সকালের রোদে ফিতা টানার সময় ফজলুল হক চশমাটা খুলে শার্টের হাতা দিয়ে মুছে নিল।
নদীর বাতাসে পলিমাটি আর ভেজা মাটির একটা মেদুর গন্ধ। নদীর ওপারে কুয়াশার আস্তরণ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। অথচ এপারে বাঁশের চটা আর লাল নিশানা গেড়ে অধিগ্রহণের প্রস্তাবিত সীমানা চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়ে গেছে ভোর ছটা থেকেই।
“হক সাহেব, ওইদিকের শেষ পয়েন্টের খুঁটিটা আরেকটু ভেতরে সরবে না?”
প্রকল্পের জুনিয়র সার্ভেয়ার রাজীব ফিতা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। বয়স কম, কাজে নতুন। ফজলুল হক খাতার ওপর পেন্সিলের ডগাটা রেখে চশমা ঠিক করল।
“না। সিএস ম্যাপ আর অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সীমানা ওখান থেকেই শুরু। লাল নিশানা ওখানেই থাকবে।”
রাজীব আর কথা বাড়াল না। চরের এই মেগাপ্রকল্পে ফজলুল হকের অভিজ্ঞতা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। মাঠের মাপজোখে কোথায় কীভাবে হিসাব মেলাতে হয়, তা সে অন্যদের চেয়ে ভালো জানে।
ফজলুল হক এ অঞ্চলে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছে। আগে লোকে তাকে সাধারণ আমিন বা জরিপকারী হিসেবেই চিনত। কিন্তু এই মেগাপ্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি বদলে গেছে। ঢাকা থেকে আসা সহকারী প্রকৌশলী, জেলা প্রশাসনের জরিপ দল, এমনকি প্রকল্প পরিচালকও চরে পা দিয়েই আগে তার খোঁজ করেন।
মিটিংয়ে স্থানীয়রা যখন বসতভিটা আর জমির ক্ষতিপূরণ নিয়ে তর্ক জুড়ে দেয়, ফজলুল হক তখন শান্ত হাতে নীল মলাটের রেজিস্টার খাতাটি খুলে ধরে।
সে তর্কে যায় না। শুধু বলে, “দাগ নম্বর ৪১২। প্রস্তাবিত অধিগ্রহণ এলাকা। সরকারি নথিতে এটা খাসজমি হিসেবে তালিকাভুক্ত।”
তার কথা শুনে হট্টগোল কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়। বড় কর্মকর্তারাও তার মাপের অপেক্ষায় থাকেন।
ফজলুল হকের মনে হয়, তার হাতের ফিতাটা নদী আর মানুষের মধ্যে টানা এক প্রশাসনিক রেখা। সেই রেখা কোথায় যাবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তার। আগে কেউ তার মতামত জানতে চাইত না। এখন তার মাপের ওপর নির্ভর করে কত জমি প্রকল্পের আওতায় আসবে, কোথায় বাঁধের সীমানা পড়বে, কোন তথ্য যাবে ওপরের দপ্তরে।
কাজের ফাঁকে এক প্রবীণ লোক এগিয়ে এল। ইদ্রিস ব্যাপারী। পরনে ময়লা পাজামা, গালে সাদা দাড়ি।
“হক সাব, আমার ওই বাপদাদার ভিটার দিকটায় যে নিশান গাড়লেন, ওটা কি বাঁধের নকশায় ঢুকে গেল?”
