তৃতীয় পর্ব: যে অভিমান মুখে বলা যায় না
সকালের আলো ধীরে ধীরে জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে প্রবেশ করছে। মূসা ঘুম থেকে উঠে দেখল, রৌদ্রময়ী বিছানায় নেই। সাধারণত এই সময়টায় সে ঘুম থেকে উঠে চা বানায়, কখনো মূসাকে ডাকে, আবার কখনো নিজেই এসে ঘুম ভাঙায়। কিন্তু আজ ঘরটা কেমন নীরব।
মূসা বিছানা ছেড়ে বাইরে এসে দেখল, রৌদ্রময়ী রান্নাঘরে ব্যস্ত। চুলার ওপর চায়ের পানি ফুটছে। অথচ তার মুখে সেই চেনা হাসিটুকু নেই।
মূসা পেছন থেকে ডাকল,
— সুপ্রভাত, প্রিয়তমা!
রৌদ্রময়ী পেছনে না ফিরেই বলল,
— হুম।
মূসা একটু অবাক হলো।
— কী ব্যাপার? আজ আমার জন্য কোনো হাসি নেই?
— হাসি তো আর সব সময় আসে না।
— তাই নাকি? তাহলে আজ সূর্যটা পশ্চিম দিক থেকে উঠেছে বুঝি!
রৌদ্রময়ী কোনো উত্তর দিল না।
মূসা কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল।
— কী হয়েছে তোমার?
— কিছু হয়নি।
— এই ‘কিছু হয়নি’ কথাটার আড়ালে যে অনেক কিছু থাকে, সেটা আমি জানি।
রৌদ্রময়ী এবার ঘুরে তাকাল।
— সবকিছু জানার দরকারও নেই।
কথাটা শুনে মূসা থমকে গেল। সে বুঝতে পারল, স্ত্রীর মনে কোনো একটা বিষয় জমে আছে। কিন্তু কী সেই অভিমান, তা বুঝতে পারছে না।
চা খেয়ে মূসা অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। যাওয়ার আগে রৌদ্রময়ীর কাছে এসে বলল,
— দুপুরে ফোন দেব। নিজের যত্ন নিও।
রৌদ্রময়ী শুধু মাথা নাড়ল।
মূসা দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল। মনে হলো, কিছু একটা বলতে চায় রৌদ্রময়ী। কিন্তু সে কিছু বলল না। মূসাও আর জোর করল না।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর রৌদ্রময়ী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
গত রাতের সেই বার্তাটা তার মাথা থেকে কিছুতেই সরছিল না। আরিফ আবার ফোন করেছে। শুধু ফোনই নয়, দেখা করার জন্যও বার্তা পাঠিয়েছে। সে জানে, তার সঙ্গে দেখা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তবুও মনের ভেতর একটা অস্বস্তি কাজ করছে।
মূসাকে সবকিছু খুলে বলবে কি না, এই দ্বিধাতেই সে অস্থির হয়ে আছে।
অন্যদিকে অফিসে বসেও মূসার মন কাজে বসছিল না। সকালে রৌদ্রময়ীর আচরণ তার মনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সে কয়েকবার ফোন করার কথা ভেবেও শেষ পর্যন্ত করেনি। হয়তো রৌদ্রময়ীর একটু একা থাকা দরকার।
দুপুরে মূসা ফোন করল।
— কী করছো?
— কিছু না।
— খেয়েছো?
— হ্যাঁ।
— শরীর কেমন?
— ভালো।
মূসা একটু থেমে বলল,
— আমার ওপর রাগ করেছো?
রৌদ্রময়ী অবাক হয়ে বলল,
— তোমার ওপর রাগ করব কেন?
— জানি না। সকাল থেকে তোমাকে কেমন যেন লাগছে।
— তুমি অযথা চিন্তা করছো।
— হতে পারে। কিন্তু তোমার মন খারাপ থাকলে আমারও ভালো লাগে না।
রৌদ্রময়ী চুপ করে রইল।
মূসা আবার বলল,
— আচ্ছা, বিকেলে একটু আগে ফিরব। একসঙ্গে কোথাও বসে চা খাব?
— তোমার কাজ থাকলে করো। আমার জন্য তাড়াহুড়ো করতে হবে না।
— আমার কাজের চেয়েও তুমি গুরুত্বপূর্ণ।
কথাটা শুনে রৌদ্রময়ীর চোখ ভিজে উঠল। সে দ্রুত চোখ মুছে বলল,
— আচ্ছা, পরে কথা বলি।
ফোন রেখে সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
বিকেলের দিকে মূসা বাসায় ফিরল। হাতে ছোট্ট একটি প্যাকেট। ঘরে ঢুকেই বলল,
— আমার প্রিয়তমার জন্য একটা ছোট্ট উপহার এনেছি।
রৌদ্রময়ী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল।
— কী এনেছো?
