অন্তরের সেই অন্ধকার কোণে, যেখানে কেউ পৌঁছায় না, যেখানে অনেক সময় নিজেকেও চেনা যায় না, সেখানে একটি ছোট্ট শিখা নীরবে জ্বলতে থাকে। কখনো সে শুধু মৃদু আলো ছড়ায়, কখনো দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। তার নাম ইচ্ছাশক্তি। এ শুধু চাওয়া নয়, এ প্রাণের গভীরতম আহ্বান; যে আহ্বান মাটির নিচে নিঃশব্দে শুয়ে থাকা একটি বীজকে সূর্যের দিকে মাথা তুলতে শেখায়, যে আহ্বান দীর্ঘতম রাতের বুকেও মানুষকে ভোরের স্বপ্ন দেখতে সাহস দেয়।

এই ইচ্ছাই মানুষকে তার নিজের সীমা অতিক্রম করতে শেখায়। জীবনের যত বাধা, যত ভয়, যত হতাশার পাথর, সবকিছুর ভেতর দিয়েই সে নীরবে নিজের পথ তৈরি করে নেয়। নদীর জল যেমন পাথরের মুখোমুখি হয়েও থেমে থাকে না, বরং বাধাকেই নিজের গতির অংশ করে নেয়, তেমনি অটল সংকল্পও প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে। বাইরের কোনো শাসন, কোনো সামাজিক চাপ মানুষের অন্তরের এই জাগরণের সমকক্ষ হতে পারে না। যখন এই ডাক ভেতর থেকে জেগে ওঠে, তখন দেয়াল আর দেয়াল থাকে না; তারা হয়ে ওঠে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিঁড়ি।

আর যখন এই ইচ্ছা যৌবনের উত্তাল রক্তে মিশে যায়, তখন তার রূপ হয় দুর্নিবার। তখন সে ঝড় হয়ে ওঠে, কালবৈশাখীর দুরন্ত গর্জনের মতো, সমুদ্রের বুক ফাটানো ঢেউয়ের মতো। কোনো শিকল তাকে আটকে রাখতে পারে না, কোনো অন্ধকার তার পথ রুদ্ধ করতে পারে না। যে যুবকের বুকে এই আগুন একবার জ্বলে ওঠে, সে আর ভাগ্যের দাস হয়ে থাকে না। সে নিজের হাতে ভাগ্যের প্রতিটি অক্ষর খোদাই করে, স্বপ্নের প্রতিটি ইট গেঁথে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। পরাজয় তখন তার কাছে শেষ নয়; বরং আরও দৃঢ় হয়ে উঠে দাঁড়ানোর এক নতুন আহ্বান।

ইচ্ছাশক্তি একই সঙ্গে ধ্যানের গভীরতা এবং বিদ্রোহের আগুন। এর মধ্যে আছে সৃষ্টির কোমল সৌন্দর্য, আবার আছে পরিবর্তনের দুর্জয় শক্তি। স্বপ্ন দেখা যথেষ্ট নয়। সেই স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করাতে যে একাকী রাত, যে নীরব অশ্রু, যে অবিরাম সাধনা ও সংগ্রাম প্রয়োজন, তার একমাত্র জ্বালানি এই ইচ্ছাশক্তি। পৃথিবীতে যত মহৎ সৃষ্টি, যত অসম্ভবকে সম্ভব করার ইতিহাস, সবকিছুর পেছনেই জ্বলেছে এই একটিমাত্র অদম্য শিখা। স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলা সহজ; কিন্তু স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন পথ সৃষ্টি করাই মানুষকে সত্যিকার অর্থে মহৎ করে তোলে।

তোমার ভেতরেও এই শিখা আছে। হয়তো আজ সে নিভু নিভু, হয়তো কোনো এক নিঃসঙ্গ রাতে তুমি তার উষ্ণতা অনুভব করেছ। তাকে অবহেলা কোরো না। তাকে লালন করো। তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে আরও উজ্জ্বল করে তোলো। কারণ যে নিজের এই অগ্নিশিখাকে জাগিয়ে তুলতে পারে, সে শুধু নিজের জীবনই বদলায় না; সে চারপাশের অন্ধকারেও আলোর রেখা আঁকে। আর সেই আলো সময়ের সীমানা পেরিয়ে বহু মানুষের পথচলার প্রেরণা হয়ে থাকে।

মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ধন-সম্পদ, খ্যাতি কিংবা বংশগৌরব নয়; তার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ইচ্ছাশক্তি। এই শক্তিকে চিনে নাও, তাকে জাগিয়ে তোলো, তাকে কখনো নিভতে দিও না। তখন জীবন আর শুধু বেঁচে থাকার নাম থাকবে না; হয়ে উঠবে আলোর দিকে এক অনন্ত যাত্রা, যার দীপ্তি সময়ের বুকেও অমলিন থেকে যায়।

এটাকে গুগল ডক্স করে দাও