সিডর
২০০৭ সালে আমি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের মনিটরিং অফিসার পদে কর্মরত। উক্ত প্রকল্পের দায়িত্বপালনের সুবাদে ইতোমধ্যে আমি হবিগঞ্জ, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, বগুড়া, গাইবান্দা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ভ্রমন করা, সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যাক্তিবর্গ, বিভিন্ন কর্মশালা, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সাথে সরাসরি মেশার সুযোগ হয়েছে। পরবর্তীতে উক্ত প্রকল্পের মেয়াদাবসান ও নতুন আরেকটি প্রকল্পে প্রকল্প কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করি। এ সুবাদে বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে কাজ করার সুযোগ হয়। সরকারী ও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের ৫৩টি জেলা ভ্রমণ করেছি। উক্ত প্রকল্প দুটির কোনটিই স্থায়ী না হলে ও আমি ব্যাক্তিগকভাবে ঋণী। কারন দেশ ভ্রমণ ও অভিজ্ঞতা অর্জনের এমন সূযোগ আর কোনভাবেই পাবো না।
নভেম্বর ২০০৭ মাসের ট্যুর অর্ডার পাওয়ার পরই আমি বরগুনা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। প্রথমে বরগুনার পাথরঘাটা হতে শুরু করে দক্ষিন হতে উত্তরে পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরিশাল হয়ে ঢাকায় ফেরার চিন্তা করি। ১১ নভেম্বর ঢাকা হতে রওয়ানা হয়ে যাত্রাপথে সিদ্ধান্ত বদলে বরিশালে নেমে ঝালকাঠি যাই। প্রথম সিদ্ধান্ত আগে বাস্তবায়িত হলে সিডরের কবল হতে বেঁচে আসা সম্ভব হত না। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। ১2 নভেম্বর আমি ঝালকাঠির নলছিটিতে পরিদর্শণ কার্যক্রম সম্পন্ন করে সেখানেই রাত্রিযাপন করি। রাতে আমার স্ত্রী ফোন করে বলে যে বঙ্গোপসাগরে নাকি নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে। আমি যেন ঢাকায় ফিরে আসি। গনমাধ্যমে এই দুর্যোগের খবর সরাসরি না পড়া ও স্ত্রীর উদ্বেগকে অহেতুক মনে করার ফলে বরাবরের মতো সবকিছু ছাড়িয়ে অর্পিত দায়িত্ব পালনের দিকে ধাবিত হই। ১৩ নবেম্ভর নলছিটি হতে নলছিটি, বেকুটিয়া ফেরি, গাবখান সেতুর উপর দিয়ে পিরোজপুর পৌছি। পিরোজপুর শহরে একটি হোটেলে উঠলাম। মন্ত্রী পদমর্যাদার (অন্তর্বতীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা) কোন এক সরকারী আমলার আগমনে সার্কিট হাউজে সেদিন বরাদ্ধ মেলেনি। মাঠ পর্যায়ের কাঊকে সেদিন পাইনি বলে আর পরিদর্শন করা গেল না। সন্ধ্যায় সংবাদ বুলেটিনে জানা গেল যে, নিম্নচাপটি শক্তিশালী হয়ে স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসছে। ক্রমে মহাবিপদ সংকেতটি ১০ (দশ) নম্বর নৌহুশিয়ারী মহাবিপদ সংকেতে পরিনত হয়। নভেম্বর 1৪ দুপুর হতেই বৃষ্টিসহ দমকা হাওয়া শুরু হয়। বাতাসের গতি ক্রমেই বাড়তে থাকে। পিরোজপুরের কোন মাঠকর্মী আমার সাথে না থাকায় ঝালকাঠির কাশেম আমাকে তাৎক্ষনিক ঢাকায় ফেরার পরামর্শ দেন। আমি বিলম্ব না করে ঢাকায় ফেরার উদ্দেশ্যে বরিশালগামী একটা বাসে উঠে পড়ি। তখন বিকেল হয়ে