প্রথম পর্ব: শীতের ভোরে এক মুঠো ভালোবাসা

শীতের ভোর। চারপাশে তখনো কুয়াশার পাতলা চাদর বিছানো। জানালার ফাঁক দিয়ে হিমেল বাতাস ঘরে ঢুকছে। বাইরে পাখিরা সবেমাত্র জেগে উঠেছে। অথচ ঘরের ভেতর তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন রৌদ্রময়ী।

মূসা ফজরের নামাজ শেষ করে ঘরে ফিরল। জায়নামাজটা ভাঁজ করে এক পাশে রেখে কিছুক্ষণ স্ত্রীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

রৌদ্রময়ীর মুখে এক অদ্ভুত মায়া। এলোমেলো চুলগুলো কপালের ওপর ছড়িয়ে আছে। শীতের সকালে কম্বলের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে সে।

মূসা মৃদু হেসে কাছে গিয়ে ডাকল,

— এই যে, মহারানী! আর কত ঘুমাবে?

রৌদ্রময়ী কোনো উত্তর দিল না। বরং কম্বলটা মাথার ওপর টেনে নিল।

মূসা আবার ডাকল,

— শুনছো? সকাল হয়ে গেছে। ফজরের নামাজের সময়ও পেরিয়ে গেল।

কম্বলের ভেতর থেকেই ঘুমজড়ানো কণ্ঠে রৌদ্রময়ী বলল,

— তুমি নামাজ পড়ে এসেছো, আমি একটু পরে পড়ব। এখন আমাকে ঘুমাতে দাও।

মূসা মুচকি হেসে বলল,

— একটু পরে বলতে বলতে যদি সূর্য মাথার ওপর উঠে যায়?

— উঠুক না! সূর্যকে বলে দিও, আজ একটু দেরি করে উঠতে।

কথাটা শুনে মূসা হেসে ফেলল।

— বাহ! সূর্যও এখন তোমার কথা শুনে চলবে?

রৌদ্রময়ী কম্বলের ভেতর থেকে মুখ বের করে বলল,

— কেন, আমি কি এতটুকু আবদার করতে পারি না?

মূসা বিছানার পাশে বসে তার কপাল থেকে এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল।

— পারো তো। তোমার আবদার পূরণ করতেই তো আমার এত আয়োজন।

রৌদ্রময়ী এবার চোখ খুলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি।

— তাহলে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসো।

— চা বানিয়ে দেব, কিন্তু তার আগে ওঠো।

— না, আগে চা।

— আচ্ছা, তাহলে চা-ই বানিয়ে আনি। তবে শর্ত আছে।

— কী শর্ত?

— চা খেয়ে আমার সঙ্গে একটু ছাদে যাবে। অনেক দিন তোমাকে নিয়ে শীতের সকালটা দেখা হয়নি।

রৌদ্রময়ী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— ঠিক আছে। তবে চায়ের সঙ্গে বিস্কুটও চাই।

মূসা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

— জি, মহারানী। আপনার হুকুম মাথা পেতে গ্রহণ করলাম।

রৌদ্রময়ী হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর মূসা দুটো কাপ হাতে ঘরে ফিরে এল। এক কাপ চা স্ত্রীর হাতে দিয়ে নিজেও পাশে বসে পড়ল।

রৌদ্রময়ী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,

— জানো মূসা, শীতের সকাল আমার খুব ভালো লাগে।

— কেন?

— চারপাশটা কেমন শান্ত থাকে। মনে হয় পৃথিবীটা একটু থেমে গেছে। কেউ কোথাও ছুটছে না, কোনো তাড়া নেই। শুধু তুমি আর আমি—এক কাপ চা আর অনেকটা সময়।

মূসা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

— আমারও শীতের সকাল ভালো লাগে।

— কেন?

— কারণ এই সময়টায় তোমাকে সবচেয়ে বেশি আপন মনে হয়। ঘুমভাঙা মুখ, এলোমেলো চুল, অভিমানে ভরা চোখ—সব মিলিয়ে আমার পুরো পৃথিবীটা যেন এই ছোট্ট ঘরেই আটকে থাকে।

রৌদ্রময়ী লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।

— তুমি না, একদম অসহ্য!

— কেন? সত্যি কথা বলাও এখন অপরাধ?

— এত মিষ্টি কথা বলো কীভাবে?