— নিজেই খুলে দেখো।
প্যাকেট খুলে রৌদ্রময়ী দেখল, তার পছন্দের একটি বই। বইটির নাম দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
— এটা তুমি কোথায় পেলে?
— সেদিন তোমাকে বইটার কথা বলতে শুনেছিলাম। মনে ছিল।
রৌদ্রময়ী বইটা হাতে নিয়ে মূসার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর বলল,
— তুমি এত কিছু মনে রাখো কীভাবে?
— তোমার পছন্দের বিষয়গুলো মনে রাখা আমার দায়িত্ব।
রৌদ্রময়ী আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে মূসার কাছে এসে দাঁড়াল।
— মূসা, একটা কথা বলব?
— বলো।
— তুমি কি কখনো মনে করো, আমি তোমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছি?
মূসা একটু অবাক হলো।
— এমন প্রশ্ন কেন?
— এমনি জানতে চাইলাম।
মূসা শান্ত গলায় বলল,
— মানুষের জীবনে কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি থাকতেই পারে। সব স্মৃতি একদিনে বলা সম্ভবও নয়। তবে এমন কিছু যেন না থাকে, যা আমাদের বিশ্বাসের ক্ষতি করে।
রৌদ্রময়ী মাথা নিচু করে বলল,
— যদি আমার অতীতের কোনো ঘটনা তোমাকে কষ্ট দেয়?
মূসা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— সত্যিটা শুনে কষ্ট পাওয়া আর মিথ্যা জেনে ভেঙে পড়া এক কথা নয়, রৌদ্রময়ী। আমি চাই, তুমি আমার কাছে সত্যি কথা বলতে ভয় না পাও।
কথাগুলো রৌদ্রময়ীর হৃদয়ে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেল।
সে বলতে চাইল, আরিফ আবার যোগাযোগ করেছে। কিন্তু ঠিক তখনই তার ফোনে একটি কল এল।
স্ক্রিনে সেই পরিচিত নাম।
আরিফ।
রৌদ্রময়ী তাড়াতাড়ি ফোনটা উল্টে রাখল।
মূসা বিষয়টা লক্ষ করল।
— কার ফোন?
— একজন পরিচিতের।
— ধরবে না?
— না। পরে কথা বলব।
মূসা আর কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখে এবার কৌতূহলের পাশাপাশি সামান্য উদ্বেগও দেখা গেল।
রাতের খাবারের পর দুজন বারান্দায় বসেছিল। বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে। রৌদ্রময়ী চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
মূসা বলল,
— জানো, সংসারে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় কী?
— কী?
— যখন দুজন মানুষ পাশাপাশি থেকেও নিজেদের মনের কথা বলতে পারে না।
রৌদ্রময়ী ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
মূসা আবার বলল,
— আমি চাই না, আমাদের মধ্যে এমন কোনো দেয়াল তৈরি হোক, যেটা আমরা নিজেরাই দেখতে পাব না।
রৌদ্রময়ীর চোখে পানি চলে এল।
— আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।
— তাহলে কষ্টটা একা বহন করছো কেন? আমাকে একটু ভাগ দাও।
রৌদ্রময়ী মূসার হাত ধরে বলল,
— তুমি আমাকে ভুল বুঝবে না তো?
— আগে তোমার কথাটা শুনি। তারপর বুঝব।
কিন্তু সে রাতে রৌদ্রময়ী আর কিছু বলতে পারল না। তার ভেতরে ভয়, সংকোচ আর দ্বিধা একসঙ্গে কাজ করছিল।
মূসা তাকে জোর করল না। শুধু পাশে বসে রইল।
ঘুমানোর আগে রৌদ্রময়ী ফোনটা হাতে নিল। আরিফের পাঠানো নতুন বার্তাটি খুলল।
“তোমার স্বামীকে সবকিছু বলার আগে আমার সঙ্গে একবার দেখা করো। এমন একটা সত্যি আছে, যেটা তোমার জানা দরকার।”
বার্তাটি পড়ে রৌদ্রময়ীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সে ফোনটা বন্ধ করে দিল।
পাশে ঘুমিয়ে থাকা মূসার দিকে তাকিয়ে তার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল—
আরিফ এমন কী সত্যি জানে, যা এত বছর পরও তার জীবনে ফিরে আসতে চাইছে?
আর মূসা কি কখনো জানতে পারবে, তার প্রিয়তমা স্ত্রীর নীরবতার আড়ালে কতটা ভয় আর অভিমান জমে আছে?
চলবে...

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।