পাকিস্তানের জাতির জনক মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে দেখলাম বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া বেশ সরগরম! জন্মের পর থেকে নিয়ে বিগত চার দশকের বেশি সময়ে আমি বাংলাদেশে কখনও জিন্নাহকে নিয়ে এমন বন্দনা আর দেখিনি! বোঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশের একটা পক্ষের কাছে এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেয়েও পাকিস্তানের স্বাধীনতার জনক বেশি জনপ্রিয়, এবং এই উপমহাদেশের মুসলমানদের ত্রাণকর্তা হিসেবে এক মহান মানব হিসেবে তার বন্দনা করা হচ্ছে! তার নেতৃত্বেই ভারতের নির্যাতিত মুসলমান গোষ্ঠী পাকিস্তান নামের এক আলাদা মুসলিম রাষ্ট্র পেয়েছে। তাই ধর্মীয় আবেগ থেকে এক গ্রুপের ভালোই সহানুভূতি তৈরি হয়েছে দেখলাম জিন্নাহ-র প্রতি।
কিন্তু ভাইয়েরা, পাকিস্তান কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্র না, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এর উৎপত্তি। (যদিও পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে দেশটির নাম পরিবর্তন করে ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান রাখা হয়।) আর ভারতবর্ষ ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তান বানানোর মূল ভূমিকা ছিলো তৎকালীন ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠীর। তারা ধর্মের বিভাজন দিয়ে দেশ শাসন করে গেছে। যাওয়ার আগেও এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে তাড়াহুড়ো করে দেশকে এমন দুই ভাগে ভাগ করে দিয়ে গেছে যে সেই কলহ এখন পর্যন্ত বিদ্যমান আছে। আর এই কাজে যেসব দেশীয় নেতাদের সাথে ব্রিটিশদের দহরম মহরম ছিলো, মুহম্মদ আলী জিন্নাহও তাদেরই একজন। জিন্নাহ-র নামাজ পড়ার কোনো রেকর্ড নেই। চালচলন ছিলো পশ্চাত্যের স্টাইলের। মদপান তার কাছে ছিলো স্বাভাবিক বিষয়। তো সেই বেনামাজি মদ্যপ ব্যক্তিটিকে কিনা মুসলমানদের ত্রাণকর্তা হিসেবে এক দল ধর্মান্ধ লোক মাথায় তুলে নাচছে!
যাক, চলুন মুসলমানদের হিসাবটাই আগে একটু করি। ১৯৩৩ সালে মুসলমানদের জন্য আলাদা একটা দেশ হিসেবে যখন পাকিস্তানের প্রস্তাব রাখে চৌধুরি রহমত আলী, তখন সেখানে বাংলাদেশের কোনো নামগন্ধও ছিলো না। পাকিস্তান নামটি প্রস্তাব করা হয়েছিলো নিচের স্টেটগুলোকে এক করে আলাদা রাষ্ট্র তৈরির জন্য:
P - Punjab (পাঞ্জাব)
A - Afghania (আফগান)
K - Kashmir (কাশ্মীর)
S - Sindh (সিন্ধু)
Tan - Beluchistan (বেলুচিস্তান)
খেয়াল করে দেখুন, প্রস্তাবিত এই ৫ রাজ্যের তালিকায় কোথাও বেঙ্গল বা বঙ্গে-র B নেই। ১৯৪০ সালে পাকিস্তানের সাথে পূর্ব বঙ্গের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করেছিলেন এ. কে. ফজলুল হক। দেশভাগের পর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় লাখ লাখ লোক ধর্মের ভিত্তিতে দেশান্তরিত হওয়ার পরেও বিভক্ত ৩ খণ্ডের মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো নিম্নরূপ (১৯৫১ সালের জরিপ):
পশ্চিম পাকিস্তান - ৩.২৭ কোটি
ভারত - ৩.৫৪ কোটি
পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) - ৩.২২ কোটি
বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে যোগ না দিলে পাকিস্তানের মোট মুসলমানের সংখ্যা হতো সামগ্রিক মুসলমানের মাত্র ৩ ভাগের ১ ভাগ। তো বাংলাদেশও গিয়ে সেই ৩ ভাগের ১ ভাগের সাথে যোগ দিলো। কারণ কী? মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। কিন্তু ভাই হলে কী হবে, পাকিস্তানের স্বপ্নের কোনো অংশে তো আর বাংলাদেশ ছিলো না। তাই দেখা গেলো পশ্চিম পাকিস্তান কখনোই পূর্ব পাকিস্তানকে সমান অংশীদার হিসেবে মেনে নেয়নি। পূর্ব পাকিস্তান তাদের কাছে ছিলো বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এক উৎস, যে আয়ের ওপর ভর করে ভোগ বিলাস করতো তারা। আমরা তাদের কাছে চাষাভুষার চেয়ে বেশি কিছুই ছিলাম না! বাঙ্গাল শব্দটা তারা ব্যবহার করতো গালি হিসেবে। চাকরিবাকরি থেকে নিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের কথা বাদই দিলাম, আমাদের জীবনের মূল্য মুসলিম ভাই হিসাবে কতটুকু ছিলো তার প্রমাণ তো ১৯৭১ সালেই আমরা পেয়েছি। ১৯৪৭-এর দেশভাগে যেখানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় সব মিলিয়ে ১ থেকে নিয়ে ১০ লাখের মতো মানুষ হত্যা করা হয়েছে বলা হয় (হিন্দু ও মুসলমান সব মিলিয়ে), সেখানে ১৯৭১ সালে আমাদের মুসলমান ভাইদের হাতেই আমাদের ৩০ লক্ষ মানবসন্তান নিহত হয় সরকারী হিসাবে (বেসরকারী হিসাবে ৩ লাখ থেকে নিয়ে ৩০ লাখ)। পাকিস্তানের এই যে নিজের ভিতরেই দমন-পীড়নের চরিত্র, মুহম্মদ আলী জিন্নাহ তার বাইরের কেউ না। (বাঙালীর ওপর এনে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়া থেকেই তা বোঝা যায়।) দুর্ভাগ্য যে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত সেই মনোবৃত্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশে এখনও চলে আসছে দমন-পীড়ন এবং স্বাধীনতার আন্দোলন। বাংলাদেশ বরং বের হয়ে এসে পাকিস্তান থেকে এখন অনেক অনেক ভালো করছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে চলার জন্য যেমন ভারতের তোয়াজ করার দরকার নেই। একইভাবে পাকিস্তানকেও মাথায় তুলে নাচার কোনো কারণ নেই। দু'টোই আমাদের প্রতিবেশী দেশ। দুই দেশের সাথেই নিজের স্বার্থ সমুন্নত রেখে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত আমাদের। কিন্তু তাই বলে তিক্ত সত্যকে ঢেকে মিথ্যের প্রলেপে অতীতকে ভিন্ন রূপ দেয়ারও কিছু নেই।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।