পড়েছে। বরিশাল হতে ঢাকার বাস পাওয়া অনিশ্চিত। তথাপি সিডরের তীব্রতা পিরোজপুর হতে বরিশালে কিছুটা কম হতে পারে মনে করি। বেকুটিয়া ফেরী পারাপারের সময় খুব ভয় করছিল। ফেরীটি ঢেউয়ের মধ্যে পড়েছিল। সন্ধ্যায় বরিশাল পৌছি। বাতাসের গতিবেগের সাথে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। জানতে পারলাম ইতোমধ্যে ঢাকার সাথে বরিশালের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফেরী ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় দূর্যোগ মোকাবেলায় অভিজ্ঞদের মতে শক্তিশালী সিডর বরিশালে ও নির্মম আঘাত হানবে। আমি বরিশাল শহরের বিবির পুকুড়ের পাড়ে একটি হোটেলে উঠলাম। বৃষ্টি আর বাতাসের গতি ক্রমে বেড়েই চলছে। রাত সাড়ে এগারটার দিকে সিডর আঘাত হানে বরিশালে। মনে হল একটা বিকট শব্দ যেন মহাকাশে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে গ্রহ নক্ষত্র চূর্ণ বিচর্ণ করে যাচ্ছে সেই সাথে এ হোটেল ভবনটি দোল খাচ্ছে। মনে হল আজ কেয়ামত হবে ! আজ আমার জীবনের শেষদিন! চার্জ না থাকায় স্ত্রীর মোবাইল ফোন বন্ধ। সরকারী কর্তব্য পালন করতে গিয়ে আমার জীবন হুমকির মুখে পড়ল। আমাদের দায়িত্ব মাসে বিশ (২০) দিন মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন জেলায় প্রকল্প কার্যক্রম সম্পাদন করা, দশ (১০) দিন ঢাকায় অবস্থান করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা ও মাসিক মনিটরিং সভায় যোগদান করা। সেই রাতে আমার সান্তনার একমাত্র অবলম্বন আমার মোবাইল ফোন আর সুদুঢ় সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতে জেগে থাকা আমার জনমদুঃখিনী মা । গ্রামীনফোনকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই; প্রলয়ংকরী সিডরের রাতে এক মুহুর্তের জন্য মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। এ যেন সিডরের তান্ডবের সাথে গ্রামীনফোন নেটওয়ার্কের মল্লযুদ্ধ। আমি বিচলিত হয়ে পায়চারি করছি আর বার বার মাকে ফোন করছি। মা আমার জন্য আল্লার কাছে আমার প্রাণভিক্ষা চাইছেন। লা ইলাহা ইল্লা আন্তা…….মিনাজজোয়ালিমিন বাক্যটি অনর্গল জপে যাচ্ছি। সারারাত ঘুমায়নি। রাত তিনটার পরে সিডরের গতি কমে যায়। পরদিন সকালে বরিশাল সার্কিট হাউজে উঠি। সেদিন জাতীয়গ্রিড অচল হয়ে পড়ায় সারাদেশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিকেলে গ্রামীনফোনের উদ্যোগে জেনারেটর দিয়ে মোবাইল ফোন চার্জ করার ব্যবস্থা করা হলে সকলে সেখানে ভীড় করে। আমি অ সেখান থেকে মোবাইল চার্জ করে আনি। বিকেলে গেলাম বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ ক্যাম্পাসে। ঐতিহ্যবাহী এই কলেজটি দক্ষিণাঞ্চলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঘাতক সিডর কলেজ ক্যাম্পাসে অ আঘাত হানে। বড় বড় গাছ দুমঢ়ে মুচড়ে পড়ে আছে। এতকিছুর পরে ও ক্যাম্পাসে তরুণ তরুণীদের প্রণয়দৃশ্য চোখে পড়ার মতো। ঘুরে ঘুরে দেখলাম কলেজ ক্যাম্পাস। রাতে পরিষ্কার আকাশের রূপালি চাঁদ দেখি সার্কিট হাউজের বারান্দায় বসে আর প্রকৃতির