এখন আর কোনো ধরনের কোলাহল নাই। নীরব পরিবেশ, বাস দ্রুতগতিতে ছুটে চলছে ফেনীর অভিমুখে। স্বস্তিতে বসলাম সেই মায়ের সামনের আসনে। হিজাব ও নেকাব পরা মা নীরবে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছে। আমি বেশ কয়েক বার পিছনে ফিরে দেখলাম উনাদের। তাতে সেই আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মা অত্যন্ত অস্বস্তিবোধ করে। খুব মন চাইলো এই মায়ের নেত্র জল স্পর্শ করতে। হাতে নিয়ে দেখতে এই জল কী আমার আম্মার কান্নার জলের অবিকল। কিন্তু আমার মা কখনো কী কান্না করেছে,চির অজানা।

বৃষ্টির এই দিনেও প্রচণ্ড গরমে কাচ ভাঙ্গা জানালার বাতাস যেনো অমিয়। কপালের ঘাম চোখে পড়ার আগেই লেজার করা ডান চোখ টিস্যু দিয়ে চেপে ধরি। মায়ের কথা মনে পড়তেই টপটপ জল গড়িয়ে পড়ে বুকে। জগন্নাথ দীঘির স্বচ্ছ জল কুল কুল করে কিনারায় মিশে।

ছাত্র জীবনে ঘুরতে অনেকবার এসেছি এই দিঘীর পাড়ে। উত্তর পাশে বিজিবি ক্যাম্প। পাড়ে সুন্দর কাঁঠাল গাছ এবং যাত্রী চাউনি। এই দিঘীর গল্প বলতাম মাকে। মা মুখ চেপে হাসতো। আজ আমার মা অদৃশ্য এই পৃথিবীতে আরেক মা ব্যথিত হৃদয়ে বাস হতে নামে জগন্নাথ পাড়ে। খুবই ইচ্ছে হলো দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে জলের সাথে একটু মায়ের গল্প করি।

টাকা রাখার জন্য ব্যাংক খুঁজে পাওয়া সহজ।
স্বর্ণপাতি রাখার জন্য লকার খুঁজে পাওয়াও সহজ। কিন্তু মনের গোপন কথা গোপন ব্যথা খুলে বলার জন্য সঠিক মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মা তো খুঁজে পাওয়া যাবে না কখনোই।

পাশের আসনের এক দম্পতি আমাকে ধন্যবাদ দিলো। বললো বাসে উঠার পর হতে এতিম ভাগিনাকে অশ্রাব্য ভাষায় অশ্লীল বকাবকি শুরু করে। আমার কারণে বন্ধ হয় অশালীন বকাঝকা। আসলে আমাদের দেশে বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটে যৌথ পরিবারে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কারণে অশান্তি নেমে আসে। এটা এক সময় এতটা প্রকট আকার ধারণ করে যে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে পর্যন্ত যায়। তাই এখন মানবতা ও ভদ্রতা বিলীন হতে চলেছে। আসলে মানুষের চাহিদা যেমন বেড়েছে তেমনি এই চাহিদার ভিন্নতাও বেড়েছে। সাথে যোগ হয় ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক ও সামাজিক কারণ।

বাস এসে মহীপাল থামে,মোবাইলটায় দেখি এখনো প্রচুর সময় বাকি জুমার নামাজ হতে। রোদের ঝলকানি ফটো স্নানগ্লাস অসহনীয়। শহরে থাকতে ইচ্ছে করলো না। গ্রামে ছুটে যাই নামাজ পথে কোনো মসজিদে আদায় করবো। (বাকি)