একটা শীতের সকাল 'কোলফিল্ড এক্সপ্রেস’ হাওড়ায় পৌঁছলো তখন প্রায় সাড়ে দশটা, এই গাড়িতে প্রথম রেস্ট গিভার এখনও আমার ট্রেনিং পর্ব চলছে।
বাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে নামতে যাব, বিলবাবু , একটা কুড়ি টাকার নোট আমার পকেটে গুঁজে দিল। শুধালাম এটাকি? বলল এটা নাকি আমার পাওনা। মনে হচ্ছিল সমস্ত হাওড়া স্টেশন আমাকে দেখছে, এক মহা অপ্রস্তুত অভিজ্ঞতা, আর শরীরে এক অভূতপূর্ব অনভিপ্রেত অনুভুতি।
ছোটবেলার বাবা মারা গেছে, দাদা তেমন পড়াশুনা করেনি সে বাটার দোকানে সেলসবয়, মাসে তিরিশটাকা, কেন জানিনা ওকে বারেবারেই বলতাম ‘যখন বড় হয়ে চাকড়ি করবো "একহাজার রোজগার করে তোকে দেরহাজার দেব", কেন বলতাম তার কোন যুক্তি নেই, কি করে হাজার টাকা রোজগার করে দের হাজার দেওয়া যায় তারও কোনো যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করিনি।
এখন আমার এই কুড়িটাকা পাওয়ার পর উপরের রহস্যটা যেন আপনা থেকেই উন্মোচিত হল। সারা রাস্তা এই কুড়ি টাকা আমাকে অনেক ভাবলো। রাজধানীতে প্রথম ডিউটিতে পাঁচশো টাকা পেয়ে ছিলাম তার গল্প তো আগেই বলেছি!
সামার স্পেশাল' ছাড়ায় সময় এই গাড়ীর ইনচার্জে হওয়ার জন্য রীতিমত অকশন হতো, মহামান্যকে খুশি কর গাড়ীর হ্যান্ডেল ধরো। হঠাৎ করেই আমাকে দেওয়া হল দিল্লি সামার স্পেশালের দায়িত্ব, কফি কর্নার থেকে ধারে পাওয়া গেল দুহাজার টাকা রেশন , উনুন আনুষাঙ্গিক কেনার জন্য, নামমাত্র পার্মানেন্ট স্টাফ বাকি ফালতু, এরা কেওই রোলে নেই, কিন্তু এরাই মোস্টলি কাজ করে টিপস আর ম্যানেজারের দাক্ষিণ‍্যে। তা গাড়ী তো ছাড়লো প্রথম ট্রিপ রাস্তাই নানান রকম উৎপাত ভিজিলান্স, হেলথ ইন্সপেক্টর, টিটিআই, সবারই র কিছু উপরি চাই। এটাই অঘোষিত নিয়ম, মাইনে বাড়ীর জন‍্য, ফুর্তি আর পার্সোনাল খরচের জন্য উপরি। এক ট্রিপ কোনও মতে করে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি!
এর পর(পূর্বা) পোস্টিং হলো, ডিলাক্স এক্সপ্রেস সে গাড়ীয় প্রধান ইনচার্জ বর্দ্ধমান থেকে উঠে দূর্গাপূরে খাতাপত্র নিয়ে নেমে যান ট্রিপের কাজ করার জন্য, মাঝে মধ্যে পুরো হাওড়া দিল্লি ডিউটি করেন ইচ্ছে হলে। আমি একা একাই মোটা ইংরাজী নভেল পড়তে থাকি কেবিনে বাস। এই ফালতু দের চক্করে সবাই আপার হ‍্যান্ড নিত টিটিআই থেকে শুরু করে ভিজিল্যান্স, তা ছাড়া বিহারের এএমপি আর এমএলেদের উৎপাত আর অদ্ভুত আবদার অসহ্য ছিলো আমার জন্য, এখানে কাজ করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না।
পূর্বাতে কাজ করার সময় প্রতি ট্রিপে তিনশ টাকা করে পাওয়ার যেত, কিন্তু আমার ইন্সপেক্টর ইচ্ছেমত আমাকে কিছু টাকা দিতো, শুরুতে নিতাম সেই টাকা , কিন্তু ঠিক মন থেকে হজম করতে পারছিলাম না, তাই ঠিক করলাম গাড়ি থেকে নামতে হবে, অন রিকোয়েস্ট যাত্রী নিবাসে পোস্টিং নিলাম, সদ্য তৈরি হয়েছে, উপরি নেই তাই যাত্রি নিবাস ‘পানিশমেন্ট পোস্টিং’। প্রায় দশবছর এখনো কাজ করেছি, সিফ্ট ডিউটি আমার ভাললাগতো কারন ৯চা ৫টা ডিউটি আমার কখনোই পছন্দ ছিলনা। এর পর হয় দুঃখজনক রাজধানী এক্সপ্রেস অ‍্যাক্সিডেন্ট, আবার গাড়িতে পোস্টিং হলো, আমার আবার কপাল পুরলো। এক অদ্ভুত পরিস্থিতি সিনিয়র হওয়ার জন্য গাড়ির চার্জ নিতে হবে, আর তা হলেই সিস্টেম অনুযায়ী চুরি করতে হবে, সবাইকে চুরির ভাগ দিতে হবে অফিসার, ভিজিলেন্স, অ্যাকাউন্টস আরও অনেক কিন্তু চোর ক্যাটারিং ইন্সপেক্টর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত্য অন্যজনকে চার্জ দেওয়া হয়, সেই সময় ৫০ হাজার টাকা মাসে উপরি, আমার প্রায় মাস মাইনের সমান, সহজ ছিলনা ছাড়া কিন্তু আমি নিশ্চিত করে নিয়েছিলাম উপরি নেব না, তার জন্য ঘরে বাইরে গালও খেয়েছি বোকামির জন্যে, কিন্তু আমি দৃঢ় ছিলাম এ বিষয়ে, তার সুফল ও পেয়েছি পরবর্তী কালে ।
১৯৯৯ তে তৈরি হলো আইআরসিটিসি, ২০০৬ এখানে জয়েন করালাম ‘উইথ ভেরি হাই হোপস’ এক সুস্থ পরিবেশে কাজ করতে পারবো।
হায় কপাল!! “আসমান সে টপকা, খাজুর মে অটকা!!”