনা বন্ধ করল। অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে চলতে লাগল।
কিন্তু মূসা বুঝতে পারছিল, তার স্ত্রী নিজের অনেক ইচ্ছা বিসর্জন দিচ্ছে।
এক শুক্রবার মূসা অফিস থেকে ফেরার পথে রৌদ্রময়ীর জন্য ছোট্ট একটা ফুলের তোড়া কিনে আনল।
রৌদ্রময়ী ফুলগুলো হাতে নিয়ে অবাক হয়ে বলল,
— এগুলো কেন?
— এমনি।
— টাকা খরচ করলে কেন? এখন তো আমাদের সঞ্চয় করতে হবে।
মূসা হেসে বলল,
— ফুল কিনতে খুব বেশি টাকা লাগে না। কিন্তু তোমার মুখে হাসি ফোটাতে এর চেয়ে ভালো কিছু আমার মাথায় আসেনি।
রৌদ্রময়ী ফুলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
— তুমি জানো, আমার সবচেয়ে পছন্দের উপহার কী?
— কী?
— তুমি যখন আমার পাশে বসে বলো, সব ঠিক হয়ে যাবে।
মূসা তার হাত ধরে বলল,
— ইনশাআল্লাহ, সব ঠিক হয়ে যাবে।
এদিকে মূসার বাবার শারীরিক অবস্থাও ধীরে ধীরে উন্নতি করতে লাগল। একদিন দুপুরে তিনি রৌদ্রময়ীকে কাছে ডেকে বললেন,
— মা, তুই আমার ছেলের জন্য অনেক কিছু করছিস। আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক।
রৌদ্রময়ী বিনয়ের সঙ্গে বলল,
— এসব বলবেন না আব্বু। আপনি আমারও বাবা।
বৃদ্ধ মানুষটি চোখ মুছলেন।
— সংসারটা ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখিস মা। অভাব আসবে, কষ্ট আসবে, কিন্তু একে অপরের প্রতি সম্মান আর বিশ্বাস যেন কখনো হারিয়ে না যায়।
রৌদ্রময়ী মাথা নেড়ে বলল,
— দোয়া করবেন, আব্বু।
সেদিন রাতে মূসা বাবার কথাগুলো শুনে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি না থাকলে হয়তো এত কিছু সামলাতে পারতাম না।
রৌদ্রময়ী হেসে বলল,
— আমি একা কী করেছি? তুমিও তো আমার পাশে আছো।
— কিন্তু তুমি নিজের কত কিছু ছেড়ে দিলে!
— সংসার করতে গেলে কখনো তুমি ছাড় দেবে, কখনো আমি। এভাবেই তো দুজনের জীবন সুন্দর হয়।
মূসা স্ত্রীর কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল,
— আল্লাহ আমাকে তোমার মতো একজন জীবনসঙ্গী দিয়েছেন, এটাই আমার সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।
রৌদ্রময়ী লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করল।
দিনের পর দিন অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও তাদের ভালোবাসা কমেনি। বরং প্রতিটি কষ্ট তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
তবে একদিন সকালে রৌদ্রময়ী হঠাৎ অসুস্থ বোধ করল। মাথা ঘুরছিল, শরীর দুর্বল লাগছিল। মূসা চিন্তিত হয়ে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেল।
প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে চিকিৎসক মুচকি হেসে বললেন,
— অভিনন্দন। আপনারা বাবা-মা হতে চলেছেন।
কথাটা শুনে মূসা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর অবিশ্বাসের চোখে রৌদ্রময়ীর দিকে তাকাল।
রৌদ্রময়ীর চোখে আনন্দের অশ্রু।
মূসা ধীরে করে তার হাত ধরল।
— সত্যি, রৌদ্রময়ী? আমাদের ঘরে নতুন অতিথি আসবে?
রৌদ্রময়ী মাথা নেড়ে বলল,
— হ্যাঁ।
মূসা আনন্দে স্ত্রীর কপালে চুমু দিল।
— আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমাদের কত বড় নিয়ামত দিলেন!
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে দুজনের মুখে হাসি ছিল। অভাবের সংসারে নতুন অতিথির আগমনের সংবাদ যেন এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দিল।
তবে আনন্দের পাশাপাশি মূসার মনে নতুন দায়িত্বের চিন্তাও জাগল। বাবার চিকিৎসা, সংসারের খরচ, অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হবে।
রাতে রৌদ্রময়ী মূসার কাঁধে মাথা রেখে বলল,
— কী ভাবছো?
মূসা মৃদু হেসে বলল,
— ভাবছি, আমাদের ছোট্ট পৃথিবীতে আরেকজন আসছে।
— ভয় লাগছে?
— একটু। দায়িত্ব অনেক বেড়ে যাবে।
রৌদ্রময়ী তার হাত ধরে বলল,
— ভয় পেয়ো না। আমরা দুজন মিলে সব সামলে নেব। আল্লাহ ভরসা।
মূসা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি পাশে থাকলে কঠিন পথও সহজ মনে হয়।
বাইরে তখন রাতের নীরবতা। ছোট্ট ঘরের ভেতর দুজন মানুষ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে।
তাদের হাতে হয়তো অনেক টাকা নেই, বড় কোনো আয়োজন নেই, বিলাসিতার জীবনও নেই। কিন্তু আছে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, সম্মান আর ভালোবাসা।
আর সেই ভালোবাসাই তাদের অভাবের সংসারে সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো হয়ে জ্বলছে।
চলবে...

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।