ফজলুল হক খাতা থেকে চোখ না তুলে বলল, “ওটা প্রকল্পের প্রয়োজনীয় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, ব্যাপারী। জমির কাগজপত্র যাচাই করে ক্ষতিপূরণ আর পুনর্বাসনের হিসাব হবে।”
“পুনর্বাসন? কিন্তু আমরা যামু কই? নদীর ওই পাড়ে তো নতুন কোনো চরের দিশা পাই নাই।”
ফজলুল হক হাত তুলে তাকে থামাল।
“শোন ব্যাপারী, নদী তো আর নকশা দেখে চলে না। নিয়ম অনুযায়ী বাঁধ না হলে পুরো পীরপুর নদীগর্ভে যাবে। কয়েকটা ভিটার চেয়ে প্রজেক্টের নিরাপত্তা বড়। হিসাবটা তো বোঝো।”
ইদ্রিস আর কথা বলল না। প্রকল্পের প্রয়োজনীয় এলাকা, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন। শব্দগুলো তার চেনা বসতভিটার ওপর একের পর এক দাগ টেনে দিল। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সরে গেল।
বিকেলে সমস্যাটা দেখা দিল তিন নম্বর সেক্টরে।
বাঁধের মূল ভিত্তির জন্য নির্ধারিত অংশে গিয়ে ফজলুল হক থমকে দাঁড়াল। দুই বছর আগে তৈরি নকশার পয়েন্ট ধরে ফিতা টেনে দেখা গেল, নদী ভেতরের দিকে এগিয়ে এসেছে। গত দুই বর্ষায় স্রোতের টানে পাড়ের তলার মাটি ধসে অন্তত পনেরো মিটার জমি নদীগর্ভে নেমে গেছে।
নকশায় যেখানে বাঁধের পেছনের শুকনো সুরক্ষা অঞ্চল থাকার কথা, সেখানে এখন ঘোলা পানি।
ফজলুল হক আবার মাপ নিল। তারপর আরেকবার। হিসাব একই রইল।
পনেরো মিটারের এই গরমিল শুধু একটি সংখ্যার ভুল নয়। নতুন পরিমাপ প্রতিবেদনভুক্ত করলে তিন নম্বর সেক্টরের নকশা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। নদীভাঙনের পরিবর্তিত সীমানা ধরে নতুন জরিপ, অধিগ্রহণের প্রস্তাব সংশোধন, ঊর্ধ্বতন দপ্তরের অনুমোদন। পুরো প্রকল্পের কাজ কয়েক মাস, হয়তো এক বছরও পিছিয়ে যেতে পারে।
সন্ধ্যায় ক্যাম্প অফিসে প্রকল্প পরিচালক রফিক সাহেবের সামনে বসল ফজলুল হক। টেবিলের ওপর খোলা রেজিস্টার খাতা।
“কী ব্যাপার, হক সাহেব? তিন নম্বর সেক্টরের ফাইনাল সার্ভে শিটে সই করছেন না কেন?” চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন রফিক সাহেব।
ফজলুল হক বলল, “স্যার, তিন নম্বরে পাড়ের মাটি ধসে নদী ভেতরে ঢুকে এসেছে। আগের নকশার সঙ্গে বর্তমান মাপের অমিল আছে। পেছনের সুরক্ষা অঞ্চলের অন্তত পনেরো মিটার জমি কম পাওয়া যাচ্ছে।”
রফিক সাহেব চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
“আপনার পর্যবেক্ষণ ঠিক আছে, হক সাহেব। কিন্তু এই পর্যায়ে নতুন করে মাপ ধরলে পুরো ফাইল ফেরত যাবে। ইঞ্জিনিয়ারিং টিম ওই অংশে প্রতিরক্ষামূলক কাজের ব্যবস্থা করবে। আপাতত অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রতিবেদনটা দিন।”
ফজলুল হক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“কিন্তু স্যার, মাঠে তো জমিটা নেই।”
“সেটা আমরা বুঝছি। নদীর চরাঞ্চলে মাটি ভাঙে, আবার গড়েও ওঠে। এই একটা পরিবর্তনের জন্য পুরো প্রকল্প আটকে গেলে এত দিনের কাজের কী হবে? আপনি তো জানেন, আগের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন নতুন মাপ এলে আগের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।”
রফিক সাহেব খাতার দিকে তাকালেন।
“আপনার রেকর্ডের ওপর আমাদের অনেক কিছু নির্ভর করে, হক সাহেব। প্রতিবেদনটা দিন। বাকি ব্যবস্থা ইঞ্জিনিয়ারিং টিম দেখবে।”
ক্যাম্প অফিস থেকে বেরিয়ে ফজলুল হক আবার হিসাবটা দেখল। পনেরো মিটারের গরমিল রয়েই গেছে। সে আগের সংখ্যাটার ওপর পেন্সিল ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকল।
নদী তো বদলায়। আজ যে মাটি ভেঙে গেছে, প্রতিরক্ষামূলক কাজের পর সেখানে আবার পলি জমতে পারে। এখনকার পরিবর্তন ধরে নকশা বদলাতে গেলে কয়েক মাস পর নতুন করে মাপ নিতে হবে না, তার নিশ্চয়তা কী? প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে নথি বদলাতে থাকলে প্রশাসনিক কাজ চলবে কীভাবে?