নির্মম জোয়াখেলায় অভিমান করে কেবলই ভাবি প্রকৃতির কাছে আমরা কত অসহায়! বরিশালেই যখন এভাবে আঘাত হেনেছে তাহলে বরগুনা, পাথরঘাটা, কুয়াকাটায় নাজানি কি হয়েছে ! হয়তো কিছুই নেই, সব তছনছ হয়ে গেছে, আমি এর আগে একাধিকবার সাগড়পারের এলাকা ভ্রমণ করেছি। স্বচক্ষে দেখেছি সগড়পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা। সপ্তাহখানেক রাস্তায় গাছপালা পড়ে থাকায় কোন যানবাহন চলেনি। বরিশাল হতে কোন বাস চলেনি ঢাকার পথে। সপ্তাহখানেক বরিশালে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি, নৌবন্দর, ব্রজমোহন কলেজ ক্যাম্পাস এখানে সেখানে ঘুরেছি। স্বন্ধ্যার পর শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে আড্ডা বসে। তৎকালীন তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা দূর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ সহযোগিতার ব্যাপারে বিভিন্ন দাতা দেশের সাথে যোগাযোগ করেন। গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হয়। খবরের কাগজ পড়ে ও টেলিভিশনে এ সব করুন খবর পড়ে সময় কাটাই। দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, ব্যবসা বানিজ্যের জন্য বরিশাল শহর গুরুত্বপূর্ণ। সরেজমিনে দেখার জন্য ২২ নভেম্বর আবার গেলাম পিরোজপুর। সিডর বিলিন হয়ে গেছে, রেখে গেছে ধবংসের স্মৃতি, রাস্তার দু পাশে ধবংসলীলা ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। আমাদের ৩৪ টি শিক্ষাকেন্দ্রের একটি ও টিকে নি। ঝড়ে কোথায় যে উড়ে গেছে টিনের চাল, বাঁশের বেড়া এর হদিশ মেলে নি। মানুষের জমির ফসল নষ্ট হয়েছে, অনেক মানুষ মারা গেছে, আহত হয়েছে অগনিত মানুষ। যেদিকে চোখ যায় দেখা যায় গাছপালা সুমড়ে মুচঢ়ে পড়ে আছে। সর্বত্র এক বীভতস দৃশ্য।
প্রাকৃতিক দূর্যোগের দেশ বাংলাদেশ, সিডরের দেশ বাংলাদেশ। দূর্যোগ আসে প্রতি বছর বিভিন্ন রূপে। আমাদের দেশে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়। দাতাগোষ্টীরা ও খাতের কল্যাণে আমাদেরকে সহযোগিতার নামে ঋণের জালে আটকায়। আমাদের দেশপ্রেমিক (?) আমলা ও রাজনীতিদ নামধারী কর্তাব্যক্তিগন জনকল্যাণের নামে প্রকল্পের অর্থ গলাদকরন করেন, জনগনের টাকায় আয়েশী জীবন যাপন করেন। তাদের কাছে জনগনের হয়ে আকুতি জানিয়ে কোন লাভ নেই। সিডর, আইলা, নার্গিস তোমরা যখন যেনামে যেভাবেই থাক না কেন তোমাদের কাছে আকুতি এই যে, তোমরা আবার কোনদিন যদি বাংলাদেশ ভূখন্ডে আগমন কর , তোমাদের ত অনেক শক্তি, তোমরা তোমাদের একটু শক্তি দিয়ে তাদের নিশ্চিন্ন করে দিয়ে যেও তাদেরকে যারা জনগনের অর্থ আত্মসাতকারী, যারা জনগনের উন্নয়নের কথা বলে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল, যাদের উত্তরসূরীরা এখনো তাদের বাংলাদেশ বিরোধী চরিত্র বদলায় নি। দেখি কত শক্তি আছে তোমাদের! পারবে কি!
সিডর, সিডরের দিনে জন্মগ্রহণকারী শিশু সিডর, আর্শীবাদ করি তুমি দীর্ঘায়ু হও। তোমার সার্বিক মংগল কামনা করি।
[[email protected]]
মন্তব্য (7)
শুধু নিবন্ধিত সদস্যরা মন্তব্য করতে পারবেন। লগ ইন করুন