— তোমাকে ভালোবাসি বলেই হয়তো।

কথাটা শুনে রৌদ্রময়ী আর কিছু বলল না। শুধু মৃদু হেসে চায়ের কাপে চুমুক দিল।

চা শেষ করে দুজন ছাদে উঠল। চারদিকে তখনো কুয়াশা। দূরের গাছপালাগুলো অস্পষ্ট দেখাচ্ছে। ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে রৌদ্রময়ী দুই হাত দিয়ে শালটা ভালো করে জড়িয়ে নিল।

মূসা পাশে এসে দাঁড়াল।

— ঠান্ডা লাগছে?

— একটু।

মূসা নিজের গায়ের চাদরটা খুলে রৌদ্রময়ীর কাঁধে জড়িয়ে দিল।

— এবার?

রৌদ্রময়ী মুচকি হেসে বলল,

— এবার ভালো।

কিছুক্ষণ দুজন নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর রৌদ্রময়ী মূসার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আচ্ছা, একটা কথা বলবে?

— বলো।

— বিয়ের এত দিন পরেও কি আমাকে আগের মতোই ভালোবাসো?

মূসা অবাক হয়ে তাকাল।

— হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?

— এমনি। জানতে ইচ্ছে হলো।

মূসা একটু কাছে এসে বলল,

— ভালোবাসা কি শুধু বিয়ের আগের অনুভূতি? বিয়ের পর তো ভালোবাসার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। আগে তোমাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, আর এখন প্রতিদিন তোমাকে ভালো রাখার স্বপ্ন দেখি।

রৌদ্রময়ীর চোখে মায়া জমল।

— যদি কোনো দিন আমি বদলে যাই?

— তাহলে নতুন করে তোমাকে চিনব।

— যদি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করি?

— অভিমান ভাঙাব।

— যদি খুব রাগ করি?

— চুপচাপ পাশে বসে থাকব।

— আর যদি কখনো তোমার ওপর বিরক্ত হয়ে যাই?

মূসা হেসে বলল,

— তাহলে সেদিন তোমার পছন্দের খাবার রান্না করে খাওয়াব। তবে রান্না ভালো না হলে আমাকে ক্ষমা করতে হবে।

রৌদ্রময়ী এবার হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,

— তোমার রান্না খাওয়ার চেয়ে না খেয়ে থাকাই ভালো!

— এই তো! ভালোবাসার প্রতিদান!

দুজনের হাসিতে শীতের সকালটা যেন আরও উষ্ণ হয়ে উঠল।

হঠাৎ রৌদ্রময়ী মূসার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,

— জানো, আমার খুব বেশি কিছু চাওয়ার নেই। দামি বাড়ি, গাড়ি, গয়না—এসব না থাকলেও চলবে। শুধু চাই, জীবনের প্রতিটি সকাল তোমার পাশে কাটুক।

মূসা তার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে বলল,

— ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ যেন আমাদের একে অপরের জন্য রহমত বানিয়ে রাখেন। সুখে-দুঃখে, অভাবে-প্রাচুর্যে—সব অবস্থায় যেন আমরা একে অপরের পাশে থাকতে পারি।

রৌদ্রময়ী মাথা নিচু করে বলল,

— আমিন।

সেদিনের শীতের সকালটা খুব সাধারণ ছিল। ছিল না কোনো বিশেষ আয়োজন, ছিল না কোনো দামি উপহার। ছিল শুধু দুজন মানুষের ভালোবাসা, কিছু মিষ্টি কথা আর একে অপরকে আগলে রাখার ছোট্ট প্রতিশ্রুতি।

মূসা জানত না, সামনে তাদের জীবনে কত রকম পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। রৌদ্রময়ীও জানত না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ছোট্ট সংসারে কত নতুন গল্প জমা হবে।

তবে তারা দুজনেই জানত—যত দিন একে অপরের হাত ধরে থাকতে পারবে, তত দিন পৃথিবীর কঠিন পথও তাদের কাছে সহজ মনে হবে।

কারণ সংসার শুধু এক ছাদের নিচে বসবাসের নাম নয়; সংসার হলো দুটো হৃদয়ের একসঙ্গে পথচলা।

আর সেই পথচলার শুরুটা হয়েছিল এক শীতের ভোরে—এক কাপ চা, এক মুঠো ভালোবাসা আর প্রিয় মানুষটির হাত ধরে।

চলবে...