সে নিজের হিসাব আবার মিলিয়ে দেখল। পুরোনো মাপের সঙ্গে নতুন মাপ মিলছে না। তবু অনুমোদিত নকশার সংখ্যাটাই তার কাছে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে হলো। পুরোনো সংখ্যাটা মেনে নিলে তার আগের জরিপও প্রশ্নের মুখে পড়বে না, প্রকল্পের কাজও থামবে না।
ফজলুল হক কলম তুলে পুরোনো মাপটাই লিখে সই করে দিল।
কয়েক মাস পর।
বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। নতুন রাস্তার পাশ দিয়ে ট্রাক যাতায়াত করছে, বাতাসে উড়ছে ধুলো। ফজলুল হক এসেছে মাঠের সীমানা চিহ্নিতকরণ ও নথির সঙ্গে বাস্তব অবস্থান মিলিয়ে দেখতে।
তিন নম্বর সেক্টরের কাছে গিয়ে সে থামল।
বাঁধের কাজ কিছুটা এগিয়েছে। কিন্তু পেছনের দিকে, যেখানে নথিতে বিকল্প জমি বরাদ্দের কথা লেখা আছে, সেখানে বসবাস বা চাষের উপযোগী কোনো জমি নেই। নিচু জায়গাটায় কাদাপানি জমে আছে। কোথাও নরম পলি, কোথাও হাঁটুসমান কাদা। বর্ষার পানি নামলেও জায়গাটা শুকিয়ে শক্ত মাটি হয়ে উঠবে কি না, তা বোঝার উপায় নেই।
ফজলুল হক নীল মলাটের খাতাটা খুলল। ৪১২ নম্বর দাগের পাশে লেখা আছে, ‘বিকল্প বাসস্থানের জন্য নির্ধারিত এলাকা’। জমির পরিমাণও লেখা। বরাদ্দের হিসাবের ঘরে কোনো ফাঁক নেই।
“হক সাব?”
ফজলুল হক পেছনে ফিরল। ইদ্রিস ব্যাপারী দাঁড়িয়ে আছে। পরনে পুরোনো ছেঁড়া জামা, মুখে ক্লান্তি।
“চিনতে পারেন? আমি ইদ্রিস।”
“হ্যাঁ, ব্যাপারী। বলো।”
ইদ্রিস খাতার দিকে তাকাল।
“আমার ভিটা তো বাঁধের পেটে গেল। লোকজন কইল, আমার নামে নাকি অন্য জায়গায় জমি দিছে।”
ফজলুল হক রেজিস্টারের পাতায় আঙুল বোলাল।
“হ্যাঁ। দাগ নম্বর ৪১২। বরাদ্দের সব হিসাব নথিতে লেখা আছে, ব্যাপারী।”
ইদ্রিস পড়তে জানে না। সে খাতার পাতার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর অনতিদূরে জমে থাকা কাদাপানির দিকে চোখ ফেরাল।
“কাগজে লেখা আছে, জানি। কিন্তু জমিটা কই?”
ফজলুল হক খাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল। দাগ নম্বর আছে, জমির পরিমাণ আছে, বরাদ্দের হিসাব আছে।
ইদ্রিস অপেক্ষা করছিল।
সে কোনো উত্তর দিল